খাওয়ার আগে ও পরে কোন সুন্নতগুলো প্রায় হারিয়ে গেছে?

reporter
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬, ৮:৩৭ অপরাহ্ণ
খাওয়ার আগে ও পরে কোন সুন্নতগুলো প্রায় হারিয়ে গেছে?

খাবারের প্রতিটি মুহূর্তেই রয়েছে রাসুল (সা.)-এর সুন্দর সুন্নত।

খাবার মানুষের জীবনের একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় বিষয়। প্রতিদিন আমরা একাধিকবার খাবার গ্রহণ করি, কিন্তু খাবারের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনেক সুন্দর সুন্নত আজ আমাদের দৈনন্দিন জীবন থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, খাবারের প্রতি অমনোযোগ এবং দ্রুত খাওয়ার অভ্যাসের কারণে অনেকেই জানেন না যে, খাবার গ্রহণেরও রয়েছে ইসলামে শেখানো সুন্দর আদব ও সুন্নত। এসব আমলের অনেকগুলো খুবই সহজ এবং দৈনন্দিন খাবারের সময়ই পালন করা সম্ভব।

খাবারের আগে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো আল্লাহর নাম নিয়ে খাবার শুরু করা। তিনি বলেছেন, তোমাদের কেউ যখন খাবার খায়, তখন সে যেন আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। যদি শুরুতে বলতে ভুলে যায়, তাহলে মনে পড়ার পর বলবে, “বিসমিল্লাহি ফি আওয়ালিহি ওয়া আখিরিহি।” (জামে তিরমিজি)।

খাওয়া শুরু করার সময় বলা যায়—بِسْمِ اللَّهِ। বাংলা উচ্চারণ: বিসমিল্লাহ। অর্থ: আল্লাহর নামে। আর শুরুতে বলতে ভুলে গেলে বলা যায়—بِسْمِ اللَّهِ فِي أَوَّلِهِ وَآخِرِهِ। বাংলা উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি ফি আওয়ালিহি ওয়া আখিরিহি। অর্থ: শুরুতেও এবং শেষেও আল্লাহর নামে। এই ছোট আমলটি খাবারের শুরুতেই আল্লাহকে স্মরণ করার সুযোগ দেয়।

খাওয়ার সময় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত হলো ডান হাতে খাবার খাওয়া। রাসুলুল্লাহ (সা.) এক শিশুকে খাবারের আদব শেখানোর সময় বলেছেন, “আল্লাহর নাম বলো, ডান হাতে খাও এবং তোমার সামনে থেকে খাও।” (সহিহ মুসলিম)। তাই সক্ষম ব্যক্তি খাবার ও পানীয় গ্রহণের ক্ষেত্রে ডান হাত ব্যবহার করবেন—এটি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর স্পষ্ট নির্দেশনা। সহিহ মুসলিমে আরও এসেছে, রাসুল (সা.) বাম হাতে খাওয়া ও পান করা থেকে নিষেধ করেছেন।

খাবার পরিবেশন করা হলে অনেকেই একসঙ্গে অনেক খাবারের দিকে হাত বাড়ান। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) খাবারের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ও ভদ্রতার শিক্ষা দিয়েছেন। উমর ইবনে আবু সালামা (রা.)-কে তিনি নিজের সামনে থেকে খাবার খেতে বলেছিলেন। অর্থাৎ একই পাত্রে একাধিক মানুষ খাবার গ্রহণ করলে নিজের সামনের অংশ থেকেই খাওয়া সুন্দর সুন্নত আদব।

খাওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত না খাওয়াও ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো মানুষ পেটের চেয়ে খারাপ পাত্র আর পূর্ণ করে না। মানুষের জন্য কয়েক লোকমাই যথেষ্ট, যা তার পিঠ সোজা রাখে; আর যদি বেশি খেতেই হয়, তাহলে এক-তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানীয়ের জন্য এবং এক-তৃতীয়াংশ শ্বাসের জন্য রাখা উচিত। (জামে তিরমিজি)। এই শিক্ষা শুধু স্বাস্থ্যগত দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং খাবারের প্রতি সংযম ও কৃতজ্ঞতারও শিক্ষা দেয়।

খাবারের অপচয় না করাও ইসলামের সুন্দর শিক্ষা। অনেক সময় প্লেটে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খাবার নেওয়া হয় এবং পরে তা ফেলে দেওয়া হয়। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) খাবারের অবশিষ্ট অংশের মধ্যেও বরকত থাকতে পারে বলে শিক্ষা দিয়েছেন। সহিহ মুসলিমে এসেছে, তিনি খাবার শেষ করার পর আঙুল চেটে নেওয়া এবং পাত্র পরিষ্কার করে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, কারণ খাবারের কোন অংশে বরকত রয়েছে তা মানুষ জানে না।

এখানে আঙুল চেটে নেওয়ার সুন্নতটি বর্তমান সময়ে অনেকের কাছে অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। তবে এর অর্থ অপরিচ্ছন্নভাবে খাবার খাওয়া নয়। বরং খাবার খাওয়ার পর হাত পরিষ্কার করার আগে খাবারের সঙ্গে লেগে থাকা অংশটুকু নষ্ট না করার কথা হাদিসে এসেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) তিন আঙুলে খাবার খেতেন এবং খাবার শেষ হলে আঙুল চেটে নিতেন। (সহিহ মুসলিম)। স্বাস্থ্যবিধি মেনে এই সুন্নত পালন করা যেতে পারে।

খাবারের কোনো লোকমা অসাবধানতাবশত মাটিতে বা অন্য কোথাও পড়ে গেলে সেটিও হাদিসে উল্লেখিত একটি বিষয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, খাবারের লোকমা পড়ে গেলে তার সঙ্গে লেগে থাকা ময়লা সরিয়ে তা খেয়ে নিতে এবং শয়তানের জন্য তা ছেড়ে না দিতে। (সহিহ মুসলিম)। তবে বর্তমান সময়ে স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে। খাবার যদি এমন স্থানে পড়ে যেখানে তা নিরাপদে পরিষ্কার করা সম্ভব নয় বা দূষিত হয়ে যায়, তাহলে তা খাওয়া উচিত নয়। হাদিসের উদ্দেশ্য খাবারের অপচয় না করা এবং খাবারের প্রতি অবহেলা না করা।

খাবার শেষে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। খাবার শেষ করার পর এই দোয়াটি পড়া যায়—

الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَطْعَمَنِي هَذَا وَرَزَقَنِيهِ مِنْ غَيْرِ حَوْلٍ مِنِّي وَلَا قُوَّةٍ

বাংলা উচ্চারণ: আলহামদু লিল্লাহিল্লাজি আতআমানি হাজা ওয়া রাযাকানিহি মিন গাইরি হাওলিন মিননি ওয়ালা কুওয়াহ।

অর্থ: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাকে এই খাবার খাইয়েছেন এবং আমার কোনো শক্তি ও সামর্থ্য ছাড়াই তা আমাকে রিজিক হিসেবে দিয়েছেন। এই দোয়াটি জামে তিরমিজিতে বর্ণিত হয়েছে এবং সেখানে হাদিসটিকে হাসান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

খাবার শেষে শুধু দোয়া পড়াই নয়, আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যে খাবার খাচ্ছি, সেটি আমাদের নিজের শক্তিতে তৈরি হয়নি। কৃষকের পরিশ্রম, বৃষ্টি, মাটি, বীজ, সূর্যের আলো এবং অসংখ্য নিয়ামতের সমন্বয়ে খাদ্য আমাদের কাছে পৌঁছায়। আর ইসলামের দৃষ্টিতে এসব নিয়ামতের প্রকৃত দাতা আল্লাহ। তাই খাবার শেষে আল্লাহর প্রশংসা করা একজন মুমিনের কৃতজ্ঞতার প্রকাশ।

খাবারের সময় খাবারকে গালি বা অপমান না করাও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর গুরুত্বপূর্ণ আদব। সহিহ বুখারিতে এসেছে, রাসুল (সা.) কোনো খাবার পছন্দ হলে খেতেন, আর অপছন্দ হলে তা না খেয়ে রেখে দিতেন; তিনি খাবারকে দোষারোপ করতেন না। এই শিক্ষা আমাদের বর্তমান জীবনেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কোনো খাবার পছন্দ না হলে সেটিকে অপমান না করে নীরবে এড়িয়ে যাওয়াই সুন্দর আচরণ।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো খাবার গ্রহণের সময় অন্যদের প্রতি খেয়াল রাখা। খাবারের পাত্রে নিজের হাত যত্রতত্র না চালিয়ে নিজের সামনে থেকে খাওয়া, খাবারের প্রতি সম্মান দেখানো এবং অন্যদের অসুবিধা না করা—এসবের মধ্যেও ইসলামের সুন্দর শিষ্টাচার রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) শিশু সাহাবিদেরও খাবারের আদব শেখাতেন। এতে বোঝা যায়, খাবারের সুন্নত শুধু বড়দের জন্য নয়; ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের এসব অভ্যাস শেখানো উচিত।

বর্তমান সময়ে খাবারের সঙ্গে মোবাইল ফোনের ব্যবহারও একটি সাধারণ অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। খাবারের সময় মোবাইল দেখা সরাসরি হারাম—এমন কথা বলা ঠিক হবে না। তবে খাবারের প্রতি মনোযোগ, আল্লাহর নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং পরিবারের সঙ্গে সুন্দর আচরণ বজায় রাখা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। খাবারকে শুধু দ্রুত শেষ করার বিষয় না বানিয়ে আল্লাহর নিয়ামত হিসেবে গ্রহণ করা ইসলামের আদবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

খাবারের সুন্নতগুলোকে “প্রায় হারিয়ে গেছে” বলার অর্থ এই নয় যে এগুলো একেবারেই কেউ পালন করেন না। বরং অনেক মুসলমান এসব সুন্নত সম্পর্কে জানেন না বা নিয়মিত পালন করেন না। বিশেষ করে খাবার শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা, ডান হাতে খাওয়া, নিজের সামনে থেকে খাওয়া, খাবারের অপচয় না করা এবং খাবার শেষে আল্লাহর প্রশংসা করা—এসব খুব সহজ আমল, যা প্রতিদিনের জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

সবচেয়ে সুন্দর বিষয় হলো, এসব সুন্নত পালন করতে আলাদা কোনো সময় বের করতে হয় না। প্রতিদিনের খাবারই হয়ে উঠতে পারে সুন্নত পালনের একটি সুযোগ। সকালের নাশতা, দুপুরের খাবার কিংবা রাতের খাবার—প্রতিবার খাবারের আগে আল্লাহর নাম নেওয়া এবং শেষে তাঁর শুকরিয়া আদায় করা যায়। এতে সাধারণ একটি দৈনন্দিন কাজও একজন মুমিনের জন্য সওয়াবের আমলে পরিণত হতে পারে, ইনশাআল্লাহ।

আজকের শিক্ষা: খাবারের সময় শুধু পেট ভরানো নয়, আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়াও জরুরি। খাবারের আগে বিসমিল্লাহ বলা, ডান হাতে খাওয়া, নিজের সামনে থেকে খাওয়া, খাবারের অপচয় না করা এবং শেষে আল্লাহর প্রশংসা করা—এসব সহজ সুন্নত

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page