শিশুদের মধ্যে বাড়ছে ডেঙ্গু, আগস্ট, সেপ্টেম্বরে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির আশঙ্কা
চলতি বছরে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত প্রতি পাঁচজনের একজনই ১৫ বছরের কম বয়সী শিশু।
দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ এবার নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে শিশুদের নিয়ে। চলতি বছরের পরিসংখ্যান বলছে, ডেঙ্গু আক্রান্ত প্রতি পাঁচজনের একজনই ১৫ বছরের কম বয়সী শিশু। একই সঙ্গে রাজধানীর বাইরে দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পরিস্থিতি নিয়ে সতর্কতা জানিয়েছেন। তাঁদের আশঙ্কা, বর্ষার তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন ৯৪ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছরে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৭৭০ জনে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট আক্রান্তের মধ্যে ১ হাজার ৮১৮ জনের বয়স ১৫ বছর বা তার কম, যা মোট রোগীর প্রায় ১৯ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি পাঁচজন আক্রান্তের মধ্যে একজনই শিশু।
এর মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ৫৮৪ জন, যা মোট রোগীর প্রায় ৬ শতাংশ। এছাড়া ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী ৫৬৩ জন এবং ১১ থেকে ১৫ বছর বয়সী ৬৬৩ জন শিশু ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে।
অন্যদিকে, ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী আক্রান্তের সংখ্যা ৩ হাজার ৮৬৪ জন। সব মিলিয়ে ৩০ বছরের কম বয়সী রোগীর সংখ্যা ৫ হাজার ৬৮০, যা মোট আক্রান্তের প্রায় ৫৯ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু ও কর্মক্ষম তরুণদের মধ্যে সংক্রমণ বাড়তে থাকায় হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চলতি বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো রাজধানীর বাইরে সংক্রমণের বিস্তার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মোট আক্রান্তের ৭৬ শতাংশই ঢাকার বাইরের বাসিন্দা।
বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে সবচেয়ে বেশি রোগী বরিশাল বিভাগে, যেখানে আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৪৪৩ জন। অর্থাৎ মোট রোগীর প্রায় ২৫ দশমিক ১৭ শতাংশ, বা প্রতি চারজন আক্রান্তের একজন বরিশাল বিভাগের বাসিন্দা।
এরপর রয়েছে— চট্টগ্রাম বিভাগ: ১ হাজার ৭২১ জন, খুলনা বিভাগ: ১ হাজার ২৭৬ জন, ময়মনসিংহ বিভাগ: ৩৩৯ জন, রাজশাহী বিভাগ: ৩২৪ জন, সিলেট বিভাগ: ৮০ জন,রংপুর বিভাগ: ৭৪ জন । বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৯১২ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
একসময় ডেঙ্গু মূলত রাজধানী ঢাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরের তথ্য বলছে, এখন এটি সারা দেশের জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী—
১। ২০২১ সালে ঢাকার বাইরের রোগী ছিল ১৬ শতাংশ।
২। ২০২২ সালে বেড়ে হয় ৩৭ শতাংশ।
৩। ২০২৩ সালে দাঁড়ায় ৬৫ শতাংশ।
৪। ২০২৪ সালে ছিল ৬০ শতাংশ।
৫। ২০২৫ সালে বেড়ে হয় ৬৯ শতাংশ।
৬। আর ২০২৬ সালে সেই হার পৌঁছেছে ৭৬ শতাংশে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রবণতা প্রমাণ করে যে ডেঙ্গু এখন আর শুধু রাজধানীর সমস্যা নয়; এটি জাতীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। ঢাকার ২৫০ শয্যা টিবি হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আয়শা আক্তার বলেন, ২০১৫ সালের আগে ডেঙ্গু মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক ছিল। এরপর ধীরে ধীরে দেশের অন্যান্য জেলাতেও সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, এডিস মশার ঘনত্ব, বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা এবং আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বিশ্লেষণ করে নিয়মিত পূর্বাভাস তৈরি করা হয়।
বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী তাঁর আশঙ্কা, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গুর সংক্রমণ আরও ভয়াবহ হতে পারে। তিনি বলেন, এখনই কার্যকরভাবে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
জনস্বাস্থ্যবিদ ও রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার (সিডিসি) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ বলেন, গত ২৫ বছরেও রাজধানীতে কার্যকরভাবে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়নি। আর ঢাকার বাইরের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা তুলনামূলক কম হওয়ায় পরিস্থিতি মোকাবিলা আরও কঠিন হতে পারে। তাঁর মতে, ওয়ার্ডভিত্তিক নিয়মিত জরিপ, আধুনিক গবেষণাগার, প্রশিক্ষিত কীটতত্ত্ববিদ এবং সুস্পষ্ট মশক নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা ছাড়া ডেঙ্গুর স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
