লামিন ইয়ামাল: স্পেন যদি কবিতা হয়, তার কিশোর কবি এই বিস্ময় বালক

ক্রীড়া প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬, ৬:০১ অপরাহ্ণ
লামিন ইয়ামাল: স্পেন যদি কবিতা হয়, তার কিশোর কবি এই বিস্ময় বালক

বিশ্বকাপে স্পেনের আক্রমণের অন্যতম ভরসা কিশোর তারকা লামিন ইয়ামাল।

ফুটবলে মাঝে মাঝে এমন কিছু প্রতিভার আবির্ভাব ঘটে, যারা বয়সের প্রচলিত সংজ্ঞাকেই বদলে দেয়। জন্মসনদ তখন কেবল একটি সংখ্যা, অভিজ্ঞতার হিসাব হয়ে পড়ে অপ্রাসঙ্গিক। লামিন ইয়ামাল ঠিক তেমনই এক বিস্ময়। বল যখন তার বাঁ পায়ে আসে, গ্যালারিতে বসা হাজারো দর্শক যেন নিঃশ্বাস আটকে অপেক্ষা করেন—এবার কী জাদু দেখাবেন এই কিশোর?

স্পেন যদি একটি কবিতা হয়, তবে সেই কবিতার সবচেয়ে সুন্দর পঙ্‌ক্তির নাম লামিন ইয়ামাল। আর যদি স্পেনকে রঙের ক্যানভাস ধরা হয়, তাহলে ইয়ামাল সেই শিল্পী, যার প্রতিটি স্পর্শে ফুটে ওঠে নতুন এক ছবি। ২০২৬ বিশ্বকাপে তার ফুটবল শুধু ম্যাচের ফল বদলাচ্ছে না, বদলে দিচ্ছে মানুষের কল্পনাও।

মাঠে ইয়ামালের সবচেয়ে বড় শক্তি তার নির্ভীকতা। সামনে যত বড় ডিফেন্ডারই থাকুক, তার চোখে ভয় নেই। তিনি যেন পাড়ার মাঠের সেই ছেলেটিই রয়ে গেছেন, যে আনন্দ নিয়ে ফুটবল খেলে। একটি ড্রিবল, শরীরের হালকা মোচড়, তারপর বাঁ পায়ের নিখুঁত ছোঁয়ায় মুহূর্তেই বদলে যায় ম্যাচের দৃশ্যপট।

শুধু গোল করাই নয়, গোল তৈরিতেও অসাধারণ দক্ষ এই স্প্যানিশ উইঙ্গার। কখনো নিখুঁত থ্রু পাস, কখনো ডান প্রান্ত থেকে ভেতরে ঢুকে প্রতিপক্ষের রক্ষণে বিভ্রান্তি তৈরি করা—সব মিলিয়ে তিনি এমন একজন ফুটবলার, যার পরবর্তী পদক্ষেপ আগে থেকে অনুমান করা প্রায় অসম্ভব।

২০০৭ সালের ১৩ জুলাই স্পেনের কাতালোনিয়ার এসপ্লুগেস দে লোব্রেগাতে জন্মগ্রহণ করেন লামিন ইয়ামাল। তার বাবা মরক্কোর নাগরিক মুনির নাসরাউই এবং মা নিরক্ষীয় গিনির বংশোদ্ভূত শেইলা এবানা। বহু সংস্কৃতির মিশেলে বেড়ে ওঠা এই তরুণ আজ স্পেনের ফুটবল স্বপ্নের অন্যতম বড় প্রতীক।

শৈশব কেটেছে বার্সেলোনার উপকণ্ঠের রোকাফোন্দা এলাকায়। নিজের শিকড়ের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতেই গোল করার পর দুই হাতে ‘৩০৪’ দেখান তিনি, যা রোকাফোন্দার পোস্টাল কোডের শেষ তিন সংখ্যা। বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়েও নিজের পরিচয় ভুলে না যাওয়ার এই অভ্যাস তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।

বার্সেলোনার বিখ্যাত লা মাসিয়া একাডেমিতেই ফুটবল শিক্ষার ভিত্তি গড়ে ওঠে ইয়ামালের। বল নিয়ন্ত্রণ, জায়গা তৈরি, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং আক্রমণ গড়ে তোলার যে দর্শনের জন্য লা মাসিয়া বিশ্বজুড়ে পরিচিত, ইয়ামালের খেলায় তার প্রতিফলন স্পষ্ট।

