রাজধানীর বিভিন্ন স্কুলের সামনে এখন প্রায়ই দেখা যাচ্ছে উদ্বেগজনক এক চিত্র। ইউনিফর্ম পরা স্কুল শিক্ষার্থীরা প্রকাশ্যেই সিগারেট হাতে আড্ডা দিচ্ছে, ধূমপান করছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই এটিকে ‘আধুনিকতা’ বা ‘স্টাইল’ হিসেবে দেখছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রবণতা শুধু শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্যই বড় ধরনের সতর্ক সংকেত।
বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের একটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে এমনই দৃশ্য দেখা যায়। দশম শ্রেণির কয়েকজন ছাত্রছাত্রীকে স্কুল ইউনিফর্ম পরেই সিগারেট খেতে দেখা যায়। কথা বলতে গেলে এক শিক্ষার্থী জানায়, “ধূমপান এখন আধুনিকতার অংশ।” আরেকজনের ভাষ্য, “স্মোকিং না করলে আধুনিক বা আকর্ষণীয় মনে করা হয় না।”
আরও পড়ুন- ঢাবির ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী সাইবার হয়রানির শিকার, গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য
শুধু মোহাম্মদপুর নয়, ধানমন্ডির একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের সামনেও একাধিক শিক্ষার্থীকে ধূমপান করতে দেখা গেছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে অবাধে চলছে সিগারেট বিক্রি।
আইন অনুযায়ী, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, খেলার মাঠ ও শিশু পার্কের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাকজাত পণ্য বিক্রি, ব্যবহার ও প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবুও বাস্তবে এর কোনো কার্যকর প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না। ফুটপাতজুড়ে গড়ে উঠেছে চা-সিগারেটের দোকান, যেখানে শিক্ষার্থীদের কাছেও অনায়াসে সিগারেট বিক্রি করা হচ্ছে।
গত জানুয়ারিতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে তামাকমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে কঠোর নির্দেশনা জারি করলেও বাস্তব পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্ধুদের মাধ্যমে অনেক শিক্ষার্থীর প্রথম সিগারেট হাতে নেওয়া হয়। কৌতূহল, সামাজিক চাপ, বন্ধুমহলের প্রভাব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধূমপানকে ‘কুল’ হিসেবে দেখানোর প্রবণতা শিশু-কিশোরদের আকৃষ্ট করছে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুরুতে কৌতূহল থেকে ধূমপান শুরু হলেও পরে তা নেশায় রূপ নেয়। এতে পড়াশোনায় অমনোযোগিতা, মানসিক অস্থিরতা, শারীরিক ক্ষতি এবং ভবিষ্যতে মাদকাসক্তির ঝুঁকি তৈরি হয়।
ঢাকার বিভিন্ন এলাকার অভিভাবকরাও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, স্কুলের সামনেই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সিগারেট বিক্রি হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন এসব দৃশ্য দেখছে। এতে শিশুদের মনোজগতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু আইন করলেই হবে না, তার কার্যকর বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবারকেও আরও সচেতন হতে হবে। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, অনলাইনে কী দেখছে—এসব বিষয়ে নজর রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক অধ্যাপক বলেন, শিশুদের নৈতিক মূল্যবোধ গড়ে তোলা এবং ধূমপানের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন করা এখন সময়ের দাবি। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজ একসঙ্গে কাজ না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
এদিকে ঢাকা আহছানিয়া মিশনের তথ্যমতে, দেশে ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সি জনগোষ্ঠীর মধ্যে তামাক ব্যবহারের হার ৩৫.৩ শতাংশ। আবার গ্লোবাল স্কুল-বেজড হেলথ সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সি শিক্ষার্থীদের মধ্যেও তামাক ব্যবহারের হার উদ্বেগজনক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশু-কিশোরদের ধূমপান ও মাদক থেকে দূরে রাখতে পরিবার, স্কুল, প্রশাসন এবং সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ এখন অত্যন্ত জরুরি।
সূত্র: মাউশি নির্দেশনা ও স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণা
আরও পড়ুন- সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ইলেকট্রিক বাস শুল্কমুক্তের ঘোষণা









