বাংলাদেশের বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে নতুন আলোচনার নাম হতে যাচ্ছে বিওয়াইডি সিল ৬। এর আগে প্রিমিয়াম সেগমেন্টের বিওয়াইডি সিল মডেল দিয়ে দেশে যাত্রা শুরু করেছিল চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান BYD। তবে সেই গাড়ির দাম কোটি টাকার কাছাকাছি হওয়ায় সাধারণ ক্রেতাদের বড় একটি অংশের নাগালের বাইরে ছিল। এবার তুলনামূলক কম দামে নতুন BYD Seal 6 আনছে বিওয়াইডি বাংলাদেশ, যা বাজারে আসার আগেই গাড়িপ্রেমীদের মধ্যে তৈরি করেছে ব্যাপক আগ্রহ।
আরও পড়ুন-জ্বালানি সংকটে ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল জনপ্রিয় হচ্ছে বাংলাদেশে
নতুন এই বৈদ্যুতিক গাড়িটি একবার চার্জে সর্বোচ্চ ৪১০ কিলোমিটার পর্যন্ত চলতে পারে। শুধু তাই নয়, ফাস্ট চার্জিং সুবিধায় মাত্র ৩০ মিনিটেই ব্যাটারি পুরো চার্জ করা সম্ভব। সম্প্রতি রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বিওয়াইডির প্রদর্শনী কেন্দ্রে গাড়িটি হাতে–কলমে চালিয়ে দেখার সুযোগ হয়। এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে পূর্বাচল পর্যন্ত চালানোর অভিজ্ঞতায় গাড়িটি প্রযুক্তি, আরাম এবং পারফরম্যান্স—সব দিক থেকেই নজর কাড়ে।
প্রথম দেখাতেই BYD Seal 6 এর ডিজাইন আলাদা নজর কাড়ে। সাদা রঙের গাড়িটির সামনের অংশে আধুনিক ও স্পোর্টি লুক দেওয়া হয়েছে। এলইডি হেডলাইট, বড় এয়ার ইনটেক ডিজাইন এবং স্টাইলিশ বাম্পারের কারণে দূর থেকেই প্রিমিয়াম ফিল পাওয়া যায়। এটি সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক গাড়ি হওয়ায় বনেটের নিচেও অতিরিক্ত স্টোরেজ স্পেস রাখা হয়েছে। সামনে ৬৫ লিটার এবং পেছনে ৪৬০ লিটারের বড় বুট স্পেস মিলিয়ে গাড়িটি পরিবার ও ভ্রমণের জন্য বেশ ব্যবহারবান্ধব।
চালকের আসনে বসার পর সবচেয়ে বেশি যেটি নজর কাড়ে, সেটি হলো গাড়িটির নিঃশব্দ চলাচল। বৈদ্যুতিক মোটরের কারণে ইঞ্জিনের শব্দ নেই বললেই চলে। এর সঙ্গে রয়েছে উন্নত নয়েজ ক্যানসেলেশন প্রযুক্তি, যা ভেতরের পরিবেশকে আরও শান্ত ও আরামদায়ক করেছে।
গাড়ির ভেতরে রয়েছে আধুনিক ডিজিটাল ককপিট। চালকের সামনে ৮.৮ ইঞ্চির ডিজিটাল ডিসপ্লে এবং মাঝখানে ১২.৮ ইঞ্চির বড় মাল্টিমিডিয়া স্ক্রিন দেওয়া হয়েছে। এখানে গাড়ির গতি, ব্যাটারির চার্জ, সম্ভাব্য রেঞ্জ এবং বিভিন্ন ড্রাইভিং তথ্য দেখা যায়। অ্যাপল কারপ্লে ও অ্যান্ড্রয়েড অটো সাপোর্ট থাকায় সহজেই স্মার্টফোন সংযুক্ত করা যায়।
স্টিয়ারিংয়ে রয়েছে মাল্টিমিডিয়া কন্ট্রোল, ক্রুজ কন্ট্রোল এবং বিভিন্ন স্মার্ট ফিচার। গাড়িতে একাধিক ইউএসবি ও টাইপ-সি ফাস্ট চার্জিং পোর্টও রয়েছে। ফলে যাত্রীরা সহজেই মোবাইল বা অন্যান্য ডিভাইস চার্জ করতে পারবেন।
BYD Seal 6 এর আসনগুলো চামড়ায় মোড়ানো এবং বেশ আরামদায়ক। সামনের আসনগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। পেছনের যাত্রীদের জন্যও যথেষ্ট লেগরুম ও হেডরুম রয়েছে। এমনকি মাঝখানে ড্রাইভ ট্রেইন না থাকায় তিনজন যাত্রীও স্বাচ্ছন্দ্যে বসতে পারেন।
ড্রাইভিং অভিজ্ঞতায় গাড়িটির পারফরম্যান্স বেশ চমকপ্রদ। এক্সপ্রেসওয়ে ও পূর্বাচল সড়কে গাড়িটি চালানোর সময় দেখা গেছে, মাত্র ১২.৭ সেকেন্ডে শূন্য থেকে ১০০ কিলোমিটার গতিতে পৌঁছাতে পারে এটি। গাড়িটিতে ইকো, নরমাল, স্পোর্টস ও স্নো—মোট চারটি ড্রাইভিং মোড রয়েছে। স্পোর্টস মোডে গাড়িটির দ্রুত গতি তোলার ক্ষমতা বেশ নজর কাড়ে।
গাড়িটির মোটর ৯৫ কিলোওয়াট শক্তি উৎপন্ন করে, যা প্রায় ১২৮ হর্সপাওয়ারের সমান। এছাড়া ২২০ নিউটন মিটার টর্ক তৈরি করতে পারে। বৈদ্যুতিক গাড়ি হওয়ায় তাৎক্ষণিক টর্ক পাওয়ার সুবিধা রয়েছে, ফলে দ্রুত গতিতে ছুটতে পারে গাড়িটি।
BYD Seal 6 এর আরেকটি বড় আকর্ষণ হলো এর ব্যাটারি প্রযুক্তি। এতে ব্যবহার করা হয়েছে বিওয়াইডির নিজস্ব ব্লেড ব্যাটারি, যার ক্ষমতা ৪৬.০৮ কিলোওয়াট আওয়ার। এই ব্যাটারি নিরাপত্তা ও দীর্ঘস্থায়িত্বের জন্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত।
চার্জিং সুবিধাতেও রয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি। সিসিএস ২ ফাস্ট চার্জিং সিস্টেমে মাত্র ৩০ মিনিটে ফুল চার্জ করা সম্ভব। আর সাধারণ ৭ কিলোওয়াট চার্জারে পুরো চার্জ হতে সময় লাগে প্রায় ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা।
এছাড়া গাড়িটিতে রিজেনারেটিভ ব্রেকিং প্রযুক্তি রয়েছে। অর্থাৎ ব্রেক করার সময় চাকার ঘূর্ণনশক্তি ব্যবহার করে ব্যাটারিকে কিছুটা চার্জ করতে পারে গাড়িটি। এতে ব্যাটারির দক্ষতা বাড়ে।
নিরাপত্তার দিক থেকেও বেশ শক্তিশালী BYD Seal 6। এতে চার চাকাতেই ডিস্ক ব্রেক, ছয়টি এয়ারব্যাগ, ম্যাকফারসন ফ্রন্ট সাসপেনশন এবং মাল্টি-লিংক রিয়ার সাসপেনশন রয়েছে। ফলে শহরের রাস্তা থেকে হাইওয়ে—সব জায়গাতেই আরামদায়ক ড্রাইভিং অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়।
বিশ্বজুড়ে বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে ইভি মার্কেট বড় হচ্ছে। বিশেষ করে জ্বালানির উচ্চমূল্য, কম রক্ষণাবেক্ষণ খরচ এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির কারণে এখন অনেকেই বৈদ্যুতিক গাড়ির দিকে ঝুঁকছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তুলনামূলক কম দামে যদি BYD Seal 6 বাজারে আসে, তাহলে দেশের ইভি বাজারে বড় ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে। কারণ এই গাড়িতে একই সঙ্গে প্রিমিয়াম ডিজাইন, দীর্ঘ রেঞ্জ, দ্রুত চার্জিং এবং আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে BYD Seal 6 বাংলাদেশের বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে নতুন আলোচনার জন্ম দিতে যাচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, বাজারে আসার পর গাড়িটির মূল্য ও গ্রাহক চাহিদা কতটা প্রভাব ফেলে দেশের ইভি সেগমেন্টে।
সূত্র: প্রথম আলো
আরও পড়ুন-এক চার্জে ৩৮০ কিমি! স্যামসাং ইলেকট্রিক সাইকেল










