বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই জমি সংক্রান্ত জটিলতা, দখলদারিত্ব, নামজারি ভোগান্তি এবং হয়রানির অভিযোগ সাধারণ মানুষের অন্যতম বড় সমস্যাগুলোর একটি। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ, মামলা ও প্রতারণার কারণে অনেক কৃষক ও সাধারণ মানুষ বছরের পর বছর দুর্ভোগে পড়েন। এবার সেই পরিস্থিতি বদলাতে ভূমি ব্যবস্থাপনাকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করার ঘোষণা দিয়েছে সরকার।
আরও পড়ুন-আগামী ৩০ জুনের মধ্যে অনলাইনে খাজনা পরিশোধের নির্দেশ ভূমি মন্ত্রণালয়ের
ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু বলেছেন, জমির প্রকৃত মালিক যেন তার অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন এবং ভূমি ব্যবস্থায় কোনো ধরনের দখলদারিত্ব না থাকে, সেজন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, ভূমি সুরক্ষা এবং কৃষকদের জমির মালিকানা নিশ্চিত করতে সরকার এখন কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
সোমবার সচিবালয়ে ‘ভূমিসেবা মেলা ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন ভূমিমন্ত্রী। এ সময় ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ভূমিমন্ত্রী বলেন, অতীতে জমি সংক্রান্ত নানা মামলা, জটিলতা এবং দুর্নীতির কারণে মানুষ চরম হয়রানির শিকার হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত মালিক নিজের জমির ন্যায্য অধিকার পেতেও দীর্ঘদিন ধরে আদালত ও অফিসে ঘুরেছেন। সরকার এখন সেই পুরোনো পরিস্থিতি বদলাতে চায়।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ভূমি ব্যবস্থাপনাকে ধাপে ধাপে আধুনিক, জনবান্ধব ও প্রযুক্তিনির্ভর করার জন্য কাজ করছে। আগে অনেকেই নিজেদের দেশের মালিক ভাবতেন, এখন সরকার চায় জনগণ যেন প্রকৃত অর্থেই রাষ্ট্রের মালিক হিসেবে সেবা পান।
মন্ত্রী আরও বলেন, ভূমি মন্ত্রণালয় এমন একটি জায়গা, যেখানে মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। তাই জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করার চেষ্টা চলছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভুলত্রুটি থাকলে জনগণ ও গণমাধ্যম যেন সেটি তুলে ধরে—সেই আহ্বানও জানান তিনি।
ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, ভূমি মন্ত্রণালয়কে দুর্নীতিমুক্ত ও হয়রানিমুক্ত করতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। জনগণকে সচেতন করা এবং আধুনিক ভূমিসেবা সম্পর্কে ধারণা দিতেই এবার সারাদেশে ভূমিসেবা মেলার আয়োজন করা হয়েছে।
তিনি জানান, এখন থেকে দেশের ৮৯৩টি সার্ভিস সেন্টারের মাধ্যমে মানুষ ভূমিসেবা নিতে পারবেন। ফলে সাধারণ মানুষকে ছোটখাটো কাজের জন্য জেলা বা বিভাগীয় শহরে যেতে হবে না।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী বারবার বলেছেন—বাংলাদেশের জনগণই এ দেশের প্রকৃত মালিক। ভূমি মন্ত্রণালয়ও সেই নীতিতেই কাজ করতে চায়। যারা সেবা নিতে আসবেন, তারা যেন সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে সেবা পান, সেটিই সরকারের লক্ষ্য।
প্রেস ব্রিফিংয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদ বলেন, ইতোমধ্যে দেশের ভূমিসেবার বড় অংশ ডিজিটালাইজড করা হয়েছে। এখন ই-নামজারি, অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর প্রদান, অনলাইনে খতিয়ান ও মৌজা ম্যাপ সংগ্রহ, ডাকযোগে ভূমিসেবা এবং ডিসিআর ফি প্রদানসহ বিভিন্ন সেবা ঘরে বসেই নেওয়া যাচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর এই সেবাগুলোর কারণে সাধারণ মানুষের সময় ও খরচ কমছে। একই সঙ্গে কমছে দুর্নীতি ও দালাল নির্ভরতা।
সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে ভূমি সংক্রান্ত সব সেবা ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ অটোমেটেড করা। এজন্য একাধিক প্রকল্প ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
ভূমিসেবা মেলা ২০২৬ উপলক্ষে সরকার ১৯ থেকে ২১ মে পর্যন্ত তিন দিনব্যাপী সারাদেশে বিশেষ আয়োজন করেছে। উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় পর্যায়ের পাশাপাশি ঢাকার তেজগাঁওয়ে অবস্থিত ভূমি ভবনেও মেলা অনুষ্ঠিত হবে।
এবারের মেলার প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—“জনবান্ধব অটোমেটেড ভূমি ব্যবস্থাপনাঃ সুরক্ষিত ভূমি, সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ”।
মেলায় নাগরিকদের সরাসরি বিভিন্ন ভূমিসেবা দেওয়া হবে। পাশাপাশি অনলাইন সেবা ব্যবহারের পদ্ধতি শেখানো, অভিযোগ গ্রহণ, তাৎক্ষণিক সমাধান এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রমও পরিচালিত হবে।
সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মেলায় মোট পাঁচটি জাতীয় স্টল, জেলা প্রশাসনের ১৫টি স্টল এবং বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ২০টি করে ভূমিসেবা স্টল থাকবে। এছাড়া ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর, ভূমিসেবা সহায়তা কেন্দ্র, বিভিন্ন ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের স্টলও থাকবে।
মেলায় অডিও-ভিডিও কনটেন্ট প্রদর্শন, কুইজ প্রতিযোগিতা, ভূমি আড্ডা, জনসচেতনতামূলক সেমিনার এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে বিশেষ কার্যক্রমও রাখা হয়েছে।
সাধারণ মানুষের মধ্যে “ভূমি আমার ঠিকানা” শীর্ষক বুকলেট, লিফলেট ও স্টিকার বিতরণ করা হবে। এছাড়া ভ্রাম্যমাণ ভূমিসেবা ভ্যানের মাধ্যমেও সেবা পৌঁছে দেওয়া হবে বিভিন্ন এলাকায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের ভূমি খাতে দুর্নীতি, দালালচক্র এবং জটিল কাগজপত্র সাধারণ মানুষের জন্য বড় ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ডিজিটালাইজেশন ও অটোমেশন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে সেই দুর্ভোগ অনেকাংশে কমে আসবে।
তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, শুধু প্রযুক্তি চালু করলেই হবে না, মাঠপর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি। নইলে অনলাইন ব্যবস্থার আড়ালেও নতুন ধরনের অনিয়ম তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে সরকার এখন ভূমি ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে হাঁটছে। ভূমি সুরক্ষা, ডিজিটাল সেবা এবং হয়রানিমুক্ত ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়ন করা গেলে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র: ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রেস ব্রিফিং, সচিবালয়।
আরও পড়ুন-খাজনা দিতে খতিয়ান যুক্ত করার নিয়ম(আপডেট)










