শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স, রণক্ষেত্র রাজপথ

প্রকাশিত: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:০২ পূর্বাহ্ণ
শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স, রণক্ষেত্র রাজপথ

স্কুলের সংকট ও শিক্ষক সংকটের প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ

স্কুলের অব্যবস্থাপনা, শিক্ষক সংকট ও পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকার প্রতিবাদে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে ফ্রান্স। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দেশটির বিভিন্ন শহরে রাস্তায় নামেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকেরা। কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।

প্যারিস, স্ত্রাসবুর্গ, রেন, লিয়ন ও তুলুজসহ বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, কয়েক ডজন শহরে আয়োজিত বিক্ষোভে আড়াই লাখের বেশি মানুষ অংশ নেন। তবে আয়োজকদের দাবি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার।

প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু আইনপ্রণেতাদের জানিয়েছেন, সংঘর্ষে অন্তত ২১৫ কিশোর ও ৮৫ জন স্কুলকর্মী আহত হয়েছেন। তিনি এই পরিস্থিতিকে কয়েক দশকের মধ্যে ফ্রান্সের স্কুলব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়া ৭০০-এর বেশি পুলিশ সদস্য আহত হওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মঙ্গলবারের বিক্ষোভে ৪৮ জন নিরাপত্তাকর্মী আহত হয়েছেন এবং ৪৮৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্যারিসে প্রায় ৩০০ মুখোশধারী ও মাথা ঢাকা ব্যক্তি পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান। রাজধানীর কয়েকটি দোকানের সামনেও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। তবে প্যারিসের অন্যান্য এলাকায় বিক্ষোভ তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ ছিল।

সেপ্টেম্বরে প্যারিসের দরিদ্র উপশহরগুলোতে এই আন্দোলনের সূচনা হয়। পরে তা দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ফ্রান্সের প্রায় ৩ হাজার ৭০০ উচ্চবিদ্যালয়ের অনেকগুলোতেই দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের কাজ হচ্ছে না। কোথাও পানির পাইপে লিকেজ, কোথাও ইঁদুরের উপদ্রব। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষক সংকট।

উচ্চবিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের একটি সংগঠনের দাবি, মঙ্গলবার ফ্রান্সের অর্ধেকের বেশি উচ্চবিদ্যালয় অবরুদ্ধ ছিল অথবা দিনের জন্য বন্ধ রাখা হয়। কয়েকটি এলাকায় শিক্ষার্থীদের অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়।

স্ত্রাসবুর্গের সাম্প্রতিক উচ্চবিদ্যালয় পাস করা শিক্ষার্থী হুগো ভেটজেল বলেন, দেশের অভিজাত শ্রেণি ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। মার্সেই ও নঁতে বিক্ষোভকারীরা হাতে তৈরি প্ল্যাকার্ড নিয়ে অংশ নেন। তুলুজে অভিভাবকেরাও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিছিলে যোগ দেন।

বিক্ষোভকারীদের প্রধান দাবির মধ্যে রয়েছে শিক্ষক সংকটের সমাধান, শিক্ষায় পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ এবং স্কুলগুলোর অবকাঠামোগত সমস্যার সমাধান। আন্দোলনটি মূলত ধর্ম বা অভিবাসন ইস্যুকেন্দ্রিক নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে মানবাধিকার সংগঠন এবং শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কয়েকটি সংগঠন অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিরুদ্ধে পুলিশের অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের অভিযোগ তুলেছে।

সরকারের দাবি, আন্দোলনে বাইরের লোকজন ঢুকে পড়েছে এবং কিছু এলাকায় বিক্ষোভ নগর সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। বিচার মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগে ১ হাজার ৮০০ জনের বেশি মানুষের বিরুদ্ধে মামলা চলছে। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৪৮৩ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক।

প্যারিসের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আর্জন্তয় এলাকার একটি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক ওমর সালাউতি অভিযোগ করেন, সরকার তরুণদের ভালো ও খারাপ বিক্ষোভকারী হিসেবে ভাগ করার চেষ্টা করছে। তার মতে, কিছু জায়গায় আবর্জনার পাত্রে আগুন না জ্বললে সরকার হয়তো সমস্যাগুলো নিয়ে এতটা সচেতন হতো না।

আন্দোলনের চাপের মুখে প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবিগুলো পূরণে মন্ত্রীদের পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। অনুপস্থিত শিক্ষকদের জায়গায় বিকল্প শিক্ষক নিশ্চিত করা, সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দীর্ঘ স্কুল সময় পর্যালোচনা এবং দুপুরের খাবারের বিরতি বাড়ানোর বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে।

পুরোনো স্কুল ভবনগুলোর প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়েও পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। অক্টোবরের শেষ নাগাদ এ বিষয়ে প্রথম দফার প্রস্তাব দিতে মন্ত্রীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তবে সরকারের এসব আশ্বাসে সন্তুষ্ট নন অনেক অভিভাবক। প্যারিসের হেলেন বুশে স্কুলের সামনে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অভিভাবক এমিলি লোম বলেন, সরকারের আশ্বাস শুনতে ভালো লাগলেও এতে তাদের সন্তানদের প্রতিদিনের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়ে তিনি সন্দিহান।

এদিকে অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন করে অর্থ ব্যয়ের পথও কঠিন হয়ে উঠেছে। দুর্বল অর্থনীতি, বাড়তে থাকা সরকারি ঋণ এবং বাজেট ঘাটতি কমানোর চাপের মধ্যে রয়েছে ফ্রান্স। গত সপ্তাহে দেশটির ১০ বছর মেয়াদি সরকারি ঋণের সুদের হার সাময়িকভাবে ২৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশের বেশি উঠেছিল।

ফ্রান্সের ঋণের ব্যয় বাড়ার প্রভাব ইউরোপের অন্যান্য দেশেও পড়ছে। ইউরোর দরপতনও নীতিনির্ধারকদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তবে অর্থমন্ত্রী রোলাঁ লেক্যুর মঙ্গলবার বলেছেন, এ পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই।

আগামী বসন্তে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে দেশটির শিক্ষা ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যেই মূল্যস্ফীতির তুলনায় শিক্ষা খাতে ব্যয় কমেছে। ২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী মূল্যায়নের তথ্যেও ফ্রান্সের শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক শিক্ষাগত ফলাফল অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থাভুক্ত অন্যান্য দেশের তুলনায় পিছিয়ে থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে।

সূত্র: রয়টার্স

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page