টিসিবির চাল কিনতে গিয়ে দেয়ালধসে প্রাণ গেল নাসিমার
মিরপুরে টিসিবির লাইনে দাঁড়িয়ে নিহত নাসিমা বেগম
এক মুঠো সাশ্রয়ের আশায় সেদিন দুপুরে খাবারও খাওয়া হয়নি নাসিমা বেগমের। কর্মস্থলের মধ্যাহ্ন বিরতিতে দ্রুত টিসিবির ট্রাকের সামনে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন কয়েক কেজি স্বল্পমূল্যের চাল কিনবেন বলে। কিন্তু পরিবারের জন্য কিছু টাকা বাঁচানোর সেই ছোট্ট চেষ্টা মুহূর্তেই পরিণত হয় জীবনের শেষ যাত্রায়। হঠাৎ বিকট শব্দে ভেঙে পড়ে পাশের সীমানাপ্রাচীর, আর তার নিচেই চাপা পড়ে নিভে যায় সংগ্রামী এই নারীর জীবন।
মঙ্গলবার দুপুর প্রায় ১টা ২৭ মিনিটে রাজধানীর মিরপুর-২ এলাকায় মিরপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সীমানাপ্রাচীরের একটি বড় অংশ ধসে পড়ে। সে সময় কলেজসংলগ্ন স্থানে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ট্রাক থেকে স্বল্পমূল্যের চাল কিনতে দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করছিলেন অনেক মানুষ। দেয়াল ধসের ঘটনায় নাসিমা বেগমসহ দুইজন নিহত হন। আহত হন অন্তত ছয়জন। আহতদের উদ্ধার করে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়।
নিহত নাসিমা বেগমের বয়স ছিল ৪৫ বছর। তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। মাসে প্রায় ১৩ হাজার টাকা বেতনেই চলত পুরো সংসার। কয়েক বছর আগে প্রবাসে থাকা স্বামী অসুস্থ হয়ে কর্মক্ষমতা হারানোর পর সংসারের প্রায় সব দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে। বৃদ্ধা মা, সন্তান এবং পরিবারের নিত্যদিনের খরচ চালাতে প্রতিদিন ভোর থেকে পরিশ্রম করতেন তিনি।
স্বজনরা জানিয়েছেন, প্রতিটি টাকার হিসাব করে সংসার চালাতে হতো নাসিমাকে। তাই বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামে চাল পাওয়া যাবে শুনেই কর্মস্থল থেকে অল্প সময়ের ছুটি নিয়ে টিসিবির লাইনে দাঁড়ান। তার ইচ্ছা ছিল চাল কিনে দ্রুত কাজে ফিরে যাবেন। কিন্তু কয়েক কেজি চাল আর ঘরে নিয়ে ফেরা হলো না।
দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে পড়াদের উদ্ধারে এগিয়ে আসেন সবাই। পরে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় আহতদের হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে নাসিমাকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
নাসিমার মৃত্যুর পর সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছে তার পরিবার। যে মানুষটি প্রতিদিনের আয়ে পরিবারের চুলা জ্বালিয়ে রাখতেন, তার অনুপস্থিতিতে এখন পরিবারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। স্বজনদের কান্নায় বারবার উঠে এসেছে একটাই প্রশ্ন—স্বল্পমূল্যের কয়েক কেজি চাল কিনতে গিয়ে কেন প্রাণ দিতে হলো একজন শ্রমজীবী নারীকে?
দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কেন সীমানাপ্রাচীরটি ধসে পড়ল, সেটি খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে পুরোনো অবকাঠামো, সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাত এবং রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়গুলো তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, যেসব স্থানে নিয়মিত জনসমাগম হয়, সেখানে পুরোনো ভবন ও সীমানাপ্রাচীরের নিরাপত্তা নিয়মিত পরীক্ষা করা জরুরি। বিশেষ করে টিসিবির বিক্রয়কেন্দ্রে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষ লাইনে দাঁড়ান। তাই এমন স্থানে নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে ভবিষ্যতেও বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকে যায়।
নাসিমার মৃত্যু কেবল একটি দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান নয়। এটি সেই মানুষগুলোর গল্প, যারা প্রতিদিন সীমিত আয়ে পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে নিরন্তর সংগ্রাম করেন। কয়েক কেজি কম দামের চালের আশায় লাইনে দাঁড়ানো এক নারীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আবারও সামনে এলো নগর নিরাপত্তা, অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিম্নআয়ের মানুষের জীবনের কঠিন বাস্তবতা।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
