১২ কোটি টাকার বিনিময়ে ১২০০ শিক্ষার্থীর ফল বদল!

শিক্ষা ও ক্যারিয়ার প্রতিনিধি
প্রকাশিত: সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ১০:০৩ পূর্বাহ্ণ
১২ কোটি টাকার বিনিময়ে ১২০০ শিক্ষার্থীর ফল বদল!

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ফল পরিবর্তনের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া চলছে।

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সাবেক পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও পরবর্তীতে সচিব নারায়ণ চন্দ্র নাথের বিরুদ্ধে নিজের ছেলের এইচএসসি ফল পরিবর্তনের অভিযোগের আগে ২০২১ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফল নিয়েও একই ধরনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল। ওই ঘটনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি ফলাফলে অনিয়ম ও নম্বর পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়ে শাস্তির সুপারিশ করেছিল। তবে অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা না নিয়ে বিষয়টি চাপা পড়ে যায়।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ২০২১ সালের এইচএসসি পরীক্ষার প্রায় ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তনের অভিযোগের বিষয়টি উঠে আসে। কমিটির দাবি, উত্তরপত্র যাচাই, পরীক্ষার্থীদের বক্তব্য এবং বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে নম্বর পরিবর্তনের অসংগতির প্রমাণ পাওয়া যায়।

তদন্ত কমিটির প্রধান ও পটিয়া সরকারি কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক জানান, কয়েকজন পরীক্ষার্থী তদন্ত কমিটিকে জানিয়েছিলেন, নম্বর পরিবর্তনের জন্য তাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছিল।

তিনি বলেন, পরীক্ষার্থীরা জানিয়েছিলেন, একেকজনের কাছ থেকে সর্বনিম্ন ৫০ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। তবে পরবর্তীতে ফলাফল নিয়ে জটিলতার আশঙ্কায় অনেক পরীক্ষার্থী বা অভিভাবক প্রকাশ্যে সাক্ষ্য দিতে আগ্রহ দেখাননি।

তদন্ত সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, যদি গড়ে একজন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ১ লাখ টাকা করে নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে প্রায় ১২ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ দাঁড়ায়।

তবে এই অর্থ লেনদেনের বিষয়টি তদন্ত প্রতিবেদনে কীভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তা নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, টাকার বিনিময়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন করা হয়েছিল।

২০২১ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয় ২০২২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি। ওই সময় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও সচিব ছিলেন অধ্যাপক আবদুল আলীম এবং পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দায়িত্বে ছিলেন নারায়ণ চন্দ্র নাথ।

ফল প্রকাশের দিনই বিভিন্ন অসঙ্গতির তথ্য পান বোর্ড চেয়ারম্যান। পরে বিষয়টি শিক্ষা উপমন্ত্রীকে জানানো হয়। এরপর পাঁচলাইশ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

২০২২ সালের ৩ মার্চ তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দেয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ফল প্রকাশের পর সকালে পরীক্ষার্থীরা এক ধরনের নম্বর দেখতে পান। পরে বিকালে ফলাফলের তথ্য পরিবর্তিত হয়ে যায়। এতে অনেক পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।

তদন্ত কমিটি চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ফল প্রকাশের দিন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও আইটি টিমের সদস্যরা ফল প্রসেসিং কক্ষে কাজ করেন।

তদন্তে সিস্টেম অ্যানালিস্ট কিবরিয়া মাসুদ খান জানান, ফল প্রকাশের পর পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নিজে আইটি কক্ষে গিয়ে ফল সংশোধনের কাজ করেছিলেন।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, একজন পরীক্ষার্থীর পদার্থবিজ্ঞানের নম্বরে ভুল থাকার বিষয় উল্লেখ করে সংশোধন করা হয়। এরপর আরও কিছু ফলাফলের ত্রুটি সংশোধন করা হয়েছিল।

তবে তদন্ত কমিটির মতে, যথাযথ অনুমোদন ও নিয়ম অনুসরণ না করায় পুরো ফল প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে পরীক্ষার ফলাফলের অনিয়মের জন্য পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নারায়ণ চন্দ্র নাথের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাকে শোকজও করেছিল বলে জানা গেছে।

তবে অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং কয়েক মাসের মধ্যেই তাকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।

পরে ২০২৩ সালে তিনি চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় নারায়ণ চন্দ্র নাথের ছেলে নক্ষত্র দেবনাথের ফলাফল নিয়েও অভিযোগ ওঠে।

অভিযোগ অনুযায়ী, নক্ষত্রের ১৪টি উত্তরপত্রে নম্বর পরিবর্তন করা হয়। রচনামূলক ও নৈর্ব্যক্তিক অংশ মিলিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে ২ থেকে ২৪ নম্বর পর্যন্ত বাড়িয়ে তাকে জিপিএ-৫ পাইয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়।

পরে বিষয়টি নিয়ে পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন হলে অভিযোগ সামনে আসে। এরপর নক্ষত্রের ফল বাতিল করা হয়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নারায়ণ চন্দ্র নাথকে ওএসডি করা হয়।

২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে এ ঘটনায় মামলা করা হয়। মামলায় নারায়ণ চন্দ্র নাথ, তার ছেলে নক্ষত্র দেবনাথসহ চারজনকে আসামি করা হয়েছে।

অন্য আসামিরা হলেন সাবেক সিস্টেম অ্যানালিস্ট কিবরিয়া মাসুদ খান এবং সাবেক চেয়ারম্যান মুস্তফা কামরুল আখতার।

চলতি বছরের ১৮ আগস্ট পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে বলে জানা গেছে।

পাবলিক পরীক্ষা আইন অনুযায়ী, পরীক্ষার উত্তরপত্রের নম্বর পরিবর্তন বা ফলাফল জালিয়াতির মতো অপরাধে কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

এ ঘটনায় বর্তমানে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

সূত্র: আগামীর সময়

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page