বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। দীর্ঘদিন ধরে ভাতা বৃদ্ধি ও সুবিধাভোগীর সংখ্যা বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন মুক্তিযোদ্ধা, বয়স্ক, বিধবা নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও সমাজের অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী। অবশেষে সেই দাবির প্রতিফলন দেখা গেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক গুরুত্বপূর্ণ সভায়।
আরও পড়ুন-প্রতিবন্ধী ভাতা কয় মাস পর পর দেয়?
রোববার (২৫ জানুয়ারি) অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির ৩২তম সভায় ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য ভাতা কাঠামো ও উপকারভোগীর সংখ্যা চূড়ান্ত করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমদ। এতে সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, সামাজিক বৈষম্য হ্রাস এবং ন্যূনতম মানবিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্ত হলো খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা এবং শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের মাসিক ভাতা এক লাফে ৫ হাজার টাকা বৃদ্ধি। এই সিদ্ধান্তকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি রাষ্ট্রের সম্মান প্রদর্শনের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে মুক্তিযোদ্ধাদের আর্থিক নিরাপত্তা বাড়ানোর দাবি ছিল, যা এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাস্তবায়নের পথে এগোলো।
সভায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের জন্য সম্মানী ভাতা চালুর সুপারিশ। পাশাপাশি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের ভিজিএফ কর্মসূচিকেও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মাধ্যমে আরও বিস্তৃত জনগোষ্ঠী সরকারি সহায়তার আওতায় আসবে।
জেলেদের জন্য খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। নতুন অর্থবছরে ২ লাখ ৭৩ হাজার ৫১৪ জন নতুন জেলে এই কর্মসূচিতে যুক্ত হবেন। ফলে মোট ১৫ লাখ জেলে এই সুবিধা পাবেন। এটি দেশের প্রান্তিক জেলেদের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বয়স্ক ভাতা খাতেও এসেছে বড় পরিবর্তন। উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়িয়ে করা হয়েছে ৬২ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ৫৯ লাখ ৯৫ হাজার ব্যক্তি মাসিক ৭০০ টাকা করে ভাতা পাবেন। অন্যদিকে ৯০ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রায় ২ লাখ ৫ হাজার ব্যক্তি পাবেন মাসিক ১,০০০ টাকা। এই সিদ্ধান্ত বয়স্ক নাগরিকদের ন্যূনতম জীবনযাপনে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দেবে।
বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা নারীদের জন্যও ভাতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। বর্তমানে এই কর্মসূচির আওতায় রয়েছে ২৯ লাখ নারী। এর মধ্যে ২৮ লাখ ৭৫ হাজার নারী মাসিক ৭০০ টাকা করে পাবেন। আর ৯০ বছর ঊর্ধ্ব ২৫ হাজার নারী পাবেন মাসিক ১,০০০ টাকা। এই ভাতা নারীদের আর্থিক স্বাবলম্বিতা ও সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রতিবন্ধী ভাতা ও শিক্ষা উপবৃত্তিতেও এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। মোট ৩৬ লাখ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এই ভাতার আওতায় আসবেন। এর মধ্যে ৩৫ লাখ ৮১ হাজার ৯০০ জন মাসিক ৯০০ টাকা এবং ১৮ হাজার ১০০ জন পাবেন ১,০০০ টাকা। পাশাপাশি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য মাসিক বৃত্তির পরিমাণও বাড়ানো হয়েছে—প্রাথমিক স্তরে ৯৫০ টাকা, মাধ্যমিকে ১,০০০ টাকা, উচ্চ মাধ্যমিকে ১,১০০ টাকা এবং উচ্চতর শিক্ষায় ১,৩৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচিতেও ভাতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এই খাতে ২ লাখ ২৮ হাজার ৩৮৯ জন উপকারভোগী মাসিক ৭০০ টাকা করে পাবেন। একই সঙ্গে অনগ্রসর শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির পরিমাণও বাড়ানো হয়েছে, যা তাদের শিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়াতে সহায়ক হবে।
এছাড়া দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রমের আওতায় ৫ হাজার ৪৯০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, যা তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াবে। গুরুতর রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য চিকিৎসা সহায়তাও দ্বিগুণ করা হয়েছে। আগে যেখানে এককালীন ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হতো, এখন তা বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা করা হয়েছে। এই সহায়তা ক্যান্সার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোক, জন্মগত হৃদরোগ ও থ্যালাসেমিয়ার মতো জটিল রোগে আক্রান্তদের জন্য প্রযোজ্য।
মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচিতেও বড় পরিসরে সুবিধা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এই কর্মসূচির আওতায় ১৮ লাখ ৯৫ হাজার ২০০ জন মা মাসিক ৮৫০ টাকা করে পাবেন। এটি মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশু পুষ্টি নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় সুবিধাভোগী পরিবার বাড়িয়ে করা হয়েছে ৬০ লাখ। এই কর্মসূচির আওতায় প্রতি পরিবার কেজি প্রতি ১৫ টাকা দরে মাসে ৩০ কেজি চাল ৬ মাস পর্যন্ত পাবে। যা নিম্নআয়ের পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিস্তৃত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি দেশের দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য একটি বড় সহায়তা হিসেবে কাজ করবে। এটি শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, বরং একটি মানবিক রাষ্ট্র গঠনের প্রতিফলন।
সব মিলিয়ে, সরকারের এই সিদ্ধান্তগুলো সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে এবং দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আরও পড়ুন-প্রতিবন্ধী ভাতা মোবাইলের কোন ব্যাংকিং এ দেওয়া হয়?
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
👉🙏লেখার মধ্যে ভাষা জনিত কোন ভুল ত্রুটি হয়ে থাকলে অবশ্যই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
✅আজ এ পর্যন্তই ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন 🤔










