তরুণ উদ্যোক্তাদের ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক, আবেদন শুরু আজ
তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগ কর্মসূচি
দেশের উপজেলা পর্যায়ে সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তাদের খুঁজে বের করে ব্যবসায়িক উদ্যোগ বাস্তবায়নে অর্থায়ন ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে নতুন কর্মসূচি চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ‘উদ্যোগ’ নামে এই কর্মসূচির আওতায় নির্বাচিত একজন তরুণ উদ্যোক্তা সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত সমন্বিত অর্থায়ন পেতে পারেন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ব্যাংক ঋণ এবং সমপরিমাণ ১০ লাখ টাকা অনুদান হিসেবে দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস ডিপার্টমেন্টের ১৩ সেপ্টেম্বর জারি করা সার্কুলারে এ নীতিমালা দেওয়া হয়েছে।
‘উদ্যোগ’ কর্মসূচির পূর্ণ নাম ‘উপজেলাভিত্তিক তরুণ উদ্যোক্তা অনুসন্ধান, চিহ্নিতকরণ ও অর্থায়ন কর্মসূচি’। ইংরেজিতে এর নাম UDYOG বা ‘Upazila-Driven Youth Opportunity for Growth’। উপজেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে থাকা সম্ভাবনাময় তরুণদের ব্যবসায়িক ধারণা ও উদ্যোগকে বাস্তবায়নের সুযোগ করে দেওয়ার পাশাপাশি উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই এ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য। কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হস্তশিল্প, মৎস্য, পশুপালন, পর্যটন, সেবা, সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি, হালকা প্রকৌশল এবং প্রযুক্তিনির্ভর স্টার্টআপসহ বাংলাদেশের আইনে বৈধ বিভিন্ন ব্যবসা এ কর্মসূচির আওতায় বিবেচিত হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কর্মসূচির প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের আট বিভাগের আট জেলার ৬৪টি উপজেলায় কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এসব জেলা হলো মানিকগঞ্জ, ফেনী, নওগাঁ, ঝিনাইদহ, ভোলা, হবিগঞ্জ, রংপুর ও নেত্রকোনা। অর্থাৎ নওগাঁ জেলার তরুণ উদ্যোক্তারাও প্রথম ধাপেই এ কর্মসূচির আওতায় আবেদন করার সুযোগ পাচ্ছেন। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিটি উপজেলা থেকে সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা বাছাইয়ের মাধ্যমে অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হবে।
আজ বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) থেকে প্রথম পর্যায়ের আবেদন গ্রহণ শুরু হচ্ছে। নির্ধারিত ফরমে আবেদন করা যাবে আগামী ১৫ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত। নির্ধারিত সময়ের পর পাওয়া আবেদন বিবেচনা করা হবে না। আর প্রাথমিক পর্যায়ের আট জেলার বাইরে দেশের অন্যান্য জেলার অন্তর্ভুক্ত উপজেলার উদ্যোক্তারা আগামী ১ নভেম্বর থেকে ৩০ নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত আবেদন করার সুযোগ পাবেন।
আবেদন করার ক্ষেত্রে বয়সের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, আবেদন গ্রহণের শেষ তারিখে আবেদনকারীর বয়স সর্বোচ্চ ২৮ বছর হতে হবে। তাকে সংশ্লিষ্ট উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। একই সঙ্গে নিজের ব্যবসায়িক উদ্যোগ বা ব্যবসায়িক ধারণা থাকতে হবে, অথবা নতুন ব্যবসা শুরু করার বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা থাকতে হবে। অর্থাৎ ব্যবসা ইতোমধ্যে চালু থাকতেই হবে এমন নয়; বাস্তবসম্মত ব্যবসায়িক ধারণা বা নতুন উদ্যোগের পরিকল্পনা থাকলেও আবেদন করা যাবে।
তবে সবাই এই কর্মসূচির অর্থায়নের জন্য যোগ্য হবেন না। আগে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ঋণ নেওয়া থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এ কর্মসূচির আওতায় বিবেচিত হবেন না। কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণখেলাপি হলে আবেদনও গ্রহণযোগ্য হবে না। এ ছাড়া সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিরাও এ কর্মসূচির অর্থায়নের জন্য যোগ্য হবেন না। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, সিআইবি যাচাইয়ের মাধ্যমে ঋণখেলাপির তথ্য নিশ্চিত করা হবে।
অর্থায়নের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা বলা হলেও প্রত্যেক আবেদনকারী স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই পুরো অর্থ পাবেন না। উদ্যোক্তার প্রকৃত ব্যবসায়িক চাহিদা, প্রস্তাবিত ব্যয় পরিকল্পনা ও চূড়ান্ত মূল্যায়নের ভিত্তিতে অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে। ঋণ ও অনুদানের অনুপাত হবে ৫০:৫০। যেমন কোনো উদ্যোক্তার ব্যবসা শুরু বা সম্প্রসারণের জন্য ১২ লাখ টাকা প্রয়োজন হলে সর্বোচ্চ ৬ লাখ টাকা ব্যাংক ঋণ এবং ৬ লাখ টাকা অনুদান হিসেবে পাওয়ার সুযোগ থাকবে। উদ্যোক্তার নিজস্ব বিনিয়োগ বা অন্য কোনো বৈধ উৎসের অর্থ থাকলে সেটিও অর্থায়ন পরিকল্পনায় বিবেচনা করা হবে।
এই কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ঋণের বিপরীতে সহায়ক জামানত ছাড়াই অর্থায়ন দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে অর্থ পাওয়ার পর নির্ধারিত শর্ত মেনে ব্যবসায় তা ব্যবহার করতে হবে। ঋণ সময়মতো পরিশোধে ব্যর্থ হলে অথবা অর্থের অপব্যবহার প্রমাণিত হলে দেওয়া অনুদানের সমপরিমাণ অর্থ ঋণে পরিণত হবে এবং তা সরকারি পাওনা হিসেবে আদায়যোগ্য হবে। ঋণ ও অনুদানের অর্থ একই সময়ে এককালীনভাবে উদ্যোক্তার ব্যাংক হিসাবে দেওয়া হবে; নগদে অর্থ দেওয়ার সুযোগ নেই।
আবেদন করতে আগ্রহীদের সংশ্লিষ্ট উপজেলার যেকোনো তফসিলি ব্যাংকের শাখায় নির্ধারিত ফরমে আবেদন জমা দিতে হবে। যে ব্যাংকে আবেদন করা হবে, সেখানে আগে থেকেই আবেদনকারীর ব্যাংক হিসাব থাকা বাধ্যতামূলক নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট, এসএমই পোর্টাল এবং তফসিলি ব্যাংকগুলোর ওয়েবসাইট থেকে আবেদন ফরম সংগ্রহ করা যাবে। চাইলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের শাখা থেকেও ফরম নেওয়া যাবে। আবেদনপত্রের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র, সর্বশেষ শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ থাকলে তার কপি, দক্ষতা উন্নয়ন বা উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের সনদ থাকলে সেটির কপি এবং ওয়ার্ড কমিশনার বা কাউন্সিলরের দেওয়া নাগরিক সনদ জমা দিতে হবে।
আবেদন ফরমে শুধু ব্যক্তিগত তথ্য নয়, ব্যবসার পরিকল্পনাও বিস্তারিতভাবে দিতে হবে। সম্ভাব্য ক্রেতা, ব্যবসা শুরুর সম্ভাব্য সময়, ব্যবসার ধরন, সম্ভাব্য অবস্থান, কাঁচামালের উৎস, বাজার, সম্ভাব্য বিক্রয় ও লাভ, সম্ভাব্য কর্মসংস্থান, ব্যবসার ঝুঁকি এবং সেই ঝুঁকি মোকাবিলার পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন তথ্য চাওয়া হয়েছে। ফলে আবেদন করার আগে ব্যবসার পরিকল্পনাটি বাস্তবসম্মতভাবে প্রস্তুত করা গুরুত্বপূর্ণ।
আবেদন জমা দেওয়ার পর ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উদ্যোক্তা বাছাই করা হবে। ব্যবসায়িক ধারণার যৌক্তিকতা, বাস্তবায়নযোগ্যতা, বাজারের সম্ভাবনা, আর্থিক পরিকল্পনা, উদ্যোক্তার সক্ষমতা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা বিবেচনা করে চূড়ান্তভাবে উদ্যোক্তা নির্বাচন করা হবে। নির্বাচিত হওয়ার পরও ঋণ পাওয়া নিশ্চিত নয়; ব্যাংক নিজস্ব ঋণনীতিমালা ও প্রচলিত বিধিবিধান অনুসরণ করে ঋণ অনুমোদন করবে।
শুধু অর্থায়ন দেওয়ার মধ্যেই কর্মসূচিটি সীমাবদ্ধ নয়। নির্বাচিত উদ্যোক্তাদের আর্থিক সাক্ষরতা প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞ মেন্টরের পরামর্শ, ব্যবসা নিবন্ধন ও ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএনসহ প্রয়োজনীয় ব্যবসায়িক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে সহায়তা এবং ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরিতে পরামর্শ দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বাজারের সঙ্গে উদ্যোক্তাদের সংযোগ তৈরির সুযোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
তবে আবেদন পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের তদবির বা অসত্য তথ্য দেওয়ার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায় বলা হয়েছে, কোনো পর্যায়ে তদবিরের প্রমাণ পাওয়া গেলে আবেদনকারীকে অযোগ্য ঘোষণা করা হবে। একইভাবে অসত্য তথ্য দেওয়া বা অন্যের ব্যবসায়িক ধারণা নিজের নামে ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেলে আবেদন বাতিলের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে কালো তালিকাভুক্ত করা হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এ উদ্যোগের মাধ্যমে উপজেলা পর্যায় থেকে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তরুণদের উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিশেষ করে যেসব তরুণের ব্যবসার ধারণা থাকলেও অর্থের অভাবে উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না, যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে তাদের জন্য এ কর্মসূচি নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমইএসপিডি সার্কুলার নং-০৫, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬; বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
