ভারতের অন্ধ্র প্রদেশ সরকার এবার জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে উৎসাহ দিতে নতুন প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এন চন্দ্রবাবু নাইডু জানিয়েছেন, তৃতীয় সন্তান জন্ম নিলে পরিবারকে দেওয়া হবে ৩০ হাজার রুপি এবং চতুর্থ সন্তানের জন্য দেওয়া হবে ৪০ হাজার রুপি সরকারি ভাতা। এ ঘোষণা ঘিরে ইতোমধ্যেই দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা।
আরও পড়ুন-দেশে চালু হচ্ছে ই-হেলথ কার্ড প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বড় উদ্যোগ
রবিবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘদিন পরিবার পরিকল্পনার পক্ষে অবস্থান নেওয়া অন্ধ্র প্রদেশ সরকার এবার জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন নীতির দিকে যাচ্ছে।
শনিবার শ্রীকাকুলাম জেলার নারসান্নাপেটায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন অন্ধ্র প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ও তেলেগু দেশাম পার্টির (টিডিপি) প্রধান চন্দ্রবাবু নাইডু। সেখানে তিনি বলেন, “আমি বিষয়টি নিয়ে অনেকবার চিন্তা করেছি। অতীতে পরিবার পরিকল্পনার পক্ষে কাজ করেছি। কিন্তু এখন সময় এসেছে সন্তানদের সম্পদ হিসেবে দেখার।”
তিনি আরও বলেন, “তৃতীয় সন্তান জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই পরিবারকে ৩০ হাজার রুপি দেওয়া হবে। আর চতুর্থ সন্তানের জন্য দেওয়া হবে ৪০ হাজার রুপি।” কমে যাওয়া জন্মহার নিয়ে তিনি বেশ কিছুদিন ধরেই উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন জনসংখ্যা কমে যাওয়ার প্রবণতা নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও ইউরোপের কয়েকটি দেশে জন্মহার কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে কর্মক্ষম জনসংখ্যা সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। অন্ধ্র প্রদেশ সরকারও সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখে জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে উৎসাহ দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মুখ্যমন্ত্রী নাইডু বলেন, বর্তমানে অনেক দম্পতি আয় বাড়ার কারণে একটি সন্তানেই সীমাবদ্ধ থাকছেন। আবার কেউ কেউ প্রথম সন্তান মেয়ে হলে দ্বিতীয় সন্তানের পরিকল্পনা করছেন। ফলে দীর্ঘমেয়াদে জনসংখ্যার ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।
তিনি জানান, একটি দেশের জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে মোট প্রজনন হার বা টোটাল ফার্টিলিটি রেট (টিএফআর) ২ দশমিক ১ রাখা জরুরি। অর্থাৎ একজন নারীর গড়ে অন্তত ২ দশমিক ১ সন্তান থাকলে জনসংখ্যার ভারসাম্য বজায় থাকে।
তবে এই ঘোষণার পর রাজনৈতিক মহলে সমালোচনাও শুরু হয়েছে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, লোকসভায় ভবিষ্যতে আসনসংখ্যা পুনর্বিন্যাসের পরিকল্পনার সঙ্গে এই নীতির সম্পর্ক থাকতে পারে। তাদের দাবি, দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোতে জনসংখ্যা কমে গেলে ভবিষ্যতে লোকসভায় আসনসংখ্যাও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভারতীয় ন্যাশনাল কংগ্রেসের মুখপাত্র অলোক শর্মা বলেন, “গত ১২ বছরে পরিবার পরিকল্পনা ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কার্যত কোনো জাতীয় নীতি দেখা যায়নি। এখন লোকসভায় আসনসংখ্যা বাড়ানোর আলোচনা হচ্ছে, আর দক্ষিণ ভারতে এই বার্তা গেছে যে কম জনসংখ্যার কারণে তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব কমে যেতে পারে।”
তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, “পরিবার পরিকল্পনা ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে সুস্পষ্ট নীতি কেন আনা হচ্ছে না?”
এদিকে কংগ্রেস নেতা কার্তি চিদাম্বরম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এনডিটিভির প্রতিবেদন শেয়ার করে কটাক্ষ করে লেখেন, “সত্যি নাকি?”
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের মতো বিশাল জনসংখ্যার দেশে একদিকে পরিবার পরিকল্পনা, অন্যদিকে জন্মহার কমে যাওয়ার উদ্বেগ—দুই ধরনের বাস্তবতা একসঙ্গে দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতের কয়েকটি রাজ্যে শিক্ষার হার ও আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জন্মহারও কমছে। ফলে ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান, অর্থনীতি ও সামাজিক ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক উন্নত দেশ বর্তমানে জন্মহার কমে যাওয়ার কারণে বড় ধরনের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী কমে গেলে উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও প্রভাব পড়ে। ফলে বিভিন্ন দেশ এখন জন্মহার বাড়াতে নগদ প্রণোদনা, কর ছাড় ও বিশেষ সুবিধা দেওয়ার মতো নীতি গ্রহণ করছে।
অন্ধ্র প্রদেশ সরকারের এই নতুন ঘোষণাও সেই বৈশ্বিক প্রবণতার অংশ হিসেবে দেখছেন অনেকে। তবে এটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে এখনো বিতর্ক চলছে।
সূত্র: এনডিটিভি ও ভারতীয় গণমাধ্যম প্রতিবেদন।
আরও পড়ুন-সরকারি ই-হেলথ কার্ড চালু হচ্ছে কবে? জানালেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী








