বাংলাদেশে স্মার্টফোন এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং শিক্ষা, ডিজিটাল পেমেন্ট, অনলাইন আয় এবং সরকারি সেবা গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। তবে উচ্চমূল্যের কারণে এখনও দেশের অনেক নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের জন্য স্মার্টফোন কেনা সহজ নয়। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলের বহু মানুষ অর্থসংকটের কারণে স্মার্টফোন ব্যবহার থেকে পিছিয়ে আছেন। এই বাস্তবতায় কম আয়ের মানুষের জন্য সহজ কিস্তিতে স্মার্টফোন কেনার সুযোগ তৈরি করেছে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান পামপে লিমিটেড।
আরও পড়ুন-একবার চার্জেই চলবে টানা ৩ দিন, বাংলাদেশে রিয়েলমির নতুন স্মার্টফোন
প্রতিষ্ঠানটি “বাই নাউ পে লেটার” বা কিস্তিভিত্তিক স্মার্টফোন অর্থায়ন সেবা চালু করে ইতোমধ্যে বড় সাড়া ফেলেছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিল মাসেই এক লাখের বেশি মানুষ এই সুবিধার মাধ্যমে স্মার্টফোন কিনেছেন। এসব গ্রাহকের জন্য প্রায় ১৯৪ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছে পামপে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের এই সময়ে স্মার্টফোন ব্যবহার এখন অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। অনলাইন ক্লাস, মোবাইল ব্যাংকিং, ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল পেমেন্ট কিংবা সরকারি বিভিন্ন সেবা নিতে স্মার্টফোনের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ফলে কম আয়ের মানুষের জন্য সহজ অর্থায়ন নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন প্রযুক্তি ও আর্থিক খাত বিশ্লেষকরা।
পামপে লিমিটেড বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে অনুমোদন পাওয়ার পর থেকেই নিয়মিতভাবে এই অর্থায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জুন জেং ইথান জানিয়েছেন, বর্তমানে স্মার্টফোন বিলাসপণ্য নয়, বরং ডিজিটাল সমাজে অংশগ্রহণের অপরিহার্য মাধ্যম। সেই লক্ষ্য থেকেই তারা সহজ শর্তে স্মার্টফোন অর্থায়ন সেবা চালু করেছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সুবিধা গ্রহণকারীদের মধ্যে প্রায় ১৯ শতাংশ নারী। এছাড়া মোট গ্রাহকের প্রায় অর্ধেকই জীবনে প্রথমবারের মতো স্মার্টফোন ব্যবহার শুরু করেছেন। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এটি দেশের ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তথ্যে আরও দেখা গেছে, প্রায় ৭১ শতাংশ গ্রাহক স্মার্টফোন ব্যবহার করে ডিজিটাল পেমেন্ট সেবা গ্রহণ করছেন। এছাড়া ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ফি পরিশোধেও এই ফোন ব্যবহার করছেন। ফলে শুধু যোগাযোগ নয়, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাক্ষেত্রেও স্মার্টফোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
গ্রাহকদের মধ্যে শহর ও গ্রামের ব্যবহারকারীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। প্রায় ৪৪ হাজার গ্রাহক গ্রামীণ অঞ্চল থেকে এবং ৫২ হাজারের বেশি শহরাঞ্চল থেকে এই সুবিধা নিয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি প্রমাণ করে যে স্মার্টফোনের চাহিদা এখন শুধু শহরকেন্দ্রিক নয়, গ্রামেও দ্রুত বাড়ছে।
সবচেয়ে বেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে ১৫ হাজার টাকা বা তার বেশি মূল্যের স্মার্টফোন কেনার জন্য। এই ক্যাটাগরিতে প্রায় ৬৪ হাজার গ্রাহককে ১৪৭ কোটির বেশি টাকা অর্থায়ন করা হয়েছে।
বর্তমানে টেকনো, ইনফিনিক্স ও আইটেল ব্র্যান্ডের স্মার্টফোনের ক্ষেত্রে এই ঋণ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। দেশজুড়ে প্রায় ৫ হাজার বিক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে গ্রাহকরা এই সুবিধা নিতে পারছেন। তবে গ্রাহকদের হাতে সরাসরি নগদ অর্থ দেওয়া হয় না। বরং অনুমোদনের পর নির্দিষ্ট ফোনটি কিনে দেওয়া হয়।
ঋণ নেওয়ার জন্য গ্রাহককে জাতীয় পরিচয়পত্র, একজন গ্যারান্টারের এনআইডি এবং ব্যাংক বা আর্থিক লেনদেনের তথ্য জমা দিতে হয়। ব্যবসায়ী হলে ব্যবসার আর্থিক তথ্যও দেখাতে হয়। এছাড়া ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের লেনদেন তথ্যও গ্রহণ করা হচ্ছে।
এই সেবার আওতায় ফোন কেনার সময় গ্রাহককে মোট মূল্যের প্রায় ১৫ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিতে হয়। এরপর বাকি অর্থ ৬ বা ১২ মাসের কিস্তিতে পরিশোধ করা যায়।
তবে কিস্তি পরিশোধ না করলে ধাপে ধাপে সতর্কবার্তা পাঠানো হয় বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রথমে খুদে বার্তা, পরে বিশেষ সতর্কতা দেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় কিস্তি বকেয়া থাকলে ফোনের কিছু ফিচার সীমিত বা নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে পারে।
পামপে জানিয়েছে, বর্তমানে তারা ৪ কোটির বেশি ব্যবহারকারী এবং প্রায় ১০ লাখ মার্চেন্টকে বিভিন্ন সেবা দিচ্ছে। প্রতিদিন তাদের প্ল্যাটফর্মে কোটি কোটি টাকার ডিজিটাল লেনদেন সম্পন্ন হচ্ছে।
প্রযুক্তি ও অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, সহজ শর্তে স্মার্টফোন অর্থায়ন চালু হওয়ায় দেশের আরও বেশি মানুষ ডিজিটাল সেবার আওতায় আসতে পারবেন। তবে একই সঙ্গে গ্রাহকদের সচেতনভাবে ঋণ নেওয়া এবং সময়মতো কিস্তি পরিশোধের দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
সূত্র: পামপে লিমিটেডের প্রতিবেদন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও প্রযুক্তি খাত সংশ্লিষ্ট তথ্য।
আরও পড়ুনঃ- দামি স্মার্টফোন কিনলেই কি লাভ বেশি, নাকি মিড-রেঞ্জ ফোনই এখন যথেষ্ট








