মেসি-ইয়ামালের সেই ঐতিহাসিক ছবি: বাথটাব থেকে বিশ্বকাপ ফাইনালের মঞ্চে

ক্রীড়া প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬, ৯:২৭ পূর্বাহ্ণ
মেসি-ইয়ামালের সেই ঐতিহাসিক ছবি: বাথটাব থেকে বিশ্বকাপ ফাইনালের মঞ্চে

২০০৭ সালের সেই ছবি, যেখানে লিওনেল মেসি ও শিশু লামিনে ইয়ামাল এক ফ্রেমে ছিলেন।

২০০৭ সালের ডিসেম্বর। বার্সেলোনার একটি স্টুডিওতে তৈরি করা হয়েছিল ছোট্ট একটি প্লাস্টিকের বাথটাব। তাতে রাখা হয়েছিল পানি। ক্যামেরার সামনে বসানো হয়েছিল লাজুক স্বভাবের ২০ বছর বয়সী এক তরুণ ফুটবলারকে। এরপর তার কোলে তুলে দেওয়া হয় পাঁচ মাস বয়সী এক শিশুকে।

সেদিন কেউ জানত না, এই সাধারণ একটি ফটোশুট কয়েক বছর পর ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে উঠবে। সেই তরুণ ফুটবলার ছিলেন লিওনেল মেসি, আর কোলে থাকা শিশুটি ছিলেন ভবিষ্যতের স্প্যানিশ তারকা লামিনে ইয়ামাল।

বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনা ও স্পেনের মুখোমুখি হওয়ার আগে আবারও আলোচনায় ফিরে এসেছে সেই ছবি। কারণ একসময় যে শিশুকে কোলে নিয়েছিলেন মেসি, সেই ইয়ামালই এখন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় তারকা হয়ে দাঁড়িয়েছেন এবং মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন নিজের শৈশবের সেই ছবির নায়ক মেসির।

ছবিটি ছিল বার্সেলোনা ফাউন্ডেশন ও কাতালান সংবাদমাধ্যম দিয়ারিও স্পোর্তের একটি দাতব্য ক্যালেন্ডার প্রকল্পের অংশ। প্রতি বছর বার্সেলোনার ফুটবলারদের সঙ্গে শিশুদের ছবি তুলে সেই ক্যালেন্ডার তৈরি করা হতো। বিক্রির অর্থ ব্যয় করা হতো ইউনিসেফসহ বিভিন্ন মানবিক উদ্যোগে।

সেই আয়োজনের জন্য বার্সেলোনার ১২ জন ফুটবলারকে বেছে নেওয়া হয়েছিল। বছরের ১২ মাসের প্রতীক হিসেবে প্রতিটি খেলোয়াড়ের সঙ্গে একটি করে শিশুকে যুক্ত করা হয়েছিল। অনেক পরিবারের অংশগ্রহণ থাকলেও বেশির ভাগ ছবিই সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেছে। কিন্তু মেসি ও ইয়ামালের ছবিটি যেন অন্য এক গল্পের জন্য অপেক্ষা করছিল।

ছবিটির আলোকচিত্রী হুয়ান মনফোর্ত পরে জানিয়েছিলেন, সেই ছবি তোলা মোটেও সহজ ছিল না। তার ভাষায়, এটি ছিল অত্যন্ত কঠিন একটি ফটোশুট। কারণ একজন তরুণ ফুটবলার ও মাত্র পাঁচ মাস বয়সী শিশুর মধ্যে স্বাভাবিক মুহূর্ত তৈরি করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।

সেই সময় মেসি আজকের মতো বিশ্বজুড়ে পরিচিত মহাতারকা ছিলেন না। তিনি ছিলেন বার্সেলোনার প্রতিভাবান এক তরুণ খেলোয়াড়। রোনালদিনিও, স্যামুয়েল ইতো, জাভি, ইনিয়েস্তা, পুয়োলদের মতো তারকাদের ভিড়ে নিজের জায়গা তৈরি করার পথে ছিলেন তিনি।

মনফোর্ত বলেন, মেসি তখন অনেক বেশি লাজুক ছিলেন। শুরুতে শিশুটির সঙ্গে তার স্বাভাবিক যোগাযোগ হচ্ছিল না। পরিস্থিতি কিছুটা অস্বস্তিকর ছিল। তবে ধীরে ধীরে পরিবেশ স্বাভাবিক হয়ে আসে এবং শেষ পর্যন্ত তৈরি হয় সেই ঐতিহাসিক ছবি।

এই ছবির পেছনে বড় ভূমিকা ছিল ইয়ামালের মা শেইলা এবানার। শিশুটি যেন স্বস্তিতে থাকে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন তিনি। কারণ ছোট্ট শিশুর সঙ্গে এমন একটি ছবি তুলতে পরিবারের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

ইয়ামালের পরিবার তখন বার্সেলোনা থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের মাতারো শহরে থাকত। ছোট্ট শিশুকে নিয়ে ক্যাম্প ন্যুতে আসা, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা—সবকিছুই ছিল কষ্টসাধ্য। কিন্তু সেই যাত্রাই তৈরি করে দিয়েছিল ফুটবল ইতিহাসের এক অনন্য মুহূর্ত।

পরিবারটি পরে ছবির একটি কপি উপহার হিসেবে পেয়েছিল। কয়েক বছর পর সেই মাতারো থেকেই শুরু হয় ইয়ামালের ফুটবল যাত্রা। ২০১৪ সালে তিনি যোগ দেন বার্সেলোনার বিখ্যাত লা মাসিয়া একাডেমিতে।

এরপর ইয়ামালের ক্যারিয়ার এগিয়েছে অবিশ্বাস্য গতিতে। ২০২৩ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে বার্সেলোনার মূল দলে অভিষেক হয় তার। একই বছর ১৬ বছর বয়সে স্পেন জাতীয় দলে অভিষেক করে তিনি সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড়দের একজন হিসেবে ইতিহাস গড়েন।

২০২৪ ইউরো জয়ে স্পেন দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে ওঠেন ইয়ামাল। বর্তমানে তিনি স্প্যানিশ ফুটবলের অন্যতম বড় প্রতীক।

২০২৪ ইউরোর সময় ইয়ামালের বাবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই পুরোনো ছবিটি প্রকাশ করলে তা দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়। তখন আলোকচিত্রী মনফোর্তও জানতে পারেন, সেই শিশুটি আসলে কে ছিল।

মনফোর্তের মতে, হাজার হাজার ছবির মধ্যে একটি ছবি এভাবে ইতিহাস হয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব একটি ঘটনা। তিনি এটিকে লটারিতে জেতার মতো বিরল ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

ফুটবল ইতিহাসে এমন কিছু ছবি রয়েছে, যেগুলো শুধু একটি মুহূর্ত নয়, একটি যুগের গল্প বলে। মেসি-ইয়ামালের এই ছবিও এখন সেই তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে।

২০০৭ সালে বাথটাবে থাকা পাঁচ মাসের শিশুটি আজ বিশ্বকাপ ট্রফির জন্য লড়াই করতে প্রস্তুত। আর তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকবেন সেই মানুষটি, যিনি একদিন তাকে কোলে নিয়েছিলেন—লিওনেল মেসি।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন