স্থবির কর্মসংস্থান, এক বছরে গরিব মানুষ বেড়েছে প্রায় ২১ লাখ!
অর্থনীতির ধীরগতির প্রভাব পড়েছে মানুষের আয় ও জীবিকায়
অর্থনীতির ধীরগতির প্রভাব এবার সরাসরি পড়েছে মানুষের আয় ও জীবিকায়। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৬ অর্থবছরে দেশে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে। একই সময়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে এবং নারীদের কর্মসংস্থানও কমেছে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ে প্রকাশিত বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে আটকে থাকতে পারে। বিনিয়োগে স্থবিরতা, রপ্তানি প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি কমেছে।
বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমছে। দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার সঙ্গে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা যুক্ত হয়ে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর সঙ্গে কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় নিম্নআয়ের ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর আয় হারানোর ঝুঁকি বেড়েছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৬ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন। একই সময়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রায় থেমে গেছে। বিশেষ করে নারীদের কর্মসংস্থান কমেছে। ফলে অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব শুধু প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ থাকেনি, মানুষের জীবনযাত্রাতেও এর প্রভাব পড়েছে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান বিভাগের পরিচালক জ্যঁ পেসমে বলেন, অর্থনৈতিক মন্দা এড়ানো এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত ও সাহসী সংস্কার প্রয়োজন। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা এবং নতুন ও ভালো কর্মসংস্থান তৈরির জন্য এসব সংস্কার জরুরি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
নতুন করে দারিদ্র্যে পড়া মানুষের বড় অংশকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেক কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, জ্বালানি ও কৃষি ভর্তুকি দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করলেও সবচেয়ে বেশি সহায়তার প্রয়োজন এমন অনেক পরিবার এসব কর্মসূচির বাইরে রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে সীমিত সরকারি সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে সুবিধাভোগী নির্বাচনের পদ্ধতি আরও উন্নত করার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির মতে, ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি বাস্তবায়ন ও সম্প্রসারণ করা গেলে তথ্যভিত্তিকভাবে উপকারভোগী নির্বাচন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন মানুষকে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে যুক্ত করা সহজ হবে।
দারিদ্র্য কমাতে খাদ্য ও নগদ সহায়তা কর্মসূচিগুলোর মধ্যে আরও ভালো সমন্বয়ের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, একাধিক খাদ্যভিত্তিক ভর্তুকি কর্মসূচি একীভূত করা এবং ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে বিদ্যমান নগদ সহায়তা কর্মসূচির সমন্বয় করা গেলে অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব।
অর্থনীতির আরেকটি বড় দুর্বলতা হিসেবে প্রতিবেদনে ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতির কথা তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এ হার ছিল ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ। খেলাপি ঋণের উচ্চ হার ঋণ বিতরণ ব্যবস্থা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
রাজস্ব আহরণের দুর্বলতাও সরকারের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে সীমিত করছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। এর ফলে উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক ব্যয়ের জন্য সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ছে।
এদিকে ২০২৫ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি ছিল জিডিপির ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উঠেছে। অর্থাৎ দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের সহায়তার প্রয়োজন বাড়লেও সেই সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা, বিনিয়োগ কমে যাওয়া এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বৃদ্ধিও অর্থনীতির গতি কমিয়ে দেওয়ার অন্যতম কারণ। এসব কারণে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির পরিবেশ দুর্বল হয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
তবে বৈদেশিক খাতে কিছুটা স্বস্তি রয়েছে। শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতির কারণে দেশের বহিঃখাত তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি এবং সরকারের সংস্কার কার্যক্রম গতি পেলে ২০২৮ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে। তবে টেকসই প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নয়নকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে সংস্থাটি।
একই দিনে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। ২০২৭ সালে তা কিছুটা কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে নামতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশকে নতুন প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে কাজে লাগাতে দক্ষতা, অবকাঠামো ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
