নতুন অডিট ঠেকাতে বিটিআরসির ক্ষমতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছে গ্রামীণফোন

প্রকাশিত: 18-05-2026 5:08 AM
নতুন অডিট ঠেকাতে বিটিআরসির ক্ষমতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছে গ্রামীণফোন

দেশের সবচেয়ে বড় মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোনকে ঘিরে আবারও নতুন করে শুরু হয়েছে অডিট বিতর্ক। আগের অডিটে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ও রাজস্ব বকেয়ার অভিযোগ এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। এর মধ্যেই ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গ্রামীণফোনের কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে ১০ বছরের অডিট শুরু করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। তবে অডিট শুরু হওয়ার আগেই বিটিআরসির এখতিয়ার ও অডিট প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে সেটি স্থগিতের আবেদন করেছে গ্রামীণফোন।

আরও পড়ুন-টেলিটক বিক্রি নয়, নতুন বিনিয়োগকারী খুঁজছে সরকার

নতুন এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে দেশের টেলিকম খাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ক্ষমতা, অপারেটরদের জবাবদিহি এবং দীর্ঘদিনের আর্থিক বিরোধ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, গ্রামীণফোনের “অপারেটরস প্রসিডিউর অ্যান্ড সিস্টেমস অডিট” পরিচালনার জন্য ‘হাওলাদার ইউনুস অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দিয়েছে বিটিআরসি। পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়নে নির্বাচিত এই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে প্রায় ৩ কোটি ১৭ লাখ টাকার চুক্তিও সম্পন্ন হয়েছে। বিটিআরসি চেয়ারম্যানের অনুমোদনের পর আনুষ্ঠানিক কার্যাদেশ দেওয়া হয়।

তবে অডিট কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগেই এর পরিধি, আইনগত ভিত্তি, তথ্য যাচাই পদ্ধতি এবং অডিটরদের নিরপেক্ষতা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে গ্রামীণফোন। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, অডিটের শর্তাবলিতে এমন কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা বিটিআরসির আইনি এখতিয়ারের বাইরে পড়ে।

গ্রামীণফোন বলছে, কর ফাঁকি, বৈদেশিক মুদ্রা স্থানান্তর, শেয়ার লেনদেন, মানবসম্পদ নীতিমালা, দেশি-বিদেশি ঋণ কিংবা শ্রম আইন সংক্রান্ত বিষয়গুলো বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, বিএসইসি বা বিডার মতো অন্যান্য সংস্থার অধীনে পড়ে। তাই এসব বিষয়ে বিটিআরসির অডিট করার ক্ষমতা নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলেছে।

একই সঙ্গে ১০ বছরের তথ্য যাচাইকে বাস্তবসম্মত নয় বলেও দাবি করেছে অপারেটরটি। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এত দীর্ঘ সময়ের তথ্য সংরক্ষণ ও যাচাই করা জটিল হতে পারে। অনেক তথ্য নির্দিষ্ট সময় পর আর সংরক্ষণ করা হয় না বলেও উল্লেখ করেছে তারা।

এছাড়া অডিট টিমের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে গ্রামীণফোন। প্রতিষ্ঠানটির অভিযোগ, নতুন অডিট টিমের কিছু সদস্য আগের অডিটের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ফলে একই ব্যক্তিদের আবারও অডিটে অন্তর্ভুক্ত করা হলে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

বিটিআরসির কাছে পাঠানো এক চিঠিতে গ্রামীণফোন পুরো অডিট কার্যক্রম স্থগিত রেখে “সুগঠিত আলোচনা” শুরু করার আহ্বান জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, আগের অডিটেও পদ্ধতিগত ভুল ছিল এবং সেই বিষয়গুলো এখনো আদালতে বিচারাধীন।

তবে বিটিআরসি এসব অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে। সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, অডিট প্রক্রিয়া বিলম্বিত ও বাধাগ্রস্ত করতেই এ ধরনের প্রশ্ন তুলছে গ্রামীণফোন।

বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী বলেছেন, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সময়কালের নতুন অডিট আগের ১৯৯৭ থেকে ২০১৪ সালের অডিট থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তাই বিচারাধীন পুরোনো মামলার সঙ্গে এই অডিটের কোনো সম্পর্ক নেই।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০১ এবং মোবাইল অপারেটর লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী বিটিআরসি যে কোনো সময় লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের আর্থিক, প্রযুক্তিগত ও পরিপালন অডিট পরিচালনা করার পূর্ণ ক্ষমতা রাখে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, নতুন অডিটেও বড় ধরনের আর্থিক গরমিল বা অনিয়ম ধরা পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই গ্রামীণফোন অডিট প্রক্রিয়া ঠেকানোর চেষ্টা করছে।

এর আগে বিটিআরসির ইনফরমেশন সিস্টেম অডিটে গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম, রাজস্ব ফাঁকি এবং রেগুলেটরি আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠে আসে। ১৯৯৭ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত পরিচালিত ওই অডিটের ভিত্তিতে বিটিআরসি ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) মিলে প্রায় ১২ হাজার ৫৮০ কোটি টাকার দাবি তোলে।

এর মধ্যে বিটিআরসির দাবি ছিল প্রায় ৮ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা এবং এনবিআরের অংশ ছিল প্রায় ৪ হাজার ৮৫ কোটি টাকা। বিষয়টি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘ আইনি বিরোধ তৈরি হয়, যা এখনো পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি।

অডিট প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক কলের আয় কম দেখানো, রাজস্ব ভাগ কম দেওয়া, তরঙ্গ ফি নির্ধারণে অসংগতি, কল তথ্যের হিসাবে গরমিল এবং বিটিআরসির পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায় পূর্ণাঙ্গ তথ্য না দেওয়ার মতো নানা অভিযোগ উঠে এসেছিল।

এছাড়া সিম নিবন্ধন সংক্রান্ত অনিয়ম, সীমান্তবর্তী এলাকায় অনুমোদন ছাড়া টাওয়ার স্থাপন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি সহায়তা ব্যবস্থায় ঘাটতির অভিযোগও ছিল সেই প্রতিবেদনে।

তবে গ্রামীণফোন শুরু থেকেই দাবি করে আসছে, আগের অডিট ছিল “ত্রুটিপূর্ণ” এবং অর্থ দাবির বড় অংশ ভুল হিসাব ও সুদের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছিল।

গ্রামীণফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ বলেছেন, প্রতিষ্ঠানটি সবসময় বিটিআরসির নিয়ন্ত্রক কাঠামোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তবে নতুন অডিট শুরু করার আগে কিছু আইনগত ও প্রক্রিয়াগত বিষয়ে স্পষ্টতা প্রয়োজন বলে তারা মনে করছেন।

তার মতে, একটি স্থিতিশীল, স্বচ্ছ ও আস্থাভিত্তিক নিয়ন্ত্রক পরিবেশ টেলিকম খাতের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও গ্রাহকসেবার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে বিটিআরসি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্য অপারেটররা অডিটে সহযোগিতা করলেও গ্রামীণফোনের এমন আপত্তি বড় ধরনের আর্থিক দুর্বলতা বা অনিয়ম আড়াল করার চেষ্টা হতে পারে।

খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের টেলিকম খাত এখন বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ৫জি, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের এই সময়ে অপারেটরদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই নতুন অডিট শেষ পর্যন্ত কী ফল নিয়ে আসে, সেটির দিকে নজর রয়েছে পুরো খাতের।

সূত্র: বিটিআরসি, গ্রামীণফোনের লিখিত বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট সূত্র।

আরও পড়ুন-টেলিটক স্বাগতম প্যাকেজে ৬০ মিনিট, ৫ জিবি ডাটা ও কম কলরেট সুবিধা

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

📌 পোস্টটি শেয়ার করুন! 🔥

স্টাফ রিপোর্টার

স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে আমি 'টেক বাংলা নিউজ' (ssitbari.com)-এ নিয়মিত বিভিন্ন তথ্যভিত্তিক ও আপডেটেড কনটেন্ট প্রকাশ করি। প্রযুক্তি, মোবাইল, গ্যাজেটসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য বিষয় সহজ ও বোধগম্য ভাষায় পাঠকদের কাছে তুলে ধরা আমার লক্ষ্য। নির্ভরযোগ্য তথ্য, বিশ্লেষণ ও উপকারী টিপসের মাধ্যমে পাঠকদের সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার চেষ্টা করি।

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now