২০ বছরেও পৌরসভা হয়নি কমলনগর, বাড়ছে নাগরিক দুর্ভোগ

প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:৩৯ অপরাহ্ণ
২০ বছরেও পৌরসভা হয়নি কমলনগর, বাড়ছে নাগরিক দুর্ভোগ

লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলা সদরকে পৌরসভা ঘোষণার দাবি

প্রতিষ্ঠার দুই দশক পেরিয়ে গেলেও এখনো পৌরসভা ঘোষণা করা হয়নি লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলাকে। তিন লাখের বেশি মানুষের বসবাসের এই উপজেলায় জনসংখ্যা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অবকাঠামোগত কার্যক্রম বাড়লেও পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক নাগরিক সেবার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। দীর্ঘদিন ধরে কমলনগরকে পৌরসভায় রূপান্তরের দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয় বাসিন্দা, সামাজিক সংগঠন ও রাজনৈতিক নেতারা। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কমলনগর উপজেলা সদর হাজিরহাটকে কেন্দ্র করে বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক এলাকা গড়ে উঠেছে। উপজেলা সদর ও আশপাশে বাজার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি কার্যালয় এবং আবাসিক স্থাপনা বাড়ছে। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ সরকারি সেবা, চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে উপজেলা সদরে আসেন। ফলে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিকল্পিত সড়কব্যবস্থা, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সড়কবাতি, পরিচ্ছন্নতা ও বাজার ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, লক্ষ্মীপুর জেলার লক্ষ্মীপুর সদর, রায়পুর, রামগঞ্জ ও রামগতি উপজেলায় পৌরসভা থাকলেও কমলনগরে এখনো পৌরসভা গড়ে ওঠেনি। তাদের মতে, পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হলে স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিক সেবাগুলো আরও পরিকল্পিতভাবে পরিচালনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি সড়ক ও ড্রেনেজ অবকাঠামো উন্নয়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বাজারের শৃঙ্খলা, সড়কবাতি ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা সম্প্রসারণে নতুন প্রশাসনিক কাঠামো ভূমিকা রাখতে পারে।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ২০০৫ সালের ১৭ নভেম্বর প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস জাতীয় কমিটির ৯৩তম সভায় তৎকালীন সংসদ সদস্য এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজানের প্রচেষ্টায় রামগতি উপজেলাকে বিভক্ত করে কমলনগর নামে নতুন উপজেলা গঠনের প্রস্তাব অনুমোদন হয়। পরবর্তী সময়ে ২০০৬ সালের ৬ জুন কমলনগর উপজেলা হিসেবে অনুমোদন পায়। ওই বছরের ২০ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন উপজেলার উদ্বোধন করেন।

বর্তমানে কমলনগর উপজেলায় নয়টি ইউনিয়ন ও ৮১টি ওয়ার্ড রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, উপজেলা প্রতিষ্ঠার পর গত দুই দশকে এখানকার জনবসতি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে হাজিরহাট, চরলরেন্স ও চরফলকন ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় বাণিজ্যিক ও আবাসিক কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে। ২০২১ সালের দিকে উপজেলা সদর হাজিরহাট, চরলরেন্স, চরকাদিরা, সাহেবেরহাট ও চরফলকন ইউনিয়নের আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা নিয়ে পৌরসভা গঠনের একটি প্রাথমিক রূপরেখাও স্থানীয় পর্যায়ে তৈরি করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, মেঘনা নদীর তীরবর্তী হওয়ায় কমলনগরের অর্থনৈতিক ও পর্যটন সম্ভাবনাও রয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে মেঘনা নদীর তীর সংরক্ষণ বাঁধ নির্মাণের মতো বড় প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। পাশাপাশি মেঘনার তীরে গড়ে ওঠা পর্যটনকেন্দ্র ‘মেঘনা বিচ’ দেখতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা আসছেন। এসব উন্নয়ন কার্যক্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উপজেলা সদর ও গুরুত্বপূর্ণ বাজার এলাকাগুলোতে পরিকল্পিত নগর অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন স্থানীয়রা।

তবে পৌরসভা গঠনের ক্ষেত্রে শুধু জনসংখ্যা বেশি হওয়াই যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯-এর বিধান অনুযায়ী পৌরসভা গঠনের ক্ষেত্রে জনসংখ্যা, জনঘনত্ব, এলাকার নগর বৈশিষ্ট্য, অকৃষি পেশায় নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর হার, ভূমির ব্যবহার, নাগরিক সুবিধা এবং নিজস্ব রাজস্ব আয়ের সক্ষমতার মতো বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করা হয়। ফলে কোনো এলাকাকে পৌরসভায় রূপান্তরের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এসব বিষয় যাচাই ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়।

সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের কমলনগর উপজেলা সাধারণ সম্পাদক বেলাল হোসেন জুয়েল বলেন, শুধু পৌরসভা ঘোষণা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সম্ভাব্য এলাকার সীমানা, জনসংখ্যা, আয়-ব্যয়ের সক্ষমতা, অবকাঠামো ও প্রশাসনিক সক্ষমতাসহ প্রয়োজনীয় সরকারি শর্তগুলো আগে যাচাই করা প্রয়োজন। বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার ভিত্তিতে পৌরসভা গঠন করা হলে এর সুফল দীর্ঘস্থায়ী হবে বলে তিনি মনে করেন।

কমলনগর প্রেসক্লাবের সভাপতি এম এ মজিদ বলেন, ২০০৬ সালে তৎকালীন সংসদ সদস্য এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজানের উদ্যোগে কমলনগর উপজেলা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তাঁর প্রত্যাশা, এবারও তাঁর নেতৃত্বে কমলনগর পৌরসভা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে।

কমলনগর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এম. দিদার হোসেন বলেন, পাশের রামগতি উপজেলায় পৌরসভা থাকলেও কমলনগরে নেই। তাঁর দাবি, জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিবেচনায় কমলনগরেও পৌরসভা প্রয়োজন।

উপজেলা বিএনপির সভাপতি নুরুল হুদা চৌধুরী বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই তারা কমলনগরকে পৌরসভা ঘোষণার দাবি জানিয়ে আসছেন। উপজেলা সদরকে পরিকল্পিত শহরে রূপান্তর এবং নাগরিক সেবা সহজ করার জন্য দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

তবে এখন পর্যন্ত পৌরসভা গঠনের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি উদ্যোগের চিঠি পায়নি উপজেলা প্রশাসন। কমলনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাহাত উজ জামান বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে পৌরসভা ঘোষণার দাবি জানানো হলেও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে এখন পর্যন্ত এ সংক্রান্ত কোনো চিঠি পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে লক্ষ্মীপুর-৪ রামগতি-কমলনগর আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান বলেন, নাগরিক সেবা সহজ করার লক্ষ্যে কমলনগরকে পৌরসভায় রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০০৬ সালে তাঁর সময়ে কমলনগর উপজেলা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি আশা প্রকাশ করেন, বর্তমান সরকারের আমলেই পৌরসভা গঠনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হবে।

ফলে কমলনগরকে পৌরসভায় রূপান্তরের দাবি এখন স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। তবে সেই দাবি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সরকারি যাচাই, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও আইনগত শর্ত পূরণের পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page