ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন সতর্কবার্তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি কিছু অননুমোদিত তৃতীয় পক্ষের প্রতিষ্ঠান সাধারণ প্লাস্টিক কার্ডকে ‘মেটাল কার্ডে’ রূপান্তরের নামে গ্রাহকদের কাছ থেকে সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ধরনের কার্যক্রমে আর্থিক প্রতারণা ও তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি থাকায় গ্রাহকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
আরও পড়ুন-সিটি ব্যাংক ক্রেডিট কার্ডের সুবিধা কী কী?
বৃহস্পতিবার রাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক সতর্কবার্তায় বলা হয়, কিছু প্রতিষ্ঠান আকর্ষণীয় ডিজাইন ও প্রিমিয়াম সুবিধার কথা বলে সাধারণ ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডকে মেটাল কার্ডে রূপান্তরের অফার দিচ্ছে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় গ্রাহকদের কার্ড নম্বর, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ, সিভিভি (CVV) নম্বরসহ গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক তথ্য শেয়ার করতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, এসব প্রতিষ্ঠান কোনো ব্যাংক বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদিত নয়। ফলে এসব সেবা গ্রহণ করলে কার্ড সংক্রান্ত তথ্য জালিয়াত চক্রের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর মাধ্যমে অননুমোদিত লেনদেন, অর্থ চুরি, অনলাইন প্রতারণা এবং ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের মতো বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ডিজিটাল ব্যাংকিং ও অনলাইন লেনদেন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাইবার জালিয়াতির ঘটনাও বাড়ছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে অনেক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে গ্রাহকদের ব্যক্তিগত আর্থিক তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে। মেটাল কার্ড রূপান্তরের বিষয়টিও তেমন একটি ঝুঁকিপূর্ণ প্রবণতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সতর্কবার্তায় সম্ভাব্য কয়েকটি ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে রয়েছে কার্ডের গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে জালিয়াতির আশঙ্কা, অননুমোদিত লেনদেন সংঘটিত হওয়া, গ্রাহকের আর্থিক ক্ষতি এবং তথ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া। পাশাপাশি সামগ্রিক কার্ড ব্যবস্থাপনাতেও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক গ্রাহক ‘প্রিমিয়াম’ বা ‘লাক্সারি’ কার্ড ব্যবহারের আগ্রহ থেকে এমন অফারে আকৃষ্ট হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দেখে অনেকেই বুঝতে পারেন না যে এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো বৈধ অনুমোদন নেই। ফলে নিজের অজান্তেই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংকিং তথ্য অন্যের হাতে তুলে দিচ্ছেন।
সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, একটি কার্ডের নম্বর, সিভিভি এবং মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ কোনো অপরাধী চক্রের হাতে গেলে সেটি ব্যবহার করে অনলাইন লেনদেন করা সম্ভব। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অনেক ক্ষেত্রে ওটিপি ছাড়াও লেনদেন সম্পন্ন করা যায়। তাই কার্ড সংক্রান্ত তথ্য ফাঁস হলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রাহকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, কার্ডকে মেটাল কার্ডে রূপান্তরের প্রলোভন থেকে বিরত থাকতে হবে। একই সঙ্গে কার্ড সংক্রান্ত যেকোনো সেবা শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের অনুমোদিত চ্যানেলের মাধ্যমে গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যক্তিগত কার্ড তথ্য প্রদান না করারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া গ্রাহকদের ব্যাংক হিসাবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনাও দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিশেষ করে ওটিপি বা ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড কখনোই অন্য কারও সঙ্গে শেয়ার না করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। কারণ প্রতারক চক্র অনেক সময় ব্যাংকের প্রতিনিধি পরিচয়ে ফোন করে বা মেসেজ পাঠিয়ে ওটিপি সংগ্রহের চেষ্টা করে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, গ্রাহকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ব্যাংকগুলোর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তাই কোনো সন্দেহজনক কল, মেসেজ বা অফার দেখলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত আর্থিক অফার যাচাই ছাড়া গ্রহণ না করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং ই-কমার্স ব্যবহারের পরিমাণ বাড়ছে। এর ফলে ডিজিটাল আর্থিক সেবার পাশাপাশি সাইবার অপরাধের ঝুঁকিও বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ব্যাংক বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার পদক্ষেপই যথেষ্ট নয়, গ্রাহকদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়াতে হবে।
তারা বলছেন, আর্থিক তথ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে সাধারণ কিছু নিয়ম মেনে চললে বড় ধরনের প্রতারণা এড়ানো সম্ভব। যেমন—অপরিচিত লিংকে ক্লিক না করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাংকিং তথ্য না দেওয়া, নিয়মিত কার্ড স্টেটমেন্ট পর্যবেক্ষণ করা এবং সন্দেহজনক লেনদেন দেখা গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এই সতর্কবার্তা ডিজিটাল আর্থিক নিরাপত্তা বিষয়ে নতুন করে সচেতনতা তৈরি করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এবং অনলাইন ব্যাংকিং ব্যবহারকারীদের আরও সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংকের ফেসবুক পোস্ট ও সংশ্লিষ্ট সূত্র।
আরও পড়ুন-প্রাইম ব্যাংকের জিরো ক্রেডিট কার্ড -কোন ফি নেই, সব প্রিমিয়াম সুবিধা










