বিশ্ব হাতি দিবস: ১১ বছরে শেরপুরে ৩৯ হাতি ও ৩৬ মানুষের মৃত্যু

প্রকাশিত: বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬, ১১:১০ পূর্বাহ্ণ
বিশ্ব হাতি দিবস: ১১ বছরে শেরপুরে ৩৯ হাতি ও ৩৬ মানুষের মৃত্যু

বিশ্ব হাতি দিবসে গারো পাহাড়ের বন্য হাতি সংরক্ষণ ও মানুষ-হাতির সংঘাত কমানোর আহ্বান।

১১৩

আজ ১২ আগস্ট বিশ্ব হাতি দিবস। বিশ্বের হাতিদের সংরক্ষণ, তাদের আবাসস্থল রক্ষা এবং মানুষ ও হাতির সংঘাত কমাতে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে প্রতিবছর দিনটি পালিত হয়। ২০২৬ সালের বিশ্ব হাতি দিবসের আন্তর্জাতিক বার্তা হলো ‘Bringing the world together to help elephants’—অর্থাৎ হাতি রক্ষায় বিশ্বকে একসঙ্গে এগিয়ে আসার আহ্বান। বিশ্ব হাতি দিবস ২০১২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে।

তবে বিশ্বজুড়ে হাতি রক্ষার এই আহ্বানের দিনে বাংলাদেশের গারো পাহাড়ের বন্য হাতিদের বাস্তবতা বেশ কঠিন। শেরপুরের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় বনভূমি ও হাতির চলাচলের পথ সংকুচিত হওয়ায় খাবার ও পানির সন্ধানে প্রায়ই হাতির পাল লোকালয়ের কাছাকাছি চলে আসে। এতে একদিকে ফসল ও বসতবাড়ির ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে মানুষ ও হাতি উভয়ের জীবনই ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

গভীর রাতে পাহাড়ি এলাকার মানুষের ঘুম ভাঙে গাছ ভাঙার শব্দে। ঘর থেকে বের হলে দেখা যায়, বন্য হাতির একটি দল লোকালয়ের দিকে এগিয়ে এসেছে। হাতি তাড়াতে স্থানীয়রা কখনো মশাল জ্বালান, কখনো ঢাকঢোল পেটান, আবার কেউ কেউ চিৎকার করে হাতির পালকে বনের দিকে ফেরানোর চেষ্টা করেন। অনেক সময় হাতি ফিরে গেলেও পরিস্থিতি সবসময় শান্তিপূর্ণ থাকে না। সংঘাতের ঘটনায় মানুষ যেমন প্রাণ হারান, তেমনি মারা যায় বন্য হাতিও।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৫ সাল থেকে শেরপুর জেলায় মানুষ ও হাতির সংঘাতে অন্তত ৪৭টি হাতি ও ৬৭ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৪ সাল থেকে গত ১১ বছরে মারা গেছে ৩৯টি হাতি ও ৩৬ জন মানুষ। স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা এই সংঘাতের ভয়াবহতা এসব পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট।

শেরপুরের নালিতাবাড়ী, শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতী এবং ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার প্রায় ৬০ কিলোমিটার সীমান্তবর্তী এলাকায় গারো পাহাড়ের বন্য হাতির বিচরণ রয়েছে। বনভূমি কমে যাওয়া, মানুষের বসতি সম্প্রসারণ এবং হাতির ঐতিহ্যগত চলাচলের পথ সংকুচিত হওয়ার কারণে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ছে।

স্থানীয় কৃষকদের জন্যও হাতির বিচরণ বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ। রাতে হাতির পাল ধান, ভুট্টা, কলা, কাঁঠালসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি করে। কখনো কখনো বসতবাড়িতেও ঢুকে পড়ে। বছরের পর বছর ফসল নষ্ট হওয়ায় অনেক কৃষক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

নালিতাবাড়ীর কালাপানি এলাকার কৃষক বিজয় কুবির অভিজ্ঞতাও একই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই দশক ধরে তিনি হাতির সঙ্গে সংঘাতের মধ্যেই বসবাস করছেন। প্রতি বছর পরিশ্রম করে উৎপাদন করা ফসল হাতির পাল নষ্ট করে দেয়। কখনো বসতবাড়িতেও ক্ষয়ক্ষতি হয়।

বিশ্ব হাতি দিবসের মূল উদ্দেশ্য শুধু হাতি নিয়ে আলোচনা করা নয়, বরং তাদের অস্তিত্বের জন্য তৈরি হওয়া হুমকিগুলো সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা। আন্তর্জাতিকভাবে হাতির বড় হুমকির মধ্যে রয়েছে আবাসস্থল ধ্বংস, চোরাশিকার, অবৈধভাবে হাতির দাঁতের বাণিজ্য এবং মানুষ-হাতির সংঘাত।

গারো পাহাড়ের পরিস্থিতিতেও মানুষের কর্মকাণ্ডের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। বন ও হাতির চলাচলের পথ যত সংকুচিত হচ্ছে, হাতির পক্ষে স্বাভাবিক আবাসস্থলে খাবার ও পানি খুঁজে পাওয়া তত কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে লোকালয়ে হাতির প্রবেশের ঘটনা বাড়ছে এবং একই সঙ্গে মানুষের নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাতি সংরক্ষণ করতে হলে শুধু হাতিকে রক্ষা করলেই হবে না; স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা ও নিরাপত্তার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। হাতির চলাচলের পথ সংরক্ষণ, বনভূমি রক্ষা, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কার্যকর ক্ষতিপূরণ এবং স্থানীয় মানুষকে সঙ্গে নিয়ে সংঘাত কমানোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

বিশ্ব হাতি দিবস তাই গারো পাহাড়ের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা নিয়ে এসেছে—হাতিকে বাঁচাতে হলে মানুষকেও নিরাপদ রাখতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে মানুষ ও হাতির সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হলে বন, হাতির আবাসস্থল এবং চলাচলের করিডর রক্ষা করার পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।

বিশ্ব হাতি দিবসের আন্তর্জাতিক প্রচারণাও হাতি ও তাদের আবাসস্থল রক্ষায় সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেয়। বাংলাদেশের গারো পাহাড়েও সেই সম্মিলিত উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে মানুষ ও বন্য হাতির দীর্ঘদিনের সংঘাত কমিয়ে উভয়ের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page