বুলিমিয়া কী কেন হয় এবং কতটা বিপজ্জনক? জানেন কী
বুলিমিয়া কী কেন হয় এবং কতটা বিপজ্জনক?
খাবার আমাদের শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির উৎস। তবে কখনও কখনও খাবারকে ঘিরে এমন কিছু মানসিক সমস্যা তৈরি হয়, যা একজন মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হতে পারে। তেমনই একটি গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা হলো বুলিমিয়া নার্ভোসা (Bulimia Nervosa)।
অনেকেই মনে করেন এটি শুধু বেশি খাওয়ার সমস্যা। কিন্তু বাস্তবে বুলিমিয়া একটি জটিল খাদ্যাভ্যাসজনিত মানসিক রোগ, যা একজন মানুষের জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না হলে এটি হৃদ্রোগ, কিডনি সমস্যা, হজমজনিত জটিলতা এমনকি জীবনহানির ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
বুলিমিয়া কী?
বুলিমিয়া হলো এমন একটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, যেখানে আক্রান্ত ব্যক্তি অল্প সময়ের মধ্যে অস্বাভাবিক পরিমাণ খাবার খেয়ে ফেলেন। এরপর ওজন বেড়ে যাওয়ার ভয় বা অপরাধবোধ থেকে সেই খাবার শরীর থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
এ জন্য অনেকেই ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করেন, অতিরিক্ত ব্যায়াম করেন, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকেন অথবা ওজন কমানোর ওষুধ ও ল্যাক্সেটিভ ব্যবহার করেন। এই চক্র বারবার চলতে থাকে এবং ধীরে ধীরে এটি একটি গুরুতর রোগে পরিণত হয়।
বুলিমিয়ার সাধারণ লক্ষণ
বুলিমিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা অনেক সময় তাদের সমস্যা লুকিয়ে রাখেন। ফলে পরিবার বা বন্ধুরা সহজে বিষয়টি বুঝতে পারেন না।
তবে কিছু সাধারণ লক্ষণ হলো—
- একসঙ্গে অনেক বেশি খাবার খাওয়া।
- খাবার খাওয়ার পরপরই বাথরুমে চলে যাওয়া।
- বারবার বমি করার অভ্যাস।
- ওজন নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ।
- শরীরের আকৃতি নিয়ে অসন্তুষ্টি।
- অতিরিক্ত ব্যায়াম করা।
- গোপনে খাবার খাওয়া।
- আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া।
কেন হয় এই রোগ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বুলিমিয়ার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। সামাজিক চাপ, সৌন্দর্য নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা, ওজন কমানোর প্রবণতা, আত্মসম্মানবোধের ঘাটতি, উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং পারিবারিক ইতিহাস—সবকিছুই এর জন্য দায়ী হতে পারে।
বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘পারফেক্ট বডি’ দেখানোর প্রবণতা অনেক তরুণ-তরুণীর মধ্যে নিজের শরীর নিয়ে অসন্তুষ্টি তৈরি করতে পারে, যা কিছু ক্ষেত্রে বুলিমিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
শরীরে কী ধরনের ক্ষতি করে?
বুলিমিয়া শুধু মানসিক নয়, শারীরিকভাবেও ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে। বারবার বমি করার কারণে শরীরে পানি ও খনিজের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, হৃদস্পন্দনের সমস্যা এবং গুরুতর ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাক পর্যন্ত হতে পারে।
পাকস্থলীর অ্যাসিড বারবার মুখে আসার কারণে দাঁতের এনামেল ক্ষয়ে যেতে পারে। দাঁত ভেঙে যাওয়া, মাড়ির সমস্যা এবং মুখের দুর্গন্ধও দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া গলা ব্যথা, খাদ্যনালী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, হজমের সমস্যা এবং কিডনির জটিলতাও হতে পারে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন?
গবেষণায় দেখা গেছে, কিশোরী ও তরুণীদের মধ্যে বুলিমিয়ার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। তবে পুরুষরাও এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। যারা মডেলিং, অভিনয়, নাচ বা খেলাধুলার মতো পেশায় যুক্ত, যেখানে শরীরের গঠন নিয়ে চাপ বেশি থাকে, তাদের ঝুঁকি বেশি হতে পারে।
চিকিৎসা সম্ভব?
হ্যাঁ, বুলিমিয়ার কার্যকর চিকিৎসা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত শনাক্ত করা গেলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সফলভাবে চিকিৎসা সম্ভব। চিকিৎসার মধ্যে থাকে কাউন্সেলিং, সাইকোথেরাপি, কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (CBT), পুষ্টি পরামর্শ এবং প্রয়োজন হলে ওষুধ। পরিবার ও বন্ধুদের সহায়তাও রোগীর সুস্থ হওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
যদি কোনো ব্যক্তি নিয়মিত অতিরিক্ত খাওয়ার পর বমি করেন, ওজন নিয়ে অস্বাভাবিক উদ্বেগে ভোগেন অথবা খাবারকে ঘিরে অস্বাস্থ্যকর আচরণ প্রদর্শন করেন, তাহলে দ্রুত মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা শুরু করলে জটিলতা অনেকটাই এড়ানো সম্ভব।
শেষ কথা
বুলিমিয়া কোনো সাধারণ খাদ্যাভ্যাস নয়, এটি একটি গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা। অনেক সময় আক্রান্ত ব্যক্তি বাইরে থেকে স্বাভাবিক দেখালেও ভেতরে ভেতরে বড় ধরনের শারীরিক ও মানসিক সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে পারেন। তাই লক্ষণগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

আপনার মতামত লিখুন
Array