বৃষ্টি শুধু পানি নয়, কোরআনে যেভাবে এসেছে আল্লাহর রহমতের বর্ণনা

প্রকাশিত: রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:০২ পূর্বাহ্ণ
বৃষ্টি শুধু পানি নয়, কোরআনে যেভাবে এসেছে আল্লাহর রহমতের বর্ণনা

বৃষ্টি আল্লাহর এক বিশেষ নিয়ামত ও রহমতের নিদর্শন

প্রখর রোদে উত্তপ্ত হয়ে ওঠা মাটিতে যখন বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা পড়ে, তখন প্রকৃতিতে নেমে আসে এক অন্যরকম প্রশান্তি। শুকিয়ে যাওয়া মাটি সজীব হয়ে ওঠে, গাছপালা প্রাণ ফিরে পায়, আর মানুষের মনেও তৈরি হয় স্বস্তির অনুভূতি। বৃষ্টি প্রকৃতির স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া হলেও ইসলামের দৃষ্টিতে এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আল্লাহ তাআলার অসীম কুদরত ও রহমতের গভীর স্মরণ।

পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে বৃষ্টিকে কখনো আল্লাহর ক্ষমতা ও কুদরতের নিদর্শন, কখনো রহমত এবং কখনো মানুষের জীবন ও জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বৃষ্টির মাধ্যমে কীভাবে মৃতপ্রায় মাটি আবার প্রাণ ফিরে পায়, ফসল উৎপন্ন হয় এবং মানুষের জীবনধারণের প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ হয়, কোরআনের আয়াতগুলোতে তার নানা দিকের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনিই সে সত্তা, যিনি তারা নিরাশ হয়ে যাওয়ার পর বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং স্বীয় রহমতকে ছড়িয়ে দেন। তিনিই অভিভাবক, প্রশংসিত।’ (সুরা আশ-শুরা, আয়াত: ২৮)

এই আয়াতে বৃষ্টিকে আল্লাহর রহমতের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। দীর্ঘদিন বৃষ্টিহীন থাকার পর আকাশ থেকে পানি নেমে এলে যেমন মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে, তেমনি প্রকৃতিও নতুন প্রাণ ফিরে পায়। ফলে বৃষ্টি মানুষের কাছে শুধু আবহাওয়ার একটি পরিবর্তন নয়, বরং আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ করারও একটি উপলক্ষ হতে পারে।

বৃষ্টির আগে বাতাসের পরিবর্তনও মানুষের কাছে এক পরিচিত অভিজ্ঞতা। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে হঠাৎ ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করলে অনেক সময় মানুষ বৃষ্টির আগমনের আভাস পায়। পবিত্র কোরআনে বৃষ্টির আগে বাতাস প্রবাহিত হওয়ার বিষয়টিকেও আল্লাহর রহমতের সুসংবাদের সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়েছে।

আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই সেই সত্তা, যিনি স্বীয় রহমতের পূর্বে সুসংবাদস্বরূপ বাতাস প্রেরণ করেন।’ (সুরা আল-আরাফ, আয়াত: ৫৭)

অন্য একটি আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তাঁর অন্যতম নিদর্শন—তিনি বাতাস পাঠান, যেন তা (বৃষ্টির) সুসংবাদ দিতে পারে এবং তিনি তোমাদের স্বীয় রহমতের স্বাদ আস্বাদন করাতে পারেন।’ (সুরা আর-রূম, আয়াত: ৪৬)

বৃষ্টির গুরুত্ব শুধু স্বস্তি বা শীতলতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের খাদ্য ও জীবিকার সঙ্গেও এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বৃষ্টির পানি মাটিকে উর্বর করে এবং বিভিন্ন ধরনের ফসল, ফলমূল ও উদ্ভিদের জন্মে সহায়তা করে। মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও খাদ্যব্যবস্থার বড় একটি অংশ তাই পানির ওপর নির্ভরশীল।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনি আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন, এরপর তা দিয়ে তোমাদের জীবিকাস্বরূপ বিভিন্ন প্রকার ফলমূল উৎপন্ন করেন।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ২২)

