দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে ডিজিটাল প্রযুক্তি। একসময় জমির খতিয়ান তোলা, নামজারি সম্পন্ন করা কিংবা ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করতে সাধারণ মানুষকে দিনের পর দিন ইউনিয়ন ভূমি অফিস, উপজেলা ভূমি অফিস বা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ঘুরতে হতো। দীর্ঘসূত্রতা, জটিল প্রক্রিয়া এবং দালালচক্রের কারণে ভোগান্তি ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা। তবে বর্তমানে অনলাইনভিত্তিক ভূমি সেবা চালুর ফলে সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
আরও পড়ুন-আগামী ৩০ জুনের মধ্যে অনলাইনে খাজনা পরিশোধের নির্দেশ ভূমি মন্ত্রণালয়ের
সরকারের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ উদ্যোগের অংশ হিসেবে ভূমি মন্ত্রণালয় ও ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর (ডিএলআরএস) ধাপে ধাপে ভূমি ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে এসেছে। এখন ঘরে বসেই মোবাইল ফোন বা কম্পিউটার ব্যবহার করে জমির খতিয়ান সংগ্রহ, ই-নামজারি আবেদন, ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ, মৌজা ম্যাপ দেখা এবং বিভিন্ন তথ্য যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ডিজিটাল সেবার কারণে শুধু সময় ও খরচই কমেনি, বরং সেবাপ্রাপ্তির প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা বেড়েছে। ফলে মধ্যস্বত্বভোগী ও দালালচক্রের প্রভাবও আগের তুলনায় কমে এসেছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) এমদাদুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, অটোমেশন চালুর ফলে এখন আর সাধারণ মানুষকে বেশিরভাগ সেবার জন্য সরাসরি ভূমি অফিসে যেতে হচ্ছে না। অনলাইনেই অধিকাংশ কাজ সম্পন্ন করা যাচ্ছে, যা দুর্নীতি কমানোর পাশাপাশি সেবার গতি বাড়িয়েছে।
তবে তিনি মনে করেন, প্রযুক্তির সুবিধা পুরোপুরি পেতে নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। কারণ অনেক ক্ষেত্রে মানুষ নিজে আবেদন না করে এখনও দালালের ওপর নির্ভর করছেন। এতে প্রতারণার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা পরিশোধে ডিজিটাল পদ্ধতি সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন এনেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আগে খাজনা দিতে ভূমি অফিসে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হতো এবং অনেক সময় একাধিকবার যাতায়াত করতে হতো। এখন অনলাইনে বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কয়েক মিনিটেই কর পরিশোধ করা যাচ্ছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ নাগরিক অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করছেন। শুধু দেশেই নয়, বিদেশে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিরাও এখন ঘরে বসে নিজেদের জমির খাজনা পরিশোধ করতে পারছেন।
লক্ষ্মীপুরের বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন বলেন, আগে খাজনা দিতে পুরো একটি দিন নষ্ট হয়ে যেত। এখন মোবাইল ফোনেই কয়েক মিনিটে কাজ শেষ করা যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে রশিদ পাওয়া যায়।
জমি কেনাবেচার পর মালিকানা হালনাগাদ করার জন্য নামজারি বা মিউটেশন প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরেই সবচেয়ে জটিল সেবাগুলোর একটি ছিল। আবেদন করতে গিয়ে অনেকেই দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা খরচ করতেন। কিন্তু অনলাইনে ই-নামজারি চালুর পর সেই পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে।
এখন আবেদনকারীরা নিজেই অনলাইনে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আপলোড করে আবেদন করতে পারছেন। একই সঙ্গে আবেদনের প্রতিটি ধাপ মোবাইলে এসএমএসের মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে আবেদন কোথায় আটকে আছে বা কতদূর অগ্রগতি হয়েছে, তা সহজেই জানা যাচ্ছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন পর্যন্ত ১ কোটির বেশি ই-নামজারি আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়েছে। বর্তমানে আরও কয়েক লাখ আবেদন বিভিন্ন পর্যায়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (মাঠ প্রশাসন অনুবিভাগ) নাসরিন জাহান জানিয়েছেন, অনলাইনে নামজারি চালুর ফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি অনেক কমেছে। একই সঙ্গে আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি করতে মাঠ প্রশাসনকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তি না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমি খাতে ডিজিটাল রূপান্তর দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। কারণ ভূমি সংক্রান্ত সেবা দীর্ঘদিন ধরেই দুর্নীতি ও জটিলতার অন্যতম বড় ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত ছিল। প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালুর ফলে সাধারণ মানুষ এখন আগের তুলনায় দ্রুত ও কম খরচে সেবা পাচ্ছেন।
তবে তারা বলছেন, গ্রামীণ পর্যায়ে ডিজিটাল সচেতনতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। অনেক মানুষ এখনও অনলাইন সেবা ব্যবহারে অভ্যস্ত নন। তাই সহজ নির্দেশনা, সহায়তামূলক সেবা এবং তথ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে আরও উন্নত ডিজিটাল সেবা চালু হলে ভূমি ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত হবে এবং দালালনির্ভরতা আরও কমে আসবে।
সূত্র: ভূমি মন্ত্রণালয়, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর (ডিএলআরএস) এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য।
আরও পড়ুন-খাজনা দিতে খতিয়ান যুক্ত করার নিয়ম(আপডেট)
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
👉🙏লেখার মধ্যে ভাষা জনিত কোন ভুল ত্রুটি হয়ে থাকলে অবশ্যই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
✅আজ এ পর্যন্তই ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন 🤔










