বাংলাদেশে ভূমি ব্যবস্থাপনাকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল করার অংশ হিসেবে সরকার চালু করেছে অনলাইন ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) পরিশোধ ব্যবস্থা। আগে যেখানে ইউনিয়ন ভূমি অফিসে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে খাজনা দিতে হতো, এখন সেখানে ঘরে বসেই কয়েকটি সহজ ধাপ অনুসরণ করে অনলাইনে জমির খাজনা পরিশোধ করা সম্ভব। এতে সময়, খরচ এবং ভোগান্তি—সবকিছুই কমে গেছে।
এই সেবা পরিচালনা করছে ভূমি মন্ত্রণালয় এর অধীনস্থ ডিজিটাল ভূমি সেবা প্ল্যাটফর্ম, যেখানে দেশের নাগরিকরা সহজেই তাদের জমির তথ্য যুক্ত করে খাজনা দিতে পারছেন।
আরও পড়ুন-অনলাইনে জমির খাজনা ক্যালকুলেটর ব্যবহার করার নিয়ম (২০২৬)
বর্তমানে অনলাইনে খাজনা দেওয়ার জন্য প্রথমে নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে একটি অ্যাকাউন্ট তৈরি করতে হয়। নতুন ব্যবহারকারীদের জন্য রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়াটি খুবই সহজ। জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল নম্বর দিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলে লগইন করলে ব্যবহারকারীর একটি ব্যক্তিগত ড্যাশবোর্ড তৈরি হয়, যেখানে তার জমি সংক্রান্ত সব তথ্য সংরক্ষিত থাকে।
লগইন করার পর ব্যবহারকারীকে নিজের প্রোফাইল সম্পূর্ণ করতে হয়। প্রোফাইলে নাম, ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যসহ প্রয়োজনীয় সব তথ্য সঠিকভাবে পূরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী যাচাই কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।
এরপর মূল কাজ শুরু হয় জমির খতিয়ান সংযুক্ত করার মাধ্যমে। ড্যাশবোর্ড থেকে ভূমি উন্নয়ন কর অপশন নির্বাচন করে খতিয়ান সংযুক্ত করতে হয়। এখানে জেলা, উপজেলা, মৌজা এবং খতিয়ান নম্বরসহ জমির সঠিক তথ্য প্রদান করতে হয়। সঠিক তথ্য দিলে সিস্টেমে জমির রেকর্ড যুক্ত হয় এবং তা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে পাঠানো হয়।
সাধারণত খতিয়ান সংযুক্ত করার পর কয়েক কার্যদিবস সময় লাগে যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে। এই সময়ের মধ্যে ভূমি অফিস থেকে জমির তথ্য যাচাই করা হয়। সব তথ্য সঠিক থাকলে সেটি অনুমোদন করা হয় এবং ব্যবহারকারীর প্রোফাইলে হোল্ডিং হিসেবে যুক্ত হয়ে যায়।
অনুমোদন সম্পন্ন হলে ব্যবহারকারী তার ড্যাশবোর্ডে হোল্ডিং তালিকায় জমির তথ্য দেখতে পারেন। এখানে প্রতিটি জমির জন্য আলাদা হোল্ডিং নম্বর থাকে, যা দিয়ে খাজনা পরিশোধ করা যায়।
এরপর আসে খাজনা পরিশোধের ধাপ। হোল্ডিং তালিকা থেকে নির্দিষ্ট জমি নির্বাচন করলে সেখানে বকেয়া খাজনার পরিমাণ, বছর এবং অন্যান্য তথ্য দেখা যায়। ব্যবহারকারী চাইলে সরাসরি পেমেন্ট অপশনে গিয়ে অনলাইনে খাজনা পরিশোধ করতে পারেন।
বর্তমানে এই পেমেন্ট সিস্টেমে মোবাইল ব্যাংকিংসহ বিভিন্ন ডিজিটাল পেমেন্ট মাধ্যম যুক্ত রয়েছে। যেমন—বিকাশ, নগদ, রকেট কিংবা ব্যাংক কার্ডের মাধ্যমে সহজেই খাজনা পরিশোধ করা যায়। পেমেন্ট সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই একটি ডিজিটাল রসিদ (দাখিলা) তৈরি হয়, যা অনলাইনে সংরক্ষণ বা ডাউনলোড করা যায়।
এই দাখিলা সরকারি কাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ডকুমেন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়। জমি সংক্রান্ত যেকোনো কাজে, যেমন—নামজারি, বিক্রয়, ব্যাংক লোন বা আইনি প্রক্রিয়ায় এই দাখিলা প্রয়োজন হয়।
অনলাইনে জমির খাজনা দেওয়ার নিয়ম (আপডেট)
🔗 অফিসিয়াল ওয়েবসাইট: https://land.gov.bd সেবা প্রদানকারী: ভূমি মন্ত্রণালয়
🔹 ধাপ–১: ওয়েবসাইটে প্রবেশ ও অ্যাকাউন্ট তৈরি