সুরা ক্বাফেও বৃষ্টির পানির মাধ্যমে পৃথিবীতে উদ্ভিদ ও ফসল উৎপাদনের কথা এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি আকাশ থেকে বর্ষণ করি বরকতপূর্ণ পানি, তারপর তার মাধ্যমে উদগত করি উদ্যানরাজি ও এমন শস্য, যা কাটা হয়ে থাকে। এবং সৃষ্টি করি এমন উঁচু উঁচু খেজুর গাছ, যাতে আছে গুচ্ছ গুচ্ছ দানা।’ এরপর আয়াতে এসবকে বান্দাদের জীবিকার উপকরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং বৃষ্টির পানির মাধ্যমে মৃত জনপদকে সজীব করার কথাও বলা হয়েছে। (সুরা ক্বাফ, আয়াত: ৯-১১)

মানুষ বৃষ্টির পানি সরাসরি আকাশ থেকে তৈরি করতে পারে না। একইভাবে পৃথিবীর বিশাল জলচক্রও মানুষের নিয়ন্ত্রণে নয়। বৃষ্টির পানি মাটির নিচে প্রবেশ করে ভূগর্ভস্থ পানির ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করে। পরে সেই পানি কূপ, গভীর নলকূপসহ বিভিন্ন ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের ব্যবহারে আসে। পানির এই ব্যবস্থা মানুষের জন্য আল্লাহর দেওয়া বড় নিয়ামত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সুরা আল-ওয়াকিয়ায় পানির বিষয়ে মানুষকে চিন্তা করতে বলা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আচ্ছা বলো তো, যে পানি তোমরা পান কর, মেঘ থেকে তা কি তোমরা বর্ষণ কর, না আমিই বর্ষণ করে থাকি? আমি ইচ্ছা করলে তা লবণাক্ত করে দিতে পারি, অতএব কেন তোমরা শোকর আদায় কোরো না?’ (সুরা আল-ওয়াকিয়া, আয়াত: ৬৮-৭০)

এই আয়াত মানুষের জন্য পানির গুরুত্ব এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেয়। পৃথিবীতে পানি সহজলভ্য মনে হলেও নিরাপদ ও ব্যবহারযোগ্য পানির ওপর মানুষের জীবন নির্ভরশীল। তাই পানি পাওয়াকে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে না দেখে এর জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা ইসলামী শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

বৃষ্টির আরেকটি উপকারের কথাও কোরআনে এসেছে। বদর যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বৃষ্টির মাধ্যমে মুসলমানদের পবিত্রতা অর্জনের সুযোগ এবং মানসিক-শারীরিক প্রস্তুতির কথা সুরা আল-আনফালের ১১ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, আল্লাহ আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেছিলেন, যাতে তিনি তাদের পবিত্র করতে পারেন।

প্রকৃতির জন্য বৃষ্টি যেমন নতুন প্রাণের বার্তা নিয়ে আসে, তেমনি মানুষের জন্যও এটি আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামতের কথা স্মরণ করার সুযোগ তৈরি করে। একটি বৃষ্টির ফোঁটার পেছনে থাকা বিশাল প্রাকৃতিক ব্যবস্থার দিকে তাকালে মানুষের নিজের সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তাই বৃষ্টি নামলে শুধু ঠান্ডা আবহাওয়া কিংবা স্বস্তির অনুভূতি উপভোগ করাই নয়, আল্লাহর দেওয়া এই নিয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করা যেতে পারে। কারণ বৃষ্টি শুকনো মাটিকে যেমন সজীব করে, তেমনি আল্লাহর রহমত ও নিয়ামতের কথা স্মরণ করে কৃতজ্ঞ হওয়া মানুষের হৃদয়েও তৈরি করতে পারে নতুন প্রশান্তি। ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা ও শোকর—এই অনুভূতিগুলোই বৃষ্টিকে একজন মুমিনের কাছে শুধু প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, বরং সৃষ্টিকর্তার কুদরত স্মরণ করার একটি উপলক্ষ করে তুলতে পারে।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page