বাংলাদেশে জমির দলিল মানেই ছিল দীর্ঘ লাইন, দালাল, হয়রানি আর অনিশ্চয়তা। অনেক সময় নিজের জমির দলিল খুঁজে পেতেই দিনের পর দিন কেটে যেত। বিশেষ করে প্রবাসীদের জন্য এটি ছিল আরও বেশি কষ্টকর। তবে এবার সেই পুরনো অধ্যায়ের অবসান ঘটাতে যাচ্ছে সরকার। ভূমি মালিকদের জন্য আসছে এক যুগান্তকারী ডিজিটাল সেবা, যার মাধ্যমে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে অনলাইনে নিজের দলিল খুঁজে পাওয়া, যাচাই করা এবং ডাউনলোড করা যাবে।
সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ভূমি সংক্রান্ত দুর্নীতি, জালিয়াতি ও হয়রানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশের ভূমি প্রশাসন হবে আরও স্বচ্ছ, দ্রুত ও প্রযুক্তিনির্ভর।
আরও পড়ুন-অনলাইনে জমির পর্চা সংগ্রহের নিয়ম ২০২৬ (আপডেট)
১১৭ বছরের দলিল এবার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯০৮ সাল থেকে শুরু করে ২০২৫ সাল পর্যন্ত রেজিস্ট্রার অফিসে সংরক্ষিত সব দলিল ধাপে ধাপে স্ক্যান করে একটি কেন্দ্রীয় অনলাইন সিস্টেমে সংরক্ষণ করা হবে। অর্থাৎ প্রায় ১১৭ বছরের দলিল একটি ডিজিটাল ডাটাবেজে যুক্ত হবে।
ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলায় এই প্রকল্প পাইলট আকারে শুরু হয়েছে। ভবিষ্যতে পর্যায়ক্রমে দেশের সব জেলার দলিল এই সিস্টেমে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
তবে ১৯৪৭ ও ১৯৭১ সালের যুদ্ধকালীন সময়ে যেসব দলিল হারিয়ে গেছে, সেগুলো অনলাইনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত করা সম্ভব হবে না। যাদের কাছে এসব দলিলের কপি রয়েছে, তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রেজিস্ট্রি অফিসে জমা দিয়ে অনলাইন অন্তর্ভুক্তির আবেদন করতে পারবেন।
প্রবাসী ও সাধারণ নাগরিকদের জন্য বিশাল স্বস্তি
এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হবেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। এতদিন প্রবাসে বসে দলিল সংগ্রহ বা যাচাই করা প্রায় অসম্ভব ছিল। এখন অনলাইনে বসেই—
-
নিজের জমির দলিল খোঁজা যাবে।
-
দলিলের সত্যতা যাচাই করা যাবে।
-
নির্ধারিত ফি দিয়ে কপি ডাউনলোড করা যাবে।
ভূমি আইনজীবীদের মতে, এটি শুধু একটি ডিজিটাল সেবা নয়, বরং এটি ভূমি ব্যবস্থায় একটি বিপ্লব।
দুর্নীতি ও প্রতারণা কমাতে কার্যকর ভূমিকা
বাংলাদেশে জমি সংক্রান্ত সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো জাল দলিল ও প্রতারণা। অনুপস্থিত মালিকদের জমি জাল দলিল তৈরি করে বিক্রি করে দেওয়ার ঘটনা নতুন নয়। এই ডিজিটাল দলিল সিস্টেম চালু হলে—
-
জাল দলিল শনাক্ত করা সহজ হবে।
-
একই জমির একাধিক মালিকানা দাবি বন্ধ হবে।
-
ঘুষ ও দালাল নির্ভরতা কমবে।
আগে রেজিস্ট্রি অফিসে একটি দলিল খুঁজতে ১০০০ থেকে ৫০০০ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হতো, অথচ সরকারি ফি ছিল মাত্র ২০ টাকা। ডিজিটাল সিস্টেম চালু হলে এই ধরনের হয়রানি আর থাকবে না।
অনলাইন দলিল সিস্টেম কীভাবে কাজ করবে
সরকার একটি নির্দিষ্ট ওয়েবসাইট চালু করবে যেখানে নাগরিকরা—
-
দলিল নম্বর দিয়ে সার্চ করতে পারবেন।
