রাজধানী ঢাকার দীর্ঘদিনের সবচেয়ে বড় সমস্যা যানজট। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে আটকে থাকা, কর্মঘণ্টার অপচয় এবং জ্বালানি নষ্ট হওয়া যেন নগরবাসীর নিত্যদিনের বাস্তবতা। তবে এবার সেই চিত্র বদলে দিতে বড় পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। ‘জিরো সিগন্যাল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট’ নামে নতুন এক প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকাকে সিগন্যালমুক্ত, নিরবচ্ছিন্ন যান চলাচলের শহরে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন-বাইকের ট্রাফিক মামলা জরিমানা কত ২০২৬ আপডেট তালিকা
পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাজধানীর উত্তর-দক্ষিণ এবং পূর্ব-পশ্চিম বরাবর প্রায় ১০৫ কিলোমিটার সড়ককে একটি এক্সপ্রেসওয়ে নেটওয়ার্কে যুক্ত করা হবে। এই নেটওয়ার্কে থাকবে না কোনো ট্রাফিক সিগন্যাল। ফলে যানবাহন একবার প্রবেশ করলে মাঝপথে থামা ছাড়াই নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে।
কেন দরকার এই প্রকল্প
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার যানজট এখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (BUET)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীতে যানবাহনের গড় গতি ঘণ্টায় মাত্র ৪ কিলোমিটার। প্রতিদিন প্রায় ৯০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে শুধু যানজটের কারণে।
এছাড়া প্রতিদিন প্রায় ১ দশমিক ৮ কোটি লিটার জ্বালানি অপচয় হচ্ছে, যার আর্থিক ক্ষতি প্রায় ২১৬ কোটি টাকা। বছরে এই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৭৮ হাজার কোটি টাকা। পাশাপাশি বায়ুদূষণ বেড়ে যাওয়ায় শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের মতো স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে।
কীভাবে কাজ করবে ‘জিরো সিগন্যাল’ ব্যবস্থা
এই ব্যবস্থায় কোনো ধরনের ট্রাফিক সিগন্যাল থাকবে না। পুরো ১০৫ কিলোমিটার সড়কে তৈরি হবে নির্বিঘ্ন সংযোগ (কানেকটিভিটি)। মোট ৮০টি ইন্টারসেকশন থাকলেও সেখানে যানবাহন থামাতে হবে না।
এ প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ৪৩টি অবকাঠামো প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে বর্তমানে রয়েছে ৬টি এবং নতুন করে নির্মাণ করতে হবে অন্তত ৩৭টি। তবে ন্যূনতম ৩০টি অবকাঠামো নির্মাণ করলেই প্রকল্প চালু করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
যেসব অবকাঠামো তৈরি হবে
প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে:
- নতুন ১৬টি ওভারপাস/আন্ডারপাস।
- ১৩টি ইউ-লুপ সুবিধা।
- ৭টি ইন্টারচেঞ্জ সার্কেল।
- ১টি ইন্টারচেঞ্জ উইথ ইউ-লুপ।
- ৩০টি নতুন ফুটওভারব্রিজ।
এসব অবকাঠামো নির্মাণে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৬৭২ কোটি ১৬ লাখ টাকা।
গুরুত্বপূর্ণ লোকেশন
ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও এলাকাকে এই প্রকল্পের আওতায় আনা হবে। এর মধ্যে রয়েছে—শাহবাগ, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, মহাখালী, বনানী, মিরপুর-১০, সায়েন্সল্যাব, নীলক্ষেত, কাকরাইল, রামপুরা, নতুনবাজারসহ আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থান।
ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন
প্রকল্পটি তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে:
স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা:অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোতে অটোমেটেড ট্রাফিক সিগন্যাল চালু করা হবে।
মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা:১০৫ কিলোমিটার সড়কে জিরো সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু করা হবে এবং নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। ধীরগতির যানবাহনের জন্য থাকবে আলাদা লেন।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা:ঢাকা শহর থেকে বাস কাউন্টার অপসারণ, আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল শহরের বাইরে সরানো, দিনের বেলায় ট্রাক চলাচল বন্ধ এবং ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
কেন ব্যর্থ হয়েছিল আগের উদ্যোগ
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ১৯৯৯ সাল থেকে একাধিকবার আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল চালু করা হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বিশ্বব্যাংক ও জাইকার সহায়তায় স্থাপিত সিগন্যালগুলোও নিয়ম না মানা, দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণ এবং অতিরিক্ত ম্যানুয়াল হস্তক্ষেপের কারণে অকার্যকর হয়ে পড়ে।
এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে এআইভিত্তিক ট্রাফিক সিস্টেম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা এখনো পুরোপুরি সফল হয়নি।
কী বলছেন সংশ্লিষ্টরা
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিফ ইনোভেশন অফিসার (যুগ্মসচিব) মো. আবদুল্লাহ হাককানী জানিয়েছেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ঢাকার যানজট অনেকটাই কমে যাবে।
তার ভাষায়, “আগে যেখানে এক ঘণ্টা সময় লাগতো, সেখানে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ১৫ থেকে ২০ মিনিটেই গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে।”
উপসংহার
সব মিলিয়ে, ‘জিরো সিগন্যাল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট’ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকার যানজট সমস্যার একটি কার্যকর সমাধান আসতে পারে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে সঠিক পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং নাগরিকদের সচেতনতার ওপর।
যদি সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয়, তাহলে ঢাকার সড়ক ব্যবস্থায় এটি হতে পারে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
আরও পড়ুন-ট্যাক্স টোকেন নবায়ন না করলে কত টাকা জরিমানা হয়?
👉🙏লেখার মধ্যে ভাষা জনিত কোন ভুল ত্রুটি হয়ে থাকলে অবশ্যই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
✅আজ এ পর্যন্তই ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন 🤔