প্রথমে গুগলে গিয়ে land.gov.bd লিখে সার্চ করুন এবং অফিসিয়াল সাইটে প্রবেশ করুন। নতুন হলে “Login/Register” থেকে রেজিস্ট্রেশন করে অ্যাকাউন্ট তৈরি করুন।
🔹 ধাপ–২: লগইন করুন
আপনার আইডি, পাসওয়ার্ড এবং ক্যাপচা পূরণ করে প্রোফাইলে লগইন করুন।
🔹 ধাপ–৩: প্রোফাইল সম্পূর্ণ করুন
“Profile Edit” অপশনে গিয়ে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য (নাম, ঠিকানা, NID ইত্যাদি) সঠিকভাবে পূরণ করে প্রোফাইল ১০০% সম্পন্ন করুন।
🔹 ধাপ–৪: খতিয়ান যুক্ত করুন
ড্যাশবোর্ড থেকে “ভূমি উন্নয়ন কর” নির্বাচন করে “খতিয়ান” অপশনে যান।
এরপর নতুন খতিয়ান যুক্ত করতে প্রয়োজনীয় তথ্য (জেলা, উপজেলা, মৌজা, খতিয়ান নম্বর) দিয়ে সাবমিট করুন।
🔹 ধাপ–৫: অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা
খতিয়ান যুক্ত করার পর ২–৩ কার্যদিবস অপেক্ষা করুন।
ভূমি অফিস যাচাই শেষে স্ট্যাটাসে “অনুমোদিত” দেখাবে।
🔹 ধাপ–৬: হোল্ডিং তালিকা দেখুন
অনুমোদনের পর “হোল্ডিং তালিকা” অপশনে গেলে আপনার জমির হোল্ডিং নম্বর যুক্ত হয়ে যাবে।
সেখানে “Details / আই বাটন” এ ক্লিক করুন।
🔹 ধাপ–৭: খাজনা পরিশোধ করুন
এখানে মালিকের নাম ও বকেয়া খাজনা দেখতে পাবেন।
“Payment” অপশনে গিয়ে বিকাশ / নগদ / রকেট / ব্যাংক কার্ড দিয়ে পেমেন্ট সম্পন্ন করুন।
🔹 ধাপ–৮: দাখিলা (রসিদ) সংগ্রহ করুন
পেমেন্ট সম্পন্ন হলে সাথে সাথে অনলাইন রসিদ (দাখিলা) পাবেন।
এটি “দাখিলা” অপশন থেকে ডাউনলোড বা প্রিন্ট করতে পারবেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইনে খাজনা দেওয়ার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা। আগে যেখানে খাজনা প্রদানের ক্ষেত্রে অনিয়ম বা অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ ছিল, এখন সেখানে নির্ধারিত ফি অনুযায়ী সরাসরি সরকারি কোষাগারে টাকা জমা হয়। ফলে দুর্নীতির সুযোগ অনেকাংশে কমে গেছে।
এছাড়া অনলাইন সিস্টেমের মাধ্যমে যেকোনো সময় খাজনার তথ্য দেখা যায় এবং পূর্বের রেকর্ডও সংরক্ষিত থাকে। ফলে ভবিষ্যতে জমি সংক্রান্ত কোনো বিরোধ তৈরি হলে এই ডিজিটাল রেকর্ড গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।
তবে অনলাইনে খাজনা দেওয়ার সময় কিছু বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি। প্রথমত, খতিয়ান নম্বর, মৌজা ও জেলার তথ্য সঠিকভাবে দিতে হবে। ভুল তথ্য দিলে খতিয়ান সংযুক্ত হবে না বা আবেদন বাতিল হতে পারে। দ্বিতীয়ত, প্রোফাইলের তথ্য জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে মিল থাকতে হবে। তৃতীয়ত, পেমেন্ট করার সময় নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করা উচিত, যাতে কোনো সমস্যা না হয়।
গ্রামীণ এলাকাতেও এই সেবা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। অনেকেই এখন ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার বা মোবাইল ফোন ব্যবহার করে নিজেরাই খাজনা পরিশোধ করছেন। ফলে সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার উদ্যোগ আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, অনলাইনে জমির খাজনা পরিশোধ ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের জন্য একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন। সঠিক নিয়ম অনুসরণ করলে খুব সহজেই ঘরে বসে খাজনা দেওয়া যায় এবং প্রয়োজনীয় দাখিলা সংগ্রহ করা সম্ভব।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
আরও পড়ুন-খাজনা দিতে খতিয়ান যুক্ত করার নিয়ম(আপডেট)
👉🙏লেখার মধ্যে ভাষা জনিত কোন ভুল ত্রুটি হয়ে থাকলে অবশ্যই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
✅আজ এ পর্যন্তই ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন 🤔










