আশুরার রোজার ফজিলত, রোজার দিন, হাদিস ও আমলসমূহ
আশুরার দিনে রোজা, দোয়া ও নেক আমলের বিশেষ ফজিলতের কথা সহিহ হাদিসে উল্লেখ রয়েছে।
পবিত্র মুহাররম ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস এবং চারটি সম্মানিত মাসের একটি। এই মাসের ১০ তারিখ, অর্থাৎ আশুরার দিন মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ। এ দিন রোজা রাখা, আল্লাহর কাছে বেশি বেশি তাওবা-ইস্তিগফার করা এবং নেক আমল করার ব্যাপারে হাদিসে বিশেষ উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। প্রতি বছর আশুরাকে ঘিরে মুসলমানদের মধ্যে রোজা রাখার নিয়ম, ফজিলত এবং করণীয় আমল নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা যায়। তাই সহিহ হাদিসের আলোকে আশুরার দিনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো জানা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য প্রয়োজন।
আশুরা শব্দটি আরবি ‘আশারা’ থেকে এসেছে, যার অর্থ দশ। ইসলামি ক্যালেন্ডারের প্রথম মাস মুহাররমের ১০ তারিখকে আশুরা বলা হয়। ইসলামি ইতিহাসে এই দিনটি বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী। বিভিন্ন হাদিসে এসেছে, এ দিনে আল্লাহ তাআলা হজরত মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীদের ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। এ কারণেই মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) আশুরার রোজা রাখতেন এবং সাহাবিদেরও তা পালনের নির্দেশনা দেন।
আশুরার রোজার ফজিলত কী
আশুরার রোজা ফরজ নয়, তবে এটি অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি নফল ইবাদত। হজরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
“আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার দিনের রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের (সগিরা) গুনাহের কাফফারা হবে।” — (সহিহ মুসলিম)
এই হাদিস থেকেই বোঝা যায়, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আন্তরিকভাবে আশুরার রোজা পালন করলে একজন মুসলমান মহান সওয়াব লাভের পাশাপাশি পূর্ববর্তী এক বছরের ছোট গুনাহ মাফের আশা করতে পারেন।
আশুরার রোজা কত দিন রাখা উত্তম
অনেকেই শুধু ১০ মুহাররম রোজা রাখেন। তবে সহিহ হাদিস অনুযায়ী ৯ ও ১০ মুহাররম অথবা ১০ ও ১১ মুহাররম—দুই দিন রোজা রাখা অধিক উত্তম।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
“আমি যদি আগামী বছর জীবিত থাকি, তবে অবশ্যই ৯ তারিখও রোজা রাখব।” — (সহিহ মুসলিম)
ইসলামি স্কলারদের মতে—
- ৯ ও ১০ মুহাররম রোজা রাখা সবচেয়ে উত্তম।
- ১০ ও ১১ মুহাররম রোজা রাখাও সুন্নত।
- শুধু ১০ মুহাররম রোজা রাখা বৈধ, তবে দুই দিন রাখা অধিক ফজিলতপূর্ণ।
আশুরার দিনে যেসব আমল করা উচিত
রোজার পাশাপাশি এ দিনে বেশি বেশি ইবাদত-বন্দেগি করার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে—
- কোরআন তিলাওয়াত করা।
- নফল নামাজ আদায় করা।
- আল্লাহর কাছে তাওবা ও ইস্তিগফার করা।
- বেশি বেশি জিকির ও দরুদ শরিফ পাঠ করা।
- দোয়া করা এবং নিজের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা।
- গরিব ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
- আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা।
- পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করা।
এসব আমল একজন মুসলমানের আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
যেসব কাজ থেকে বিরত থাকা উচিত
আশুরাকে কেন্দ্র করে সমাজে বিভিন্ন কুসংস্কার ও ভিত্তিহীন রেওয়াজ প্রচলিত রয়েছে। অথচ কোরআন ও সহিহ হাদিসে এসবের কোনো ভিত্তি নেই।
তাই এ দিনে শরীরে আঘাত করা, মাতম করা, ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা মনে করে বিশেষ খাবার বা অনুষ্ঠান আয়োজন করা কিংবা সহিহ হাদিসে প্রমাণিত নয়—এমন কোনো আমলকে ধর্মের অংশ মনে করা থেকে বিরত থাকা উচিত। ইসলামের শিক্ষা হলো, কেবল কোরআন ও সহিহ সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করা।
কেন আশুরার রোজা গুরুত্বপূর্ণ
বর্তমানে জাতীয় পরিচয়, ব্যস্ত কর্মজীবন কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর জীবনের মাঝেও একজন মুসলমানের জন্য আশুরার দিনটি আত্মসমালোচনা, তাওবা এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসার এক বিশেষ সুযোগ। এই দিনের রোজা শুধু একটি নফল ইবাদত নয়, বরং ঈমানকে শক্তিশালী করা, গুনাহ থেকে ফিরে আসা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
তাই আশুরার দিনকে কুসংস্কার বা লোকাচারের মাধ্যমে নয়, বরং সহিহ হাদিসে বর্ণিত আমল অনুসরণ করেই পালন করা উচিত। রোজা, দোয়া, কোরআন তিলাওয়াত এবং নেক আমলের মাধ্যমে একজন মুসলমান এই দিনটির সর্বোচ্চ ফজিলত অর্জনের চেষ্টা করতে পারেন।
আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
