দেশে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণ আনতে কিউআর কোডভিত্তিক ডিজিটাল ‘ফুয়েল পাস’ বা ফুয়েল কার্ড ব্যবস্থা চালু করেছে সরকার। ইতোমধ্যে এই সেবার জন্য অনলাইন নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং সাধারণ ব্যবহারকারীরা ঘরে বসেই সহজে আবেদন করতে পারছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, সরবরাহ সংকট এবং অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে জ্বালানি তেলের অপচয় ও অনিয়ম রোধ করতেই এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন-সব গাড়ির জন্য আসছে ‘ফুয়েল কার্ড’
জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ জ্বালানি আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব সরাসরