সরকারি উদ্যোক্তা ২০ লক্ষ টাকার ঋণ পেতে, যা যা শর্ত পূরণ করতে হবে

প্রকাশিত: বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:২৯ অপরাহ্ণ
সরকারি উদ্যোক্তা ২০ লক্ষ টাকার ঋণ পেতে, যা যা শর্ত পূরণ করতে হবে

২০ লাখ টাকা সমন্বিত অর্থায়ন পেতে তরুণ উদ্যোক্তাদের শর্ত

তরুণ উদ্যোক্তাদের ব্যবসা শুরু ও সম্প্রসারণে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত সমন্বিত অর্থায়নের সুযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে এই অর্থ পুরোপুরি ঋণ নয়। ‘উদ্যোগ (UDYOG): উপজেলাভিত্তিক তরুণ উদ্যোক্তা অনুসন্ধান, চিহ্নিতকরণ ও অর্থায়ন কর্মসূচি’র আওতায় সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ব্যাংক ঋণ এবং সমপরিমাণ ১০ লাখ টাকা অনুদান পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ এবং চূড়ান্ত বাছাইয়ের পরই এই অর্থায়ন পাওয়া যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের নীতিমালা অনুযায়ী, আবেদন গ্রহণের শেষ তারিখে আবেদনকারীর বয়স সর্বোচ্চ ২৮ বছর হতে হবে। পাশাপাশি তাকে সংশ্লিষ্ট উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। আবেদনকারীর নিজস্ব ব্যবসায়িক উদ্যোগ বা ব্যবসায়িক ধারণা থাকতে হবে, অথবা নতুন ব্যবসা স্থাপনের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা থাকতে হবে।

শুধু বয়স ও স্থায়ী বাসিন্দার শর্ত পূরণ করলেই অর্থায়ন নিশ্চিত হবে না। উদ্যোক্তাকে কী ধরনের ব্যবসা করবেন, ব্যবসাটি কীভাবে পরিচালনা করবেন এবং অর্থায়নের প্রয়োজন কতটুকু—এসব বিষয়ে যথাযথ প্রস্তাব দিতে হবে। ব্যবসার ধারণা ও পরিকল্পনার বাস্তবায়নযোগ্যতাও যাচাই করা হবে।

আগে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ঋণ নেওয়া থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এই কর্মসূচির আওতায় বিবেচিত হবেন না। একইভাবে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণখেলাপি ব্যক্তিও যোগ্য হবেন না। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, সিআইবি যাচাইয়ে ঋণখেলাপি হিসেবে প্রমাণিত হলে আবেদন বাতিল হবে।

সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদেরও এই কর্মসূচির আওতায় অর্থায়নের জন্য যোগ্য বিবেচনা করা হবে না। এ ছাড়া আবেদনকারী অসত্য তথ্য দিলে কিংবা অন্যের ব্যবসায়িক ধারণা নিজের নামে ব্যবহার করার প্রমাণ পাওয়া গেলে যেকোনো পর্যায়ে আবেদন বাতিল হতে পারে এবং তাকে কালো তালিকাভুক্ত করার বিধান রয়েছে।

অর্থায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ২০ লাখ টাকার কাঠামো। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, উদ্যোক্তার প্রকৃত ব্যবসায়িক চাহিদা ও প্রস্তাবিত ব্যয়ের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ‘ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্সিং’ নির্ধারণ করা যেতে পারে। এর মধ্যে ঋণ ও অনুদানের অনুপাত ৫০:৫০। অর্থাৎ সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ব্যাংক ঋণ এবং সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া যেতে পারে।

তবে প্রত্যেক নির্বাচিত উদ্যোক্তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ২০ লাখ টাকা পাওয়ার অধিকারী হবেন না। উদাহরণ হিসেবে, কোনো ব্যবসার জন্য যদি ১২ লাখ টাকা প্রয়োজন বলে মূল্যায়নে নির্ধারিত হয়, তাহলে সর্বোচ্চ ৬ লাখ টাকা ঋণ ও ৬ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হতে পারে। উদ্যোক্তার নিজস্ব বিনিয়োগ বা অন্য কোনো বৈধ উৎসের অর্থ থাকলে সেটিও অর্থায়ন পরিকল্পনায় বিবেচনা করা হবে।

এই কর্মসূচির আওতায় ঋণের বিপরীতে কোনো সহায়ক জামানত ছাড়াও ঋণ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ঋণনীতি এবং প্রযোজ্য অন্যান্য শর্ত অনুসরণ করতে হবে। একই ব্যবসার বিপরীতে একাধিক তহবিল থেকে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা নেওয়া যাবে না।

