আগামী ২০২৭ সালের ৭ জানুয়ারি থেকে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে। শিক্ষা ক্যালেন্ডার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি বছরের বাকি সময়ে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা সরাসরি ক্লাস করার সুযোগ পাবে মাত্র ১১৫ দিন। এত কম সময়ে পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস শেষ করে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষক ও শিক্ষাবিদরা।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঘোষণার পর থেকেই বিভিন্ন মহলে এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেক অভিভাবকের আশঙ্কা, সংক্ষিপ্ত সময়ে সিলেবাস শেষ করতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত মানসিক চাপ তৈরি হবে। একই সঙ্গে কোচিং ও প্রাইভেট নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে বলেও মনে করছেন তারা।
আরও পড়ুন- নারীদের স্বাবলম্বী করার ওপর জোর দিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
শিক্ষা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, ১৪ মে থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট সময় রয়েছে ২৩০ দিন। এর মধ্যে শুক্রবার ও শনিবার মিলিয়ে সাপ্তাহিক ছুটি রয়েছে ৭০ দিন। এছাড়া ঈদুল আজহা, গ্রীষ্মকালীন ছুটি, দুর্গাপূজা, জন্মাষ্টমী, আশুরা, শ্যামাপূজাসহ বিভিন্ন সরকারি ও ধর্মীয় ছুটি মিলিয়ে আরও ২৮ দিন বন্ধ থাকবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
তবে এসব ছুটির কিছু অংশ আবার সাপ্তাহিক ছুটির মধ্যে পড়ে যাওয়ায় মোট কার্যকর ছুটির সংখ্যা দাঁড়ায় ৯১ দিন। অর্থাৎ ২৩০ দিন থেকে ৯১ দিন বাদ দিলে অবশিষ্ট থাকে ১৩৯ দিন। এরপর অর্ধবার্ষিক, বার্ষিক, প্রি-টেস্ট ও টেস্ট পরীক্ষার কারণে আরও ২৪ দিন ক্লাস বন্ধ থাকবে। ফলে শিক্ষার্থীদের হাতে সরাসরি শ্রেণি পাঠদানের সময় থাকছে মাত্র ১১৫ দিন।
শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা আগের বছরগুলোতেও নিয়মিত পাঠদান থেকে বঞ্চিত হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, নির্বাচন, বই বিতরণে দেরি এবং বিভিন্ন ছুটির কারণে পাঠ্যসূচি অনুযায়ী ক্লাস সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। ফলে অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যেই ইতোমধ্যে শিখন ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী প্রধান ও শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী মনে করেন, সিদ্ধান্তটি বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তার মতে, শহরের বাইরে চর বা হাওর অঞ্চলের স্কুলগুলোতে এই স্বল্প সময়ে সিলেবাস শেষ করা আরও কঠিন হবে।
তিনি বলেন, ক্লাসের সময় কমে যাওয়ায় অভিভাবকরা বাধ্য হয়ে কোচিং ও প্রাইভেট টিউশনের দিকে ঝুঁকবেন। এতে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ আরও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়-এর এমিরেটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ মনে করেন, এ বছর কিছুটা নমনীয় হওয়া যেত। তার মতে, পরীক্ষা ফেব্রুয়ারি বা মার্চে নিলে শিক্ষার্থীরা প্রস্তুতির জন্য আরও সময় পেত।
তিনি আরও বলেন, পাবলিক পরীক্ষার কাঠামোতেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। ও-লেভেলের মতো সীমিত কয়েকটি বিষয়ে কেন্দ্রীয় পরীক্ষা নেওয়া হলে শিক্ষার্থীদের চাপ অনেক কমবে।
তবে শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক সরকারের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তার মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও অতিরিক্ত উদ্যোগ নিলে এই সময়ের মধ্যেও সিলেবাস শেষ করা সম্ভব।
তিনি প্রতিদিন অতিরিক্ত ক্লাস নেওয়া, সাপ্তাহিক ছুটি কমানো এবং পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য রেমিডিয়াল ক্লাস চালুর পরামর্শ দিয়েছেন।
শিক্ষাবিদদের মতে, এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কমিয়ে কার্যকরভাবে পাঠদান চালিয়ে যাওয়া। একই সঙ্গে স্কুলভিত্তিক মনিটরিং ও শিখন ঘাটতি পূরণে দ্রুত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে শিক্ষার মান আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সূত্র: শিক্ষা ক্যালেন্ডার, শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা গবেষকদের মতামত
আরও পড়ুন- ২০২৭ থেকে বদলে যাচ্ছে পাঠ্যবই, যুক্ত হচ্ছে ২০২৪-এর ইতিহাস










