বিদেশে পড়াশোনা ও নাগরিকত্ব নেওয়া কি জায়েজ? ইসলাম যা বলছে
বিদেশে পড়াশোনা ও নাগরিকত্ব নেওয়া কি জায়েজ? ইসলাম যা বলছে
বর্তমান সময়ে উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান, চিকিৎসা কিংবা উন্নত জীবনযাপনের আশায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন লাখো মানুষ। মুসলমানদের একটি বড় অংশও ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন অমুসলিম দেশে বসবাস করছেন। কেউ উচ্চশিক্ষার জন্য, কেউ চাকরির জন্য, আবার কেউ স্থায়ীভাবে নাগরিকত্ব গ্রহণের উদ্দেশ্যে সেখানে যাচ্ছেন।
তবে একজন সচেতন মুসলমানের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—অমুসলিম দেশে পড়াশোনা করা, বসবাস করা কিংবা নাগরিকত্ব গ্রহণ করা ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ কি না? এ বিষয়ে কোরআন, হাদিস এবং ইসলামি ফিকহের আলোকে কিছু সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে।
ইসলাম জ্ঞানার্জনকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআনের প্রথম ওহিই ছিল ‘পড়ো’—এই নির্দেশনার মাধ্যমে। জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অর্জনের জন্য মুসলমানদের সবসময় উৎসাহিত করা হয়েছে। রাসুল (সা.)-এর যুগেও উপকারী জ্ঞান গ্রহণের ক্ষেত্রে অমুসলিমদের সহযোগিতা নেওয়ার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। বদরের যুদ্ধের বন্দীদের মধ্যে যারা মুসলিম শিশুদের লেখাপড়া শেখাতে সম্মত হয়েছিল, তাদের মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২২১৬)
এ কারণে প্রয়োজনীয় ও উপকারী জ্ঞান অর্জনের জন্য কোনো মুসলমান অমুসলিম দেশে যেতে চাইলে তা মূলত বৈধ। তবে এর জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে। প্রথমত, যে শিক্ষা অর্জনের জন্য যাওয়া হচ্ছে তা ব্যক্তি ও মুসলিম উম্মাহর জন্য কল্যাণকর হতে হবে। দ্বিতীয়ত, সেই শিক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগ নিজ দেশ বা মুসলিম রাষ্ট্রে না থাকা। তৃতীয়ত, সেখানে গিয়ে ইসলামের মৌলিক বিধান যেমন নামাজ, রোজা, হালাল খাদ্য ও ধর্মীয় পরিচয় রক্ষা করার স্বাধীনতা থাকতে হবে। সর্বোপরি, নিজের ইমান ও ধর্মীয় চেতনা হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা না থাকা জরুরি। (ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া, ২৫/২৮৬)
নারীদের ক্ষেত্রে ইসলামে সফরের বিষয়ে বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কোনো নারী যেন মাহরাম ছাড়া তিন দিনের সফরে না যায়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০৮৬) তাই নারী শিক্ষার্থীদের জন্য মাহরামের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য।
অমুসলিম দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস ও নাগরিকত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রেও ইসলাম সতর্কতার সঙ্গে বিষয়টি বিবেচনা করতে বলে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অমুসলমানদের সঙ্গে বসবাস করে এবং তাদের সঙ্গে মিশে যায়, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৭৮৭)
আরেক হাদিসে তিনি বলেছেন, ‘আমি এমন মুসলমানের ব্যাপারে দায়মুক্ত, যে অমুসলিমদের মধ্যে বসবাস করে।’ (মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদিস: ৩৪৬১)
তবে এসব হাদিসের অর্থ এই নয় যে, প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও কোনো মুসলমান কখনো অমুসলিম দেশে যেতে পারবে না। বরং ইসলাম প্রয়োজন ও বাস্তবতার বিষয়টিও গুরুত্ব দেয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ কোনো ব্যক্তিকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।’ (সুরা বাকারা: ২৮৬)
যদি কোনো ব্যক্তি নিজ দেশে নির্যাতন, অন্যায় আচরণ, সম্পদহানি বা নিরাপত্তাহীনতার শিকার হন এবং অন্য কোনো উপায় না থাকে, তাহলে ধর্মীয় পরিচয় অক্ষুণ্ন রাখার শর্তে অমুসলিম দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করা বৈধ হতে পারে। একইভাবে চিকিৎসা, কর্মসংস্থান বা জীবন রক্ষার প্রয়োজনেও সেখানে বসবাস করা জায়েজ হতে পারে।
জীবিকার ব্যাপারেও ইসলাম বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীকে সুগম করেছেন। অতএব তোমরা তার পথে বিচরণ করো এবং তাঁর দেওয়া রিজিক আহার করো।’ (সুরা মুলক: ১৫)
তাই যদি হালাল উপায়ে জীবিকা অর্জনের জন্য কোনো মুসলমানকে অমুসলিম দেশে যেতে হয় এবং সেখানে ধর্ম পালনের সুযোগ থাকে, তাহলে তা বৈধ হতে পারে। একইভাবে চিকিৎসা বা জরুরি প্রয়োজনের ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য।
অন্যদিকে কিছু বিষয় রয়েছে, যেগুলোর কারণে অমুসলিম দেশে যাওয়া বা নাগরিকত্ব গ্রহণ বৈধ হবে না। যদি কেউ মনে করে যে ইসলামি জীবনব্যবস্থার চেয়ে পশ্চিমা সংস্কৃতি, জীবনযাপন বা জাতীয়তা শ্রেষ্ঠ, তাহলে এমন মানসিকতা ইসলামসম্মত নয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘ইসলাম সর্বদা উচ্চ ও বিজয়ী, এর ওপর অন্য কিছু প্রাধান্য লাভ করতে পারে না।’ (সুনানে দারাকুতনি, ৩/২৫২)
একইভাবে শুধু বিলাসিতা, অধিক সম্পদ অর্জন বা পার্থিব সুবিধার জন্য এমন দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করা, যেখানে নিজের ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ধর্মীয় পরিচয় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে, সেটিও ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে নিরুৎসাহিত।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা নিজেদের হাতকে ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করো না।’ (সুরা বাকারা: ১৯৫)
বিশ্বায়নের এ যুগে মুসলমানদের অনেকেই শিক্ষা, গবেষণা ও পেশাগত কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ছেন। ইসলাম জ্ঞানার্জন, কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের বিরোধিতা করে না। তবে সবকিছুর আগে একজন মুসলমানের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার ইমান, ধর্মীয় পরিচয় ও নৈতিকতা। তাই অমুসলিম দেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একজন মুসলমানকে বিবেচনা করতে হবে—তার ধর্মীয় জীবন, ইমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর এর কী প্রভাব পড়তে পারে।
ইসলামের দৃষ্টিতে প্রয়োজন, কল্যাণ ও ধর্মীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকলে উচ্চশিক্ষা, চাকরি কিংবা নাগরিকত্বের জন্য অমুসলিম দেশে যাওয়া বৈধ হতে পারে। তবে যদি এর ফলে ধর্মীয় পরিচয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে তা থেকে বিরত থাকাই উত্তম।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

আপনার মতামত লিখুন
Array