দেশের প্রযুক্তিখাতে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে কুমিল্লার একটি গ্রামীণ জনপদ। যেখানে একসময় নারীরা ঘরের কাজেই সীমাবদ্ধ ছিলেন, আজ সেখানে তাদের হাতেই তৈরি হচ্ছে আধুনিক মোবাইল ফোন। প্রযুক্তি খাতে নারীদের এই সম্পৃক্ততা শুধু কর্মসংস্থানই তৈরি করেনি, বরং বদলে দিয়েছে পুরো এলাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা।
কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার পিয়ারাতলী এলাকায় গড়ে ওঠা ‘হালিমা টেলিকম’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান এই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি গ্রামীণ নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে মোবাইল ফোন এবং বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস তৈরিতে দক্ষ করে তুলছে। বর্তমানে এখানে দুই শতাধিক নারী কর্মী নিয়মিত কাজ করছেন এবং প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে কয়েকশ মোবাইল সেট।
আরও পড়ুন-মোবাইল ফোনের স্ক্রিন বন্ধ রেখেও ইউটিউবের গান শুনবেন যেভাবে?
সরেজমিনে দেখা গেছে, কারখানার ভেতরে নারী কর্মীদের ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো। দলবদ্ধভাবে তারা বিভিন্ন ধাপে কাজ করছেন—কেউ মাদারবোর্ড পরীক্ষা করছেন, কেউ আইএমইআই সেট করছেন, আবার কেউ মোবাইলের এলসিডি, কী-প্যাড, স্পিকার বা হাউজিং সংযুক্ত করছেন। প্রতিটি মোবাইল সেটে প্রায় ৩০টির বেশি যন্ত্রাংশ থাকে, যা দক্ষতার সঙ্গে একত্রিত করে পূর্ণাঙ্গ ডিভাইসে রূপ দিচ্ছেন তারা।
এই কারখানায় ব্যবহৃত যন্ত্রাংশগুলো মূলত বিদেশ, বিশেষ করে চীন থেকে আমদানি করা হয়। এরপর স্থানীয়ভাবে সেগুলো সংযোজন করে তৈরি করা হচ্ছে মোবাইল ফোন। এর ফলে একদিকে যেমন দেশীয় উৎপাদন বাড়ছে, অন্যদিকে প্রযুক্তি খাতে দক্ষ মানবসম্পদও তৈরি হচ্ছে।
এখানে কর্মরত নারীদের আয়ও বেশ সন্তোষজনক। কাজের ধরন ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তারা মাসে ১০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৪০-৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন। অনেকেই এই প্রশিক্ষণ কাজে লাগিয়ে বাড়িতে বসেই ছোট পরিসরে ইলেকট্রনিক পণ্য তৈরি ও বিক্রি শুরু করেছেন, যা তাদের আর্থিক স্বাবলম্বিতা বাড়িয়েছে।
কারখানার কর্মী সুমাইয়া আক্তার জানান, মাত্র তিন মাসের মধ্যেই তিনি মোবাইল তৈরির কাজ শিখেছেন। এখন তিনি নিজেই পরিবারের খরচ চালাতে সাহায্য করছেন। একইভাবে সাবরিনা নামের আরেক কর্মী বলেন, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারা এখন দক্ষ হয়ে উঠেছেন এবং চাকরির পাশাপাশি বাড়িতেও কাজ করছেন।
বিথী আক্তার জানান, আগে তিনি পুরোপুরি গৃহিণী ছিলেন। এখন তিনি নিজ বাড়িতে থেকেই কাজ করছেন এবং সন্তানদের দেখাশোনার পাশাপাশি আয় করছেন। তার মতে, এই উদ্যোগ তাদের জীবনে বড় পরিবর্তন এনেছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রোডাকশন ম্যানেজার মিজানুর রহমান বলেন, গ্রামীণ নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে তোলাই তাদের মূল লক্ষ্য। তারা বিদেশ থেকে যন্ত্রাংশ এনে স্থানীয়ভাবে সংযোজন করছেন, যা ভবিষ্যতে আরও বড় শিল্পে পরিণত হতে পারে।
এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছেন উদ্যোক্তা আবুল কালাম হাসান টগর, যিনি হালিমা হাইটেক পার্কের চেয়ারম্যান। তিনি জানান, দীর্ঘ সংগ্রাম ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। বর্তমানে তাদের অধীনে একাধিক কোম্পানি রয়েছে, যেখানে মোবাইল ফোন ছাড়াও ব্যাটারি, চার্জার, হেডফোন, পাওয়ার ব্যাংকসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদন করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, তার মূল লক্ষ্য ছিল এলাকার মানুষ, বিশেষ করে নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১,৪০০ জন কর্মী কাজ করছেন, যাদের একটি বড় অংশ নারী।
স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত এই মোবাইল ফোনগুলো ইতোমধ্যেই বাজারে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেছে। ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিতে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি নারীর ক্ষমতায়নেও বড় ভূমিকা রাখছে। প্রযুক্তি খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ আরও এগিয়ে যাবে বলেও তারা মনে করছেন।
সব মিলিয়ে, কুমিল্লার এই উদ্যোগ শুধু একটি কারখানার গল্প নয়—এটি পরিবর্তনের গল্প। যেখানে গ্রামের নারীরা শুধু শ্রমিক নন, তারা এখন প্রযুক্তির অংশ, অর্থনীতির চালিকাশক্তি এবং নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথপ্রদর্শক।
আরও পড়ুন-মসজিদে ঢুকলেই ফোন অটোমেটিক Silent Mode হবে অটোমেটিক!
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
👉🙏লেখার মধ্যে ভাষা জনিত কোন ভুল ত্রুটি হয়ে থাকলে অবশ্যই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
✅আজ এ পর্যন্তই ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন 🤔