-
মালিকানা যাচাই করতে পারবেন।
-
অনলাইনে ফি পরিশোধ করতে পারবেন।
-
অফিসিয়াল কপি ডাউনলোড করতে পারবেন।
এই কপি সরকারিভাবে অনুমোদিত হওয়ায় এটি আইনি প্রমাণ হিসেবেও গ্রহণযোগ্য হবে।
ভূমি মালিকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ করণীয়
এই নতুন সিস্টেমে অংশগ্রহণ করতে ভূমি মালিকদের কিছু বিষয় অবশ্যই মনে রাখতে হবে—
-
সিস্টেম চালু না হওয়া পর্যন্ত ধৈর্য ধরুন।
-
যেসব দলিল অনলাইনে পাওয়া যাবে না, সেগুলোর কপি রেজিস্ট্রি অফিসে জমা দিন।
-
নিজের দলিলের স্ক্যান কপি নিরাপদ স্থানে সংরক্ষণ করুন।
-
জাল দলিল কখনোই অনলাইন সিস্টেমে গ্রহণযোগ্য হবে না।
-
কোনো তথ্য ভুল থাকলে দ্রুত সংশোধনের আবেদন করুন।
দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য সুফল
এই ডিজিটাল দলিল প্রকল্প শুধু নাগরিকদের নয়, পুরো দেশের জন্য সুফল বয়ে আনবে—
-
জমি সংক্রান্ত মামলা কমবে।
-
ভূমি বিরোধ হ্রাস পাবে।
-
প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বাড়বে।
-
নাগরিক সেবা দ্রুত হবে।
-
প্রবাসী বিনিয়োগ বাড়বে।
-
সরকারের রাজস্ব সংগ্রহ স্বচ্ছ হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, মানুষ নিজের সম্পত্তি নিয়ে নিরাপত্তা অনুভব করবে।
প্রশ্ন-উত্তর
প্রশ্ন ১: অনলাইনে ডাউনলোড করা দলিল কি আদালতে গ্রহণযোগ্য?
👉 হ্যাঁ, সরকারিভাবে অনুমোদিত কপি আইনি প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে।
প্রশ্ন ২: পুরনো দলিল না থাকলে কী হবে?
👉 কপি থাকলে রেজিস্ট্রি অফিসে জমা দিয়ে অনলাইন অন্তর্ভুক্তির আবেদন করতে হবে।
প্রশ্ন ৩: বিদেশ থেকে কি এই সেবা নেওয়া যাবে?
👉 হ্যাঁ, পৃথিবীর যেকোনো দেশ থেকেই সেবা নেওয়া যাবে।
প্রশ্ন ৪: জাল দলিল কীভাবে শনাক্ত হবে?
👉 অনলাইন যাচাই ব্যবস্থার মাধ্যমে জাল দলিল সহজেই শনাক্ত হবে।
প্রশ্ন ৫: ফি কত লাগবে?
👉 সরকার নির্ধারিত স্বল্প ফি পরিশোধ করলেই কপি ডাউনলোড করা যাবে।
প্রশ্ন ৬: কবে থেকে পুরো দেশে চালু হবে?
👉 ধাপে ধাপে সব জেলায় চালু করা হবে।
উপসংহার
বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থায় এই ডিজিটাল দলিল উদ্যোগ একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন। এটি শুধু প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়, বরং নাগরিক অধিকার রক্ষার একটি শক্তিশালী পদক্ষেপ। দীর্ঘদিন ধরে জমি নিয়ে যে ভোগান্তি, হয়রানি ও প্রতারণা চলছিল, তার অবসান ঘটাতে এই সিস্টেম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ভবিষ্যতে বাংলাদেশ আরও স্মার্ট ও ডিজিটাল রাষ্ট্রে পরিণত হবে—এই উদ্যোগ তারই একটি বাস্তব প্রমাণ। একজন ভূমি মালিক হিসেবে এই পরিবর্তনের সুফল ভোগ করতে হলে আমাদের সবাইকে সচেতন, সহযোগী এবং দায়িত্বশীল হতে হবে।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
আরও পড়ুন-জমির মামলা থেকে বাঁচতে আগে থেকেই যেসব কাজ করবেন
👉🙏লেখার মধ্যে ভাষা জনিত কোন ভুল ত্রুটি হয়ে থাকলে অবশ্যই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
✅আজ এ পর্যন্তই ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন 🤔