খুব অল্প বয়সেই বার্সেলোনার মূল দলে জায়গা করে নেওয়া ইয়ামাল এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাননি। তার খেলার ধরন দেখে অনেকেই লিওনেল মেসির সঙ্গে তুলনা করেন। বাঁ পায়ের দক্ষতা, ডান প্রান্ত থেকে ভেতরে ঢুকে খেলা তৈরি করা—এসব মিল থাকলেও ইয়ামাল নিজের পরিচয়েই প্রতিষ্ঠিত হতে চান। তিনি কারও ছায়া নন; তিনি নিজেই একটি নতুন গল্প।

২০২৪ ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে করা তার দুর্দান্ত গোল বিশ্ব ফুটবলকে নতুন এক তারকার আগমনের বার্তা দিয়েছিল। সেই টুর্নামেন্টেই স্পেন ইউরোপের সেরা হয়, আর ইয়ামাল ‘ভবিষ্যতের প্রতিভা’ থেকে হয়ে ওঠেন বর্তমানের অন্যতম সেরা তরুণ ফুটবলার।

বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চেও তার আত্মবিশ্বাসে কোনো ঘাটতি নেই। যেখানে সামান্য একটি ভুল চার বছরের স্বপ্ন ভেঙে দিতে পারে, সেখানে ইয়ামাল খেলছেন অবিশ্বাস্য স্বাভাবিকতায়। তার খেলার মধ্যে নেই অতিরিক্ত চাপের ছাপ; বরং রয়েছে সৃজনশীলতার স্বাধীনতা।

বর্তমান স্পেন দলে এক পাশে নিকো উইলিয়ামস, অন্য পাশে ইয়ামাল—দুই উইংয়ের গতিই দলটিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। একসময় যে স্পেন শুধুই বলের দখল ধরে রেখে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করত, এখন সেই দলের আক্রমণে যোগ হয়েছে গতি, সরাসরি আঘাত এবং সৃজনশীলতার নতুন রূপ।

ইয়ামালের সবচেয়ে বড় গুণ সম্ভবত এটিই—প্রতিপক্ষ জানে তিনি কী করতে পারেন, কিন্তু তারপরও তাকে থামাতে পারে না। পাসের সুযোগ বন্ধ করলে তিনি ড্রিবল করেন, ড্রিবল আটকে দিলে শট নেন। একজন ফুটবলারের হাতে যখন একাধিক সমাধান থাকে, তখন তাকে থামানো আরও কঠিন হয়ে যায়।

আজ বিশ্বের অসংখ্য শিশু লামিন ইয়ামালের জার্সি পরে মাঠে নামে। তার ড্রিবল অনুকরণ করে, তার মতো বাঁ পায়ে কাট-ইন করার চেষ্টা করে। যেমন একসময় একটি প্রজন্ম লিওনেল মেসিকে দেখে স্বপ্ন দেখেছিল, আজকের নতুন প্রজন্ম স্বপ্ন দেখে ইয়ামালকে অনুসরণ করে।

অবশ্য ফুটবল যেমন করতালি দেয়, তেমনি কঠিন পরীক্ষাও নেয়। সামনে তার দীর্ঘ ক্যারিয়ার। সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতা, সমালোচনা এবং চাপ—সবই আসবে। তবে এখন পর্যন্ত যা দেখা গেছে, তাতে মনে হয় এই কিশোর ভয়কে নয়, স্বপ্নকেই সঙ্গী করে পথ চলতে শিখেছেন।

বিশ্বকাপের শিরোপা শেষ পর্যন্ত কার হাতে উঠবে, সেটি সময়ই বলবে। স্পেন কত দূর যাবে, সেটিও ভবিষ্যতের হাতে। তবে একটি বিষয় ইতোমধ্যেই নিশ্চিত—এই বিশ্বকাপের স্মৃতিতে একটি দৃশ্য চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে। বল পায়ে এক কিশোর, সামনে প্রতিপক্ষের রক্ষণ, গ্যালারি উঠে দাঁড়িয়েছে। তারপর শুরু হয় লামিন ইয়ামালের দৌড়। আর সেই মুহূর্তে ফুটবল আর শুধু খেলা থাকে না—তা হয়ে ওঠে কবিতা। আর সেই কবিতার কিশোর কবি, লামিন ইয়ামাল।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন