১৫০০ কোটি টাকায় নগদ কিনতে যাচ্ছে আবুল খায়ের গ্রুপ

প্রকাশিত: 25-05-2026 1:50 PM
১৫০০ কোটি টাকায় নগদ কিনতে যাচ্ছে আবুল খায়ের গ্রুপ

ডাক বিভাগের ব্র্যান্ড ব্যবহার করে যাত্রা শুরু করলেও দীর্ঘদিন ধরে মালিকানা, অনুমোদন, আর্থিক অনিয়ম ও প্রশাসনিক জটিলতা নিয়ে বিতর্কে থাকা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান ‘নগদ’ এবার বড় ধরনের পুনর্গঠনের পথে এগোচ্ছে। সরকারের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা কাঠামো পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী আবুল খায়ের গ্রুপ নগদ অধিগ্রহণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

আরও পড়ুনঃ-নগদ অ্যাপে নতুন নিরাপত্তা আপডেট, জাতীয় পরিচয়পত্র স্ক্যান করে মিলবে বাড়তি সুরক্ষা

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, নগদের মোট দায় প্রায় ৬০০ কোটি টাকা, যা পরিশোধ করবে আবুল খায়ের গ্রুপ। হাতবদলের মূল্যসহ পুরো লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা হতে পারে। দায় শোধের পর সরকার প্রায় ৯০০ কোটি টাকা পাবে বলে জানা গেছে। তবে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সিআইডির চলমান মামলাগুলোর নিষ্পত্তি প্রয়োজন হবে।

এর আগে সৌদি আরবভিত্তিক একটি শিল্পগোষ্ঠী প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকায় নগদ অধিগ্রহণে আগ্রহ দেখালেও শেষ পর্যন্ত সরকার তাতে সম্মতি দেয়নি। সরকারের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, নগদের মতো বিশাল গ্রাহকভিত্তিক একটি ডিজিটাল আর্থিক প্ল্যাটফর্ম পরিচালনার জন্য শক্তিশালী মূলধন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং দক্ষ করপোরেট ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। এ কারণেই আবুল খায়ের গ্রুপকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

১৯৫৩ সালে চট্টগ্রামে ছোট একটি বিড়ি কারখানা হিসেবে যাত্রা শুরু করা আবুল খায়ের গ্রুপ বর্তমানে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ইস্পাত, সিমেন্ট, সিরামিকস, খাদ্য ও ভোগ্যপণ্য, দুগ্ধজাত পণ্য এবং তামাক খাতে বড় পরিসরে ব্যবসা পরিচালনা করছে।

গত বৃহস্পতিবার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম সভাপতিত্ব করেন। সেখানে নগদের আর্থিক দায়, মামলার জটিলতা এবং ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে নগদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, প্রতিষ্ঠানটি অনুমোদিত অর্থ সংরক্ষণ ছাড়াই প্রায় ৬০০ কোটি টাকার ‘ফেইক’ বা অবৈধ ই-মানি তৈরি করে বাজারে ছেড়েছে। অর্থাৎ গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে ডিজিটাল অর্থ দেখানো হলেও তার বিপরীতে ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রকৃত অর্থ জমা রাখা হয়নি।

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, কোনো গ্রাহকের নগদ অ্যাকাউন্টে ৫ হাজার টাকা দেখানো হলে সেই অর্থের সমপরিমাণ টাকা ব্যাংকে সংরক্ষিত থাকার কথা। কিন্তু নগদের ক্ষেত্রে সেই নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে এই অর্থ এখন প্রতিষ্ঠানটির দায় হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতার অন্তত ১ হাজার ৭১১ কোটি ৪৯ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগে নগদের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ মিশুক এবং তার সহযোগীদের নাম এসেছে। তদন্তে বলা হয়েছে, ৪১টি অননুমোদিত ডিস্ট্রিবিউটরের মাধ্যমে এই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়।

অন্যদিকে ক্যান্ডেলস্টোন ইনভেস্টমেন্টস ও সিগমা ইঞ্জিনিয়ার্সের মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শেয়ার হস্তান্তরের সময় প্রায় ৫০০ কোটি টাকা পাচারের সন্দেহও করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এছাড়া ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে শেয়ার হস্তান্তরের বিষয়টিও তদন্তাধীন রয়েছে।

নগদের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক ও ডাক বিভাগকে বিভ্রান্ত করতে একটি ‘ম্যানিপুলেটেড রিপোর্টিং পোর্টাল’ তৈরি করা হয়েছিল। নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে যে তথ্য দেওয়া হতো, তার সঙ্গে মূল ডাটাবেজের কোনো মিল ছিল না বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

তবে এতসব বিতর্ক ও অনিয়মের অভিযোগের মধ্যেও নগদের বড় শক্তি হচ্ছে এর বিশাল গ্রাহকভিত্তি। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় সাড়ে ৫ কোটি গ্রাহক রয়েছে এবং প্রতিদিন গড়ে ৭০০ কোটির বেশি টাকার লেনদেন হয়। এমএফএস খাতে বিকাশের পরেই নগদের অবস্থান।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এত বড় গ্রাহকভিত্তি এবং দৈনিক বিপুল লেনদেনের কারণে এখনও নগদের বাজার সম্ভাবনা অনেক বেশি। সহজে হিসাব খোলার সুযোগ, দ্রুত গ্রাহক নিবন্ধন এবং মোবাইল অপারেটরভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় অন্তর্ভুক্তির কারণে খুব অল্প সময়েই সেবাটি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

বর্তমানে নগদে স্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক মিলিয়ে প্রায় ৮০০ কর্মী কাজ করছেন। এর মধ্যে নিয়মিত কর্মী ৬২৫ জন। প্রতিষ্ঠানটির মাসিক পরিচালন ব্যয় প্রায় ৮০ কোটি টাকা। ব্যয় কমাতে ইতোমধ্যে বিজ্ঞাপন কার্যক্রম সীমিত করা হয়েছে, লোকবল কমানো হয়েছে এবং বড় অফিস ছেড়ে ছোট পরিসরে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নগদের বড় আয়ের উৎস হচ্ছে ব্যাংকে সংরক্ষিত অর্থের সুদ। প্রতি মাসে গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ কোটি টাকা সুদ আয় হয়। এছাড়া প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০ কোটি টাকার রেমিট্যান্সও আসে নগদের মাধ্যমে।

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক নগদের পর্ষদ ভেঙে প্রশাসক নিয়োগ দেয়। পরে উচ্চ আদালত সেটি অবৈধ ঘোষণা করলে দায়িত্ব নেয় ডাক অধিদফতর। তবে প্রযুক্তিনির্ভর এই আর্থিক সেবা পরিচালনায় সরকারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর আগেই জানিয়েছিলেন, ডাক অধিদফতরের পক্ষে নগদের মতো প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তাই নতুন বিনিয়োগকারী খোঁজা হচ্ছে।

ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেছেন, “নগদ দেশের ডিজিটাল আর্থিক খাতে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্ল্যাটফর্ম। গ্রাহকের স্বার্থ ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করেই সরকার পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।”

এদিকে নগদের হেড অব মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশনস মুহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম দাবি করেছেন, গ্রাহকের অর্থ সম্পূর্ণ নিরাপদ রয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব আয় দিয়েই কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আবুল খায়ের গ্রুপের মতো বড় শিল্পগোষ্ঠী যুক্ত হলে নগদের আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে পারে। তবে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, মামলা এবং নিয়ন্ত্রক জটিলতা কাটিয়ে প্রতিষ্ঠানটি কত দ্রুত আস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

সূত্র: সময়ের আলো

আরও পড়ুনঃ- বিকাশ পেমেন্ট স্পিকার কীভাবে কাজ করে?নতুন ডিজিটাল লেনদেন প্রযুক্তি

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে– ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

📌 পোস্টটি শেয়ার করুন! 🔥

স্টাফ রিপোর্টার

স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে আমি 'টেক বাংলা নিউজ' (ssitbari.com)-এ নিয়মিত বিভিন্ন তথ্যভিত্তিক ও আপডেটেড কনটেন্ট প্রকাশ করি। প্রযুক্তি, মোবাইল, গ্যাজেটসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য বিষয় সহজ ও বোধগম্য ভাষায় পাঠকদের কাছে তুলে ধরা আমার লক্ষ্য। নির্ভরযোগ্য তথ্য, বিশ্লেষণ ও উপকারী টিপসের মাধ্যমে পাঠকদের সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার চেষ্টা করি।

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now