সরকারি চাকরিতে পদোন্নতির নিয়মে বড় পরিবর্তন
নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতির জন্য নতুন বিধিমালার খসড়া করছে সরকার।
নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে নতুন কিছু বিধান যুক্ত করতে যাচ্ছে সরকার। প্রস্তাবিত জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি বিধিমালায় বলা হয়েছে, পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জনের পরও কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী স্বেচ্ছায় তা গ্রহণ না করলে সেটিকে অসদাচরণ হিসেবে গণ্য করা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি নিয়ে নতুন বিধিমালার খসড়া তৈরি করছে। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিধি) মো. মোস্তফা জামান জানিয়েছেন, খসড়াটি নিয়ে বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নেওয়া হচ্ছে। বিধিমালাটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
প্রস্তাবিত বিধিমালায় বিভাগীয় পদোন্নতির ক্ষেত্রে কমিটি বা কমিশনের সুপারিশকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই ব্যাচের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতির সুপারিশ করা হলে বয়সের ভিত্তিতে তাদের পারস্পরিক জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা হবে। আবার কমিটি বা কমিশন যাদের আগে পদোন্নতির সুপারিশ করবে, তারা পরবর্তী সময়ে সুপারিশ পাওয়া ব্যক্তিদের তুলনায় জ্যেষ্ঠতা পাবেন।
পদোন্নতির ক্ষেত্রে নির্ধারিত কোটার বিষয়টিও স্পষ্ট করা হয়েছে খসড়ায়। কমিটি বা কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে উচ্চতর স্কেলে পদোন্নতি দিতে হবে এবং বিভাগীয় পদোন্নতি নির্ধারিত কোটার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। কোনো কারণে কোটার বাইরে অতিরিক্ত পদোন্নতি দেওয়া হলে সেই পদোন্নতিপ্রাপ্তদের জ্যেষ্ঠতা পদোন্নতির তারিখ থেকে গণনা করা যাবে না।
উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কোনো পদে নিয়োগ হলে কমিটি বা কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে যোগদানের তারিখ থেকে ওই পদে জ্যেষ্ঠতা গণনার বিধানও রাখা হয়েছে।
সমন্বিত জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে পদোন্নতিযোগ্য পদের ফিডার পদে নিয়মিত যোগদানের তারিখকে ভিত্তি ধরা হবে। একই তারিখে যোগদান করলে বয়সের ভিত্তিতে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা হবে। বয়সও একই হলে শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনের শিক্ষাবর্ষ এবং পরে ফলাফলের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ফিডার পদের মেধাক্রমও বিবেচনায় রাখা হবে।
পদোন্নতি না নেওয়ার বিষয়টিকে অসদাচরণ হিসেবে বিবেচনার বিধানটি প্রস্তাবিত বিধিমালার অন্যতম উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। সরকারি চাকরি আইনে অসদাচরণের জন্য লঘু ও গুরুদণ্ডের ব্যবস্থা রয়েছে। লঘুদণ্ডের মধ্যে তিরস্কার, পদোন্নতি বা বেতন বৃদ্ধি স্থগিত এবং মূল বেতনস্কেলের নিম্নতর ধাপে অবনমিত করার মতো শাস্তি রয়েছে। গুরুদণ্ডের মধ্যে নিম্নপদ বা নিম্ন বেতন গ্রেডে অবনমিতকরণ, বাধ্যতামূলক অবসর এবং চাকরি থেকে অপসারণের বিধান রয়েছে।
বিভাগীয় মামলা ও বিচারাধীন ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রেও পদোন্নতিতে বিধিনিষেধ রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় অভিযোগনামা দাখিল, দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল, ফৌজদারি মামলা দায়েরের সরকারি অনুমোদন বা গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটলে মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তিনি পদোন্নতির জন্য বিবেচিত হবেন না।
এ ছাড়া লঘুদণ্ডের মেয়াদ এক বছর এবং গুরুদণ্ডের মেয়াদ দুই বছর হলে, দণ্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আরও দুই বছর পর্যন্ত পদোন্নতি না দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। তবে বিভাগীয় মামলা, দুদকের মামলা বা ফৌজদারি অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেলে এবং পদ শূন্য থাকা সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী পদোন্নতি পাওয়ার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে ধারণাগত জ্যেষ্ঠতাও দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
পদোন্নতির যোগ্যতা নির্ধারণে বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন বা এসিআরের গড় নম্বরও বিবেচনায় নেওয়া হবে। প্রস্তাবিত নিয়ম অনুযায়ী, বিগত পাঁচ বছর অথবা ফিডার পদে চাকরিকালের মধ্যে যেটি কম, সেই সময়ের গড় এসিআর নম্বর কমপক্ষে ৮০ থাকতে হবে। গড় নম্বর ৬৯-এর নিচে হলে সেটিকে বিরূপ মন্তব্য হিসেবে গণ্য করার বিধান রাখা হয়েছে। অবসরোত্তর ছুটি ভোগরত কর্মকর্তা-কর্মচারী পদোন্নতি পাবেন না।
পদোন্নতিযোগ্য শূন্য পদের বিপরীতে পদোন্নতি দেওয়ার সুযোগ থাকলেও লিয়েন বা চলতি দায়িত্বের কারণে সৃষ্ট শূন্য পদে পদোন্নতি দেওয়া যাবে না বলে খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিধি) মো. মোস্তফা জামান বলেন, সরকার ক্যাডার ও নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি বিধিমালা প্রণয়নের কাজ করছে। একটি খসড়া তৈরি করে বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নেওয়া হচ্ছে। বিধিমালাটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি এবং কাজ শেষ হলে নতুন বিধানগুলো চূড়ান্তভাবে জানা যাবে।
প্রস্তাবিত বিধিমালার বিষয়ে সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া মনে করেন, যথাযথভাবে বিধিমালা প্রণয়ন না হলে প্রশাসনিক জটিলতা ও মামলা-মোকদ্দমার সৃষ্টি হতে পারে। তাঁর মতে, আগের বিধিমালা সংশোধনের পরিবর্তে নতুন করে বিধিমালা করা হলে কিছু ক্ষেত্রে জটিলতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নতুন বিধিমালা চূড়ান্ত হলে নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভাগীয় পদোন্নতি, জ্যেষ্ঠতা, এসিআর, মামলা ও শাস্তির প্রভাব এবং পদোন্নতি গ্রহণের বিষয়গুলোতে নতুন কাঠামো কার্যকর হবে। বর্তমানে বিষয়টি খসড়া পর্যায়ে রয়েছে।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