আবেদন করতে হলে সংশ্লিষ্ট উপজেলার যেকোনো তফসিলি ব্যাংকের শাখায় নির্ধারিত ফরমে আবেদন করা যাবে। যে ব্যাংকে আবেদন করা হবে, সেখানে আগে থেকেই হিসাব থাকা বাধ্যতামূলক নয়। সংশ্লিষ্ট উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার প্রমাণ হিসেবে ওয়ার্ড কমিশনার বা কাউন্সিলরের দেওয়া নাগরিক সনদ বা প্রত্যয়নপত্র জমা দিতে হবে।

আবেদনের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র, সর্বশেষ শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ থাকলে তার কপি, পাসপোর্ট সাইজের ছবি এবং যথাযথভাবে পূরণ করা আবেদন ফরম দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক, এসএমই পোর্টাল ও তফসিলি ব্যাংকগুলোর ওয়েবসাইট থেকে আবেদন ফরম ডাউনলোড করা যাবে। পাশাপাশি তফসিলি ব্যাংকের শাখা থেকেও ফরম সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে।

উদ্যোক্তা বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও একাধিক বিষয় বিবেচনা করা হবে। ব্যবসায়িক ধারণার যৌক্তিকতা ও বাস্তবায়নযোগ্যতা, বাজারের সম্ভাবনা, আর্থিক পরিকল্পনা, উদ্যোক্তার সক্ষমতা এবং কর্মসংস্থান তৈরির সম্ভাবনা মূল্যায়ন করা হবে। ফলে প্রাথমিক যোগ্যতা পূরণ করলেই অর্থায়ন নিশ্চিত হবে না।

চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়ার পরও ঋণ পাওয়া স্বয়ংক্রিয় নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, নির্বাচিত উদ্যোক্তার ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক নিজস্ব ঋণনীতি এবং প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান অনুসরণ করবে। চূড়ান্ত মনোনয়নের পর ব্যাংক ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে।

অনুদানের অর্থও নির্দিষ্ট নিয়মে ব্যবহার করতে হবে। ঋণের পাশাপাশি সমপরিমাণ অনুদান দেওয়া হবে এবং উভয় অর্থ উদ্যোক্তার ব্যাংক হিসাবে একই সময়ে এককালীন অনুমোদিত পূর্ণ পরিমাণে বিতরণ করা হবে। নগদে কোনো অর্থ দেওয়ার সুযোগ নেই। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে অথবা অনুদানের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার না করার বিষয়টি ধরা পড়লে বিতরণ করা অনুদানের সমপরিমাণ অর্থ ঋণে পরিণত হবে এবং তা সরকারি পাওনা হিসেবে আদায়যোগ্য হবে।

অর্থ ব্যবহারের বিষয়টিও ব্যাংক নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে। ব্যবসার অগ্রগতি, বিক্রি ও নগদ প্রবাহ, ঋণ পরিশোধের অবস্থা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির অগ্রগতির মতো বিষয় পর্যবেক্ষণের আওতায় থাকবে।

শুধু অর্থায়ন নয়, নির্বাচিত উদ্যোক্তাদের জন্য আরও কিছু সহায়তার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। কর্মসূচির আওতায় প্রত্যেক আবেদনকারীকে Financial Literacy Programme-এর আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। নির্বাচিত উদ্যোক্তারা উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞ মেন্টরের ধারাবাহিক পরামর্শ, ট্রেড লাইসেন্স ও টিআইএনসহ ব্যবসা নিবন্ধনে সহায়তা, Business Plan তৈরির পরামর্শ এবং বাজারসংযোগের সুযোগ পাবেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে ‘উদ্যোগ’ কর্মসূচির নীতিমালা জারি করেছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস ডিপার্টমেন্টের প্রকাশিত তালিকাতেও সার্কুলারটি রয়েছে।

অর্থাৎ, এই কর্মসূচির আওতায় ‘২০ লাখ টাকার ঋণ’ বলা পুরোপুরি সঠিক নয়। নীতিমালা অনুযায়ী এটি সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকার সমন্বিত অর্থায়ন, যার সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ঋণ এবং সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অনুদান। কত টাকা দেওয়া হবে, তা নির্ভর করবে উদ্যোক্তার প্রকৃত ব্যবসায়িক প্রয়োজন, ব্যয় পরিকল্পনা এবং চূড়ান্ত মূল্যায়নের ওপর।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page