রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল অপারেটর টেলিটককে নতুন করে ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের ১০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘিরে দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কাছে তরঙ্গ, লাইসেন্স ফি ও মাশুল বাবদ ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি বকেয়া থাকার পরও অপারেটরটি মূল্যবান এই স্পেকট্রাম পাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও বেসরকারি অপারেটররা।
আরও পড়ুন-টেলিটক বিক্রি নয়, নতুন বিনিয়োগকারী খুঁজছে সরকার
বিটিআরসির সর্বশেষ কমিশন সভায় টেলিটককে ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের ১০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই ব্যান্ডকে বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর স্পেকট্রামগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ কম সংখ্যক টাওয়ার ব্যবহার করেই বিস্তৃত এলাকায় দ্রুতগতির নেটওয়ার্ক সেবা দেওয়া সম্ভব হয়। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকা, মহাসড়ক এবং ভবনের ভেতরে সিগন্যাল পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এই ব্যান্ড অত্যন্ত কার্যকর।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বিটিআরসি প্রতি মেগাহার্টজ তরঙ্গের মূল্য নির্ধারণ করেছে ২৩৭ কোটি টাকা। সেই হিসাবে ১০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রামের মোট মূল্য দাঁড়ায় ২ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। তবে এই অর্থ সরাসরি নগদে পরিশোধ করতে হবে না টেলিটককে। সরকারের পক্ষ থেকে এটিকে “ইকুইটি ইনভেস্টমেন্ট” হিসেবে বিবেচনা করা হবে। অর্থাৎ বকেয়া অর্থকে ফেরতযোগ্য দায় হিসেবে না দেখে সরকারের মালিকানার অংশ হিসেবে ধরা হবে।
এ সিদ্ধান্তের পর টেলিকম খাতে বৈষম্যের অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে। কারণ একই ব্যান্ডের তরঙ্গ কিনতে গিয়ে উচ্চমূল্যের অভিযোগ তুলে নিলাম থেকেই সরে দাঁড়িয়েছিল দেশের বড় দুই বেসরকারি অপারেটর রবি ও বাংলালিংক। পরে একক দরদাতা হিসেবে গ্রামীণফোন ১০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম পায়। এখন টেলিটককে আরও ১০ মেগাহার্টজ দেওয়ায় বাকি অপারেটরদের জন্য অবশিষ্ট থাকছে মাত্র ৫ মেগাহার্টজ।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, টেলিটকের জন্য যেন আলাদা নিয়ম কার্যকর করা হচ্ছে। বেসরকারি অপারেটরদের সময়মতো লাইসেন্স ফি, রাজস্ব ভাগাভাগি ও স্পেকট্রামের মূল্য পরিশোধ করতে হলেও টেলিটকের ক্ষেত্রে বারবার ছাড় দেওয়া হচ্ছে। এতে বাজারে প্রতিযোগিতার ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী জানিয়েছেন, সরকার টেলিটকের বকেয়া অর্থকে “ইকুইটি ইনভেস্টমেন্টে” রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সেই ভিত্তিতেই নতুন তরঙ্গ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। তার মতে, রাষ্ট্রীয় অপারেটর হিসেবে টেলিটকের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু তরঙ্গ বরাদ্দ দিলেই টেলিটকের অবস্থার উন্নতি হবে না। কারণ অতীতেও বিপুল পরিমাণ স্পেকট্রাম বরাদ্দ পেয়েও সেগুলোর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারেনি অপারেটরটি।
বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে টেলিটকের হাতে ৯০০, ১৮০০, ২১০০ ও ২৩০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড মিলিয়ে মোট ৫৫ দশমিক ২ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম রয়েছে। সর্বশেষ ২০২২ সালে ২৩০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের ৩০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ কিনলেও সেটি এখনো পুরোপুরি ব্যবহার শুরু করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।
অন্যদিকে গ্রাহকসংখ্যার তুলনায় টেলিটকের হাতে থাকা স্পেকট্রামের পরিমাণ বেসরকারি অপারেটরদের তুলনায় অনেক বেশি। বর্তমানে টেলিটকের গ্রাহকসংখ্যা প্রায় ৬৮ লাখ। সে হিসাবে প্রতি লাখ গ্রাহকের জন্য তাদের হাতে আছে প্রায় শূন্য দশমিক ৮১ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম। যেখানে গ্রামীণফোনের ক্ষেত্রে এই হার শূন্য দশমিক ১৬, রবির ক্ষেত্রে শূন্য দশমিক ২২ এবং বাংলালিংকের ক্ষেত্রে শূন্য দশমিক ২১।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বেশি স্পেকট্রাম থাকার পরও নেটওয়ার্ক মান, কাভারেজ এবং গ্রাহকসেবায় টেলিটক এখনো প্রতিযোগিতায় অনেক পিছিয়ে। দেশের বড় বেসরকারি অপারেটরগুলো নিয়মিত মুনাফা করলেও টেলিটক বছরের পর বছর লোকসান গুনছে।
টেলিটকের প্রকাশিত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের পরিচালনা প্রতিবেদনে দেখা যায়, ওই বছরে প্রতিষ্ঠানটির লোকসান হয়েছে প্রায় ১৮০ কোটি টাকা। ফলে নতুন তরঙ্গ বরাদ্দের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক বি এম মইনুল হোসেন বলেন, বাজারে প্রতিযোগিতার ভারসাম্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে অন্য অপারেটরদের জন্য পর্যাপ্ত তরঙ্গ না থাকলে বাজারে “মনোপলি” পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সাধারণ গ্রাহকের ওপর।
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে টেলিটককে সহায়তা করার প্রয়োজন থাকতে পারে। তবে আগে বরাদ্দ দেওয়া স্পেকট্রামের কার্যকর ব্যবহার কতটা হয়েছে, সেটি মূল্যায়ন করা উচিত ছিল।
প্রযুক্তি নীতিমালা বিশ্লেষক আবু নাজম মো. তানভীর হোসেনও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, টেলিটকের গ্রাহকসংখ্যার তুলনায় তাদের হাতে থাকা স্পেকট্রামের পরিমাণ ইতোমধ্যেই অনেক বেশি। তাই নতুন বরাদ্দ দিতে হলে স্বচ্ছ পরিকল্পনা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
অন্যদিকে টেলিটকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নতুন স্পেকট্রামকে শুধু বাণিজ্যিক সম্পদ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি রাষ্ট্রীয় টেলিকম অবকাঠামো শক্তিশালী করার দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
টেলিটকের তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা মো. গোলাম মোরশেদ বলেন, সরকারের “ইকুইটি ইনভেস্টমেন্ট” উদ্যোগ জাতীয় টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোকে শক্তিশালী করার অংশ। নতুন স্পেকট্রাম ভবিষ্যতে গ্রামীণ এলাকায় ৫জি সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল সংযোগ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তবে খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শুধু তরঙ্গ বরাদ্দ নয়, বরং টেলিটকের ব্যবসায়িক দক্ষতা, সেবার মান এবং পরিচালন কাঠামোতেও বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। নইলে বিপুল পরিমাণ স্পেকট্রাম থাকার পরও প্রতিষ্ঠানটি প্রতিযোগিতায় পিছিয়েই থাকবে।
সূত্র: বিটিআরসি কমিশন সভার সিদ্ধান্ত, টেলিটক ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য।
আরও পড়ুন-টেলিটক স্বাগতম প্যাকেজে ৬০ মিনিট, ৫ জিবি ডাটা ও কম কলরেট সুবিধা










