রকেট নাকি বিকাশ—প্রথম কোনটি?
বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের যাত্রা শুরু করে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের রকেট।
বাংলাদেশে ডিজিটাল আর্থিক সেবার যাত্রা শুরু হয়েছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের হাত ধরেই। বর্তমানে দেশের কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন মোবাইল ফোনের মাধ্যমে টাকা পাঠানো, গ্রহণ, মোবাইল রিচার্জ, বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল পরিশোধ, অনলাইন কেনাকাটা এবং সরকারি ভাতা গ্রহণসহ নানা ধরনের আর্থিক লেনদেন করছেন। তবে অনেকেরই প্রশ্ন থাকে, বাংলাদেশের সর্বপ্রথম মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালু করে কোন ব্যাংক? এর সঠিক উত্তর হলো ডাচ-বাংলা ব্যাংক পিএলসি (Dutch-Bangla Bank PLC)। ২০১১ সালের ৩১ মার্চ ব্যাংকটি দেশের প্রথম মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালু করে, যা পরবর্তীতে ‘রকেট (Rocket)’ নামে পরিচিতি লাভ করে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের আর্থিক খাতে ডিজিটাল রূপান্তরের নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হয়।
ডাচ-বাংলা ব্যাংকের মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালুর মূল লক্ষ্য ছিল দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে সহজ, দ্রুত এবং নিরাপদ আর্থিক সেবা পৌঁছে দেওয়া। সে সময় ব্যাংকিং সেবা গ্রহণের জন্য গ্রাহকদের ব্যাংকের শাখায় যেতে হতো, যা গ্রামীণ ও দূরবর্তী এলাকার মানুষের জন্য বেশ কষ্টসাধ্য ছিল। মোবাইল ব্যাংকিং চালুর ফলে একটি সাধারণ মোবাইল ফোন ব্যবহার করেই টাকা পাঠানো, টাকা গ্রহণ, মোবাইল রিচার্জ এবং বিভিন্ন ধরনের আর্থিক লেনদেন করার সুযোগ তৈরি হয়। এর ফলে দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি (Financial Inclusion) উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
প্রথম দিকে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের এই সেবাটি Dutch-Bangla Mobile Banking নামে চালু হয়। পরবর্তীতে গ্রাহকদের কাছে আরও সহজে পরিচিত করার জন্য এর নাম পরিবর্তন করে রকেট (Rocket) রাখা হয়। বর্তমানে রকেটের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দ্রুত অর্থ লেনদেনের পাশাপাশি এটিএম থেকে কার্ড ছাড়াই টাকা উত্তোলন, বেতন প্রদান, সরকারি ভাতা বিতরণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফি পরিশোধ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিল পরিশোধের সুবিধা পাওয়া যায়। নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য সেবা হিসেবে এটি এখনও দেশের অন্যতম জনপ্রিয় মোবাইল আর্থিক সেবাগুলোর একটি।
ডাচ-বাংলা ব্যাংকের পর একই বছর ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিকাশ (bKash) যাত্রা শুরু করে। এরপর ধীরে ধীরে নগদ (Nagad), উপায় (Upay), এমক্যাশ (mCash), ইসলামী ব্যাংক সেলফিন (CellFin) এবং আরও কয়েকটি মোবাইল আর্থিক সেবা বাজারে আসে। বর্তমানে বিকাশ গ্রাহকসংখ্যার দিক থেকে দেশের সবচেয়ে বড় মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) হলেও বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বপ্রথম মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালুর কৃতিত্ব ডাচ-বাংলা ব্যাংকেরই।
বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিং শুধু টাকা পাঠানো বা গ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এখন এই সেবার মাধ্যমে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও ইন্টারনেট বিল পরিশোধ, অনলাইন শপিংয়ের মূল্য পরিশোধ, ট্রেন ও বাসের টিকিট ক্রয়, সরকারি বিভিন্ন ভাতা গ্রহণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভর্তি ও পরীক্ষার ফি জমা, বেতন বিতরণ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণসহ অসংখ্য সেবা পাওয়া যাচ্ছে। ফলে নগদ অর্থ বহনের ঝুঁকি যেমন কমেছে, তেমনি মানুষের সময় ও শ্রমও অনেক সাশ্রয় হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) খাত বর্তমানে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার লেনদেন এই প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। সরকারও ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গঠনের লক্ষ্যে ডিজিটাল লেনদেনকে আরও সম্প্রসারণে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করছে। ফলে শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডাচ-বাংলা ব্যাংক ২০১১ সালে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালু না করলে বাংলাদেশের ডিজিটাল আর্থিক সেবার বর্তমান অবস্থানে পৌঁছাতে আরও অনেক সময় লাগতে পারত। কারণ এই উদ্যোগের মাধ্যমে মানুষ প্রথমবারের মতো মোবাইল ফোন ব্যবহার করে নিরাপদে আর্থিক লেনদেন করার সুযোগ পায়। পরবর্তীতে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও এই খাতে বিনিয়োগ করে, যার ফলে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পায় এবং গ্রাহকরা আরও উন্নত ও আধুনিক সেবা পেতে শুরু করেন।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের সর্বপ্রথম মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালু করে ডাচ-বাংলা ব্যাংক পিএলসি, যার বর্তমান ব্র্যান্ড নাম রকেট (Rocket)। এই সেবার মাধ্যমে দেশের আর্থিক খাতে ডিজিটাল বিপ্লবের সূচনা হয় এবং আজকের জনপ্রিয় মোবাইল আর্থিক সেবাগুলোর ভিত্তি তৈরি হয়। বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিং দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও সহজ, দ্রুত এবং প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলেছে, যা ভবিষ্যতের ডিজিটাল বাংলাদেশের অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল !
