কবরের আযাব থেকে বাঁচতে যে সহজ আমলটি শিখিয়েছেন রাসুল (সা.)

reporter
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ৮:৩১ অপরাহ্ণ
কবরের আযাব থেকে বাঁচতে যে সহজ আমলটি শিখিয়েছেন রাসুল (সা.)

কবরের আযাব থেকে আশ্রয় চেয়ে সুন্নত অনুযায়ী জীবন গড়ার শিক্ষা।

মৃত্যুর পরের জীবন সম্পর্কে একজন মুমিনের বিশ্বাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কবরের জীবন ও আখিরাতের বাস্তবতা। কোরআন ও সহিহ হাদিসে কবরের আযাব থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার শিক্ষা রয়েছে। তাই একজন মুসলমানের জন্য জীবিত অবস্থায় এমন আমল করা গুরুত্বপূর্ণ, যা তাকে আল্লাহর রহমতের অধিকারী হতে সাহায্য করবে এবং কবরের শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর কাছে আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ তৈরি করবে। এ বিষয়ে সবচেয়ে সহজ ও সরাসরি সুন্নত আমলগুলোর একটি হলো নামাজে নিয়মিত কবরের আযাব থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া।

রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজে কবরের আযাব থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) এই দোয়া করতেন—

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ، وَمِنْ عَذَابِ النَّارِ، وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ، وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ

বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিকা মিন আযাবিল কবরি, ওয়া মিন আযাবিন্নার, ওয়া মিন ফিতনাতিল মাহইয়া ওয়াল মামাতি, ওয়া মিন ফিতনাতিল মাসিহিদ দাজ্জাল।

অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে কবরের আযাব থেকে, জাহান্নামের আযাব থেকে, জীবন ও মৃত্যুর ফিতনা থেকে এবং মসিহ দাজ্জালের ফিতনা থেকে আশ্রয় চাই। সহিহ বুখারিতে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজে এই দোয়ার মাধ্যমে এসব বিষয় থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন।

কবরের আযাব থেকে বাঁচার বিষয়টি শুধু একটি দোয়া পড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইসলামে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, আমল ও চরিত্রের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। সহিহ বুখারিতে হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) দুটি কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলেছিলেন, সেখানে থাকা দুজন ব্যক্তি শাস্তি পাচ্ছেন। তাদের একজন প্রস্রাব থেকে নিজেকে যথাযথভাবে রক্ষা করতেন না এবং অন্যজন মানুষের মধ্যে চোগলখুরি বা নামিমাহ করতেন।

এই হাদিস থেকে একজন মুসলমানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়। পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে অবহেলা করা যেমন বিপদের কারণ হতে পারে, তেমনি মানুষের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ সৃষ্টি করে এমন কথা এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেওয়াও গুরুতর গুনাহ। তাই কবরের আযাব থেকে বাঁচতে চাইলে শুধু মুখে দোয়া পড়াই যথেষ্ট নয়; নিজের কথাবার্তা ও কাজকর্মও সংশোধন করতে হবে।

বিশেষ করে চোগলখুরি, পরনিন্দা ও মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে এমন কথাবার্তা থেকে বেঁচে থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে একজনের কথা মুহূর্তের মধ্যে অনেক মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। কারও ব্যক্তিগত কথা অনুমতি ছাড়া ছড়িয়ে দেওয়া, একজনের কাছে অন্যজনের নামে এমন কথা বলা যা তাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করতে পারে, কিংবা যাচাই না করে কারও বিরুদ্ধে কথা প্রচার করা—এসব থেকে একজন মুসলমানের সতর্ক থাকা উচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসে নামিমাহর ব্যাপারে যে সতর্কতা এসেছে, তা আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও প্রযোজ্য।

একইভাবে প্রস্রাব থেকে শরীর ও কাপড়কে যথাযথভাবে পবিত্র রাখা ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পবিত্রতা নামাজের জন্যও অপরিহার্য। তাই টয়লেট ব্যবহারের পর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে অবহেলা না করা, শরীর ও কাপড়ে অপবিত্রতা লেগে থাকলে তা পরিষ্কার করা এবং নামাজের আগে পবিত্রতার বিষয়টি নিশ্চিত করা একজন মুসলমানের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

