র্যাব থেকে এসআরবি: নাম পরিবর্তনই কি সমাধান?
র্যাব বিলুপ্ত করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন এসআরবি গঠন নিয়ে বিশ্লেষণ
চলতি বছর ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে বিল পাসের মাধ্যমে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত করা হয়েছে। এর পরিবর্তে গঠন করা হয়েছে নতুন বাহিনী—স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। র্যাব বিলুপ্ত করে নতুন নামে নতুন বাহিনী গঠনের এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—কেবল নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে কি র্যাবকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বিতর্ক, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং জবাবদিহির সংকটের সমাধান সম্ভব?
কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করলেই তার চরিত্র বা কার্যপ্রণালির পরিবর্তন ঘটে না। তাই র্যাব থেকে এসআরবিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—এটি কি কেবল নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ, নাকি এর সঙ্গে আইনি, কাঠামোগত ও জবাবদিহির মৌলিক সংস্কারও নিশ্চিত করা হয়েছে?
নতুন আইনের আওতায় র্যাবের বিদ্যমান জনবল, অস্ত্র, সরঞ্জাম ও নথিপত্র এসআরবিতে স্থানান্তরের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ফলে সমালোচকদের আশঙ্কা, ভেতরের জনবল, কাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে মৌলিক পরিবর্তন না এলে শুধু নাম বদলে বাহিনীর কার্যক্রমের ধরন পরিবর্তন করা কঠিন হবে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)সহ বিভিন্ন মহলও মনে করছে, র্যাবের বিরুদ্ধে অতীতে ওঠা মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও নির্যাতনের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে নতুন বাহিনীও ‘নতুন বোতলে পুরোনো মদ’-এর মতো হয়ে উঠতে পারে।
যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, র্যাবের সঙ্গে এসআরবির কোনো সংস্পর্শ নেই। র্যাব বিলুপ্ত হওয়ার পর রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় রোধে সেগুলো নতুন সংস্থায় হস্তান্তর করা হবে।
জাতীয় সংসদে র্যাব বিলুপ্তির প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনার সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সমাজের চাহিদা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জননিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ইউনিট কিংবা বাহিনীতে পরিবর্তন আনতে হয়। সে কারণেই এই পরিবর্তন করা হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একটি সংস্থা গঠনের সঙ্গে আরেকটি সংস্থা বিলুপ্তির সরাসরি সম্পর্ক নেই। র্যাব মূলত আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অধীনে গঠিত হয়েছিল এবং সেই আইনি কাঠামো পূর্ণাঙ্গ ছিল না। একটি সেকশনের অধীনে ইউনিটটি পরিচালিত হচ্ছিল। তাই আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন থেকে সেটিকে আলাদা করে বিলুপ্ত করার পাশাপাশি নতুন আইনি কাঠামোয় এসআরবি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পুলিশ বাহিনীর কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করার লক্ষ্যে ২০০১-০৬ মেয়াদে তৎকালীন বিএনপি সরকার একটি এলিট ফোর্স গঠনের পরিকল্পনা করে। পরবর্তী সময়ে ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের প্যারেডে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে র্যাবের আত্মপ্রকাশ ঘটে। একই বছরের ২১ জুন থেকে বাহিনীটি পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যক্রম শুরু করে।
সংঘবদ্ধ অপরাধ ও সন্ত্রাসবাদ দমনের উদ্দেশ্যে গঠিত হওয়ার পর দুই দশকে র্যাব বিভিন্ন সময়ে নানা গুরুতর অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছে। মানবাধিকারকর্মী ও সমালোচকদের কেউ কেউ বাহিনীটিকে ‘সরকারি ডেথ স্কোয়াড’ হিসেবেও অভিহিত করেছেন। নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত সাত খুন মামলা থেকে শুরু করে কক্সবাজার পৌরসভার কাউন্সিলর একরামুল হক নিহত হওয়ার ঘটনাসহ কথিত বন্দুকযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনায় র্যাবের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
এরই মধ্যে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নিপীড়নের অভিযোগে ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর র্যাবে বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালন করা ছয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে র্যাবের সংস্কার কিংবা বিলুপ্তির দাবি জানিয়ে আসছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সেই দাবি আরও জোরালো হয়। বিভিন্ন সময়ে গুমের ঘটনা তদন্তে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত কমিশনের কাছে র্যাবের বিরুদ্ধে ১৭২টি গুমের অভিযোগ জমা পড়ে, যা বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে সর্বোচ্চ বলে জানা যায়।
এরপর বর্তমান সরকার র্যাব বিলুপ্ত করে নতুন সংস্থা গঠনের উদ্যোগ নেয়। গত ৩ সেপ্টেম্বর সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ র্যাব গঠনের আইনি বিধান বাতিল করে পুলিশের অধীনে একটি বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন বা এসআরবি প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবসংবলিত বিল উত্থাপন করেন। ১০ সেপ্টেম্বর সেই বিল পাস হয়।
নীতিগতভাবে র্যাব বিলুপ্তির সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও টিআইবি প্রশ্ন তুলেছে, একটি বাহিনীর নাম পরিবর্তন করলেই কি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সম্পন্ন হয়? তাদের বক্তব্য, র্যাবের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও নির্যাতনের মতো গুরুতর অভিযোগের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে নতুন বাহিনীর কাঠামো, জনবল, ক্ষমতা, বলপ্রয়োগের বিধান এবং জবাবদিহির ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। অন্যথায় র্যাবের পরিবর্তে এসআরবি নামে একই ধরনের ক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির একটি বাহিনী তৈরি হলে সেটি হবে পুরোনো প্রতিষ্ঠানের খোলস পরিবর্তনের মতো।
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে—এসআরবির ওপর অভিযোগ উঠলে সেই অভিযোগের তদন্ত করবে কারা? প্রস্তাবিত বাহিনীর অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও অন্যান্য পুলিশ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত ‘অভিযোগ প্রতিকার কমিটি’ নিয়ে ইতিমধ্যে স্বার্থের দ্বন্দ্বের প্রশ্ন উঠেছে। কোনো বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে একই বাহিনী বা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কাঠামোর সদস্যদের দিয়ে তার তদন্ত করানো হলে সেই তদন্ত কতটা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
এই অভ্যন্তরীণ কাঠামোর পরিবর্তে পুলিশ ও নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত একটি স্বাধীন তদারকি কর্তৃপক্ষ গঠন করা প্রয়োজন। সেখানে মানবাধিকার ও আইন বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করা যেতে পারে। একই সঙ্গে তদন্ত প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করতে তদন্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশের ব্যবস্থা থাকা উচিত। অভিযোগের শিকার ব্যক্তি ও পরিবারের ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের অধিকারও আইনি সুরক্ষার আওতায় আনা প্রয়োজন।
র্যাব বিলুপ্তির পর নতুন বাহিনী গঠনের ক্ষেত্রে সরকারের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই সুযোগকে কেবল একটি বাহিনীর নাম পরিবর্তনের কাজে ব্যবহার না করে আইন প্রয়োগকারী ব্যবস্থার সামগ্রিক সংস্কারের সূচনা হিসেবে দেখা প্রয়োজন। নতুন বাহিনীর ক্ষমতার সুস্পষ্ট সীমারেখা, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদারকি, স্বচ্ছ সদস্য যাচাই প্রক্রিয়া, বলপ্রয়োগের স্পষ্ট নীতিমালা, বিচারিক সুরক্ষা এবং কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশেষ করে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের নিয়ে অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় স্থায়ী ধরনের বিশেষ বাহিনী গঠনের ধারণাটিও নতুন করে পর্যালোচনার দাবি রাখে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের অভিযোগের মধ্যে গুম, কথিত ক্রসফায়ার এবং অন্যান্য আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের বিষয়গুলো রয়েছে। র্যাবের পরিবর্তে এসআরবিতেও যদি একই ধরনের কাঠামো ও জনবল ব্যবস্থাপনা বহাল থাকে, তাহলে নতুন বাহিনীকে ঘিরে পুরোনো প্রশ্নগুলোই আবার সামনে আসতে পারে।
এ কথা অবশ্যই সত্য যে, একটি রাষ্ট্রের জন্য বিশেষায়িত আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর প্রয়োজন হতে পারে। সংঘবদ্ধ অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ, জটিল অপরাধ ও বিশেষ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দক্ষ ও প্রশিক্ষিত বাহিনী রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। কিন্তু সেই বাহিনীর ক্ষমতা যদি সুস্পষ্টভাবে সীমাবদ্ধ না থাকে এবং কার্যকর জবাবদিহির ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে বিশেষ ক্ষমতা অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
র্যাবের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অভিযোগের অন্যতম বড় বিষয় ছিল দায়মুক্তির সংস্কৃতি। তাই শুধু বাহিনীর নাম পরিবর্তন করে সেই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বরং আইন, কাঠামো, সদস্য নিয়োগ ও যাচাই, প্রশিক্ষণ, কমান্ড কাঠামো, বলপ্রয়োগের নীতি, অভিযোগ তদন্ত এবং স্বাধীন তদারকি—প্রতিটি ক্ষেত্রেই মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গোপন বন্দিশালায় নির্যাতন এবং অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র্যাব দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কিত ছিল। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের তথ্যানুসন্ধানী প্রতিবেদনেও র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশের বিষয়টি সামনে আসে। ফলে র্যাব বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত জনমনে প্রত্যাশা তৈরি করাই স্বাভাবিক।
কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে র্যাবের বিলুপ্তি কাগজে-কলমে একটি প্রশাসনিক পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। যে কারণে র্যাব বিলুপ্তির দাবি উঠেছিল, সেই কারণগুলোকে চিহ্নিত করে তার প্রতিকার নিশ্চিত করাই হতে হবে মূল লক্ষ্য।
কোনো আইন কখনো বিচ্ছিন্নভাবে কার্যকর হয় না; বরং একটি বিস্তৃত আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অংশ হিসেবে কাজ করে। তাই র্যাব যে জবাবদিহিহীনতা ও দায়মুক্তির পরিবেশে কাজ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে, এসআরবিও যদি একই ধরনের পরিবেশে কাজ করে, তাহলে নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রকৃত পরিবর্তন আসবে না।
র্যাব থেকে এসআরবি—এই রূপান্তর যদি কেবল নাম, পোশাক কিংবা প্রশাসনিক কাঠামোর কিছু পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে এটি প্রতীকী অর্জন হতে পারে; কিন্তু কাঠামোগত সমস্যার সমাধান হবে না। রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে নাগরিক স্বাধীনতা ও অধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাহিনীর ওপর কার্যকর বেসামরিক ও স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
সুতরাং র্যাব কিংবা অন্য কোনো বিশেষায়িত বাহিনী বিলুপ্ত করে নতুন নামে আরেকটি বাহিনী গঠন করাই মূল সমাধান নয়। সবচেয়ে জরুরি হলো—আইনের শাসন, মানবাধিকার, স্বচ্ছতা, স্বাধীন তদারকি এবং কার্যকর জবাবদিহির ভিত্তিতে আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আমূল সংস্কার করা। র্যাব থেকে এসআরবিতে পরিবর্তন তখনই অর্থবহ হবে, যখন এটি শুধু একটি নামের পরিবর্তন না হয়ে রাষ্ট্রীয় আইন প্রয়োগের সংস্কৃতিতে একটি মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা করবে। দেশবাসীর প্রত্যাশা, নতুন বাহিনী যেন পুরোনো বিতর্কের পুনরাবৃত্তি না করে বরং নাগরিকের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠে।
এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া
লেখক: রাজনীতিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক
ই-মেইল: gmbhuiyan@gmail.com
