বাংলাদেশে জন্ম নিবন্ধন এখন শুধু জন্মের তথ্য সংরক্ষণের নথি নয়, বরং নাগরিক পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। স্কুলে ভর্তি, পাসপোর্ট তৈরি, জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ, ব্যাংক হিসাব খোলা, সরকারি চাকরির আবেদন থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রেও জন্ম নিবন্ধনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ নথিকে ঘিরেই বাড়ছে জালিয়াতি ও প্রতারণার ঘটনা। বিভিন্ন সময়ে ভুয়া জন্ম নিবন্ধন তৈরি করে প্রতারণা, বয়স পরিবর্তন কিংবা একাধিক পরিচয় ব্যবহারের অভিযোগও সামনে এসেছে।
আরও পড়ুন-অনলাইন জন্ম নিবন্ধন করার নিয়ম
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেকেই না বুঝে জাল জন্ম নিবন্ধন ব্যবহার করছেন, আবার কেউ কেউ অবৈধ সুবিধা নেওয়ার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে ভুয়া নথি তৈরি করছেন। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য আসল ও ভুয়া জন্ম নিবন্ধন শনাক্ত করার উপায় জানা এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভুয়া জন্ম নিবন্ধন সাধারণত বয়স কমানো বা বাড়ানোর জন্য বেশি ব্যবহার করা হয়। কেউ চাকরির বয়সসীমা পার হয়ে গেলে বয়স কমিয়ে নতুন নিবন্ধন তৈরি করেন, আবার বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময় বয়স পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়। এছাড়া ভুয়া পরিচয়ে সরকারি সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ কিংবা একাধিক পরিচয় তৈরির ক্ষেত্রেও জাল জন্ম নিবন্ধন ব্যবহারের ঘটনা পাওয়া যায়।
ডিজিটাল সেবার বিস্তার বাড়লেও এখনও অনেক মানুষ জানেন না কীভাবে সহজে অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন যাচাই করতে হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ভুয়া জন্ম নিবন্ধন শনাক্ত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সরকারি ওয়েবসাইটে তথ্য যাচাই করা।
সরকারের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন তথ্য যাচাই সেবার মাধ্যমে কয়েক মিনিটের মধ্যেই জন্ম নিবন্ধনের তথ্য মিলিয়ে দেখা সম্ভব। এজন্য নির্ধারিত ওয়েবসাইটে গিয়ে জন্ম নিবন্ধন নম্বর ও জন্মতারিখ দিতে হয়। তথ্য সঠিক হলে নিবন্ধনের পূর্ণ তথ্য দেখা যায়। আর যদি “Record Not Found” বা তথ্য না মেলে, তাহলে সেটি সন্দেহজনক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আসল ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধনে সাধারণত ১৭ সংখ্যার একটি BRN নম্বর থাকে। এই নম্বর অসম্পূর্ণ, ছোট বা বড় হলে সেটি জাল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই প্রথমেই নিবন্ধন নম্বরটি সঠিক কি না, তা খেয়াল করা জরুরি।
এছাড়া নাম, পিতা-মাতার নাম, জন্মতারিখ এবং অন্যান্য তথ্য সরকারি নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা উচিত। অনেক সময় জাল জন্ম নিবন্ধনে বানান ভুল থাকে বা জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের সঙ্গে অমিল দেখা যায়। এসব ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে নতুন ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধনে QR কোড যুক্ত করা হচ্ছে। মোবাইল দিয়ে সেই কোড স্ক্যান করলে সরাসরি অফিসিয়াল তথ্য দেখানোর কথা। যদি স্ক্যান করার পর ভিন্ন তথ্য আসে অথবা কোনো লিংকই না খোলে, তাহলে সেটি জাল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।
শুধু অনলাইন নয়, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন অফিস থেকেও জন্ম নিবন্ধনের তথ্য যাচাই করা যায়। কারণ আসল নিবন্ধনের তথ্য সরকারি ডাটাবেজে সংরক্ষিত থাকে। কোনো রেকর্ড না পাওয়া গেলে সেটি ভুয়া হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ভুয়া জন্ম নিবন্ধন ব্যবহার করা গুরুতর অপরাধ। এর কারণে সরকারি চাকরি বাতিল, পাসপোর্ট জটিলতা, ব্যাংকিং সমস্যাসহ নানা ধরনের আইনি ঝুঁকিতে পড়তে হতে পারে। এমনকি ভবিষ্যতে শিক্ষা, সম্পত্তি বা উত্তরাধিকার সংক্রান্ত কাজেও জটিলতা তৈরি হতে পারে।
তারা আরও বলছেন, বর্তমানে বিভিন্ন সাইবার প্রতারক চক্রও ভুয়া জন্ম নিবন্ধন তৈরি করে মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তাই যেকোনো দালাল বা অবৈধ মাধ্যমে জন্ম নিবন্ধন তৈরি না করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
যদি কেউ ভুয়া জন্ম নিবন্ধনের তথ্য পান, তাহলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভায় অভিযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে ভুল তথ্য বাতিল করে নতুন করে সঠিক তথ্য দিয়ে নিবন্ধন করতে হবে। গুরুতর জালিয়াতির ক্ষেত্রে আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া যেতে পারে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এখন সরকারি নথি যাচাই অনেক সহজ হয়েছে বলে মনে করছেন প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা। তবে সচেতনতার অভাবে এখনও অনেকে যাচাই না করেই বিভিন্ন নথি ব্যবহার করছেন। তাই গুরুত্বপূর্ণ যেকোনো কাজে ব্যবহার করার আগে জন্ম নিবন্ধন অবশ্যই অনলাইনে যাচাই করে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
সূত্র: জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন তথ্য ব্যবস্থা (BDRIS), স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের তথ্য।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
আরও পড়ুন-৫ মিনিটে জন্ম নিবন্ধন অনলাইন কপি ডাউনলোড করার নিয়ম(আপডেট)