কবরের আযাব থেকে বাঁচার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হলো তাওবা ও গুনাহ থেকে ফিরে আসা। মানুষ ভুল করতেই পারে, কিন্তু ভুলের পর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং সেই গুনাহ ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করা জরুরি। কোরআনে আল্লাহ তাআলা তাঁর রহমত থেকে নিরাশ না হতে বলেছেন। তাই জীবনে যত ভুলই হয়ে থাকুক, মৃত্যুর আগে তাওবার দরজা খোলা আছে। একজন মানুষ যদি আন্তরিকভাবে নিজের গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হয়, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় এবং সংশোধনের চেষ্টা করে, তাহলে সে আল্লাহর রহমতের আশা করতে পারে।

এ ক্ষেত্রে বেশি বেশি ইস্তিগফার করা একটি সুন্দর আমল। যেমন—

أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ

বাংলা উচ্চারণ: আস্তাগফিরুল্লাহ।

অর্থ: আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই।

এই ছোট জিকিরটি সহজেই পড়া যায়। তবে শুধু মুখে ইস্তিগফার করার পাশাপাশি নিজের গুনাহ থেকে ফিরে আসার চেষ্টা করাও জরুরি। কারও হক নষ্ট করে থাকলে তা ফিরিয়ে দেওয়া এবং কারও প্রতি অন্যায় করে থাকলে সম্ভব হলে ক্ষমা চাওয়াও তাওবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

নামাজের গুরুত্বও এখানে বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার। রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজের মধ্যে কবরের আযাব থেকে আশ্রয় চাইতেন। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, কবরের আযাব সম্পর্কে রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করার পর তিনি তাঁকে কবরের আযাব থেকে আশ্রয় চাইতে দেখেছেন এবং এরপর তিনি নামাজে এ দোয়া করতে থাকেন। তাই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ঠিকভাবে আদায় করা এবং নামাজের মধ্যে এই দোয়া পড়ার অভ্যাস করা একজন মুসলমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বলা দরকার—কোনো একটি আমলকে এমনভাবে প্রচার করা ঠিক নয় যে, সেটি করলেই নিশ্চিতভাবে কবরের আযাব থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। চূড়ান্ত মুক্তি আল্লাহর রহমতের ওপর নির্ভরশীল। তবে রাসুলুল্লাহ (সা.) যে আমলগুলো শিখিয়েছেন, সেগুলো অনুসরণ করা এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করা একজন মুমিনের কর্তব্য।

কবরের আযাব থেকে বাঁচার জন্য তাই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়া দরকার। নামাজ ঠিক রাখা, পবিত্রতার ব্যাপারে যত্নবান হওয়া, মানুষের হক নষ্ট না করা, চোগলখুরি ও পরনিন্দা থেকে দূরে থাকা, হারাম কাজ থেকে বেঁচে থাকা, নিয়মিত তাওবা করা এবং আল্লাহর কাছে কবরের আযাব থেকে আশ্রয় চাওয়া—এসবই একজন মুসলমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পথ।

আজ থেকেই একটি সহজ অভ্যাস করা যেতে পারে। প্রতিটি নামাজের শেষ বৈঠকে তাশাহহুদ ও দরুদ পড়ার পর সালাম ফেরানোর আগে এই দোয়াটি পড়া। এতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত জীবনের অংশ হয়ে যাবে। একই সঙ্গে নিজের কথাবার্তা, উপার্জন, লেনদেন ও দৈনন্দিন আমল পর্যালোচনা করা দরকার। কারণ কবরের জীবনের প্রস্তুতি মৃত্যুর পরে নয়, বরং জীবিত অবস্থাতেই নিতে হয়।

সবশেষে মনে রাখতে হবে, কবরের আযাবের বিষয়টি ভয়ের পাশাপাশি আত্মশুদ্ধিরও একটি শিক্ষা। একজন মুমিন শুধু শাস্তির ভয়ে আমল করবে না; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি ও রহমতের আশায় নিজেকে সংশোধন করবে। প্রতিদিনের ছোট ছোট আমল, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা, মানুষের হক আদায় করা এবং আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে আশ্রয় চাওয়া—এসবের মাধ্যমেই একজন মানুষ আখিরাতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে পারে।

আজকের শিক্ষা: নামাজে নিয়মিত কবরের আযাব থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চান, পবিত্রতার ব্যাপারে সতর্ক থাকুন, চোগলখুরি ও পরনিন্দা থেকে দূরে থাকুন এবং নিয়মিত তাওবা ও ইস্তিগফার করুন। কোনো আমলকে নিশ্চিত মুক্তির গ্যারান্টি না ভেবে আল্লাহর রহমতের ওপর ভরসা করে সুন্নত অনুযায়ী জীবন গড়ে তোলাই মুমিনের পথ।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page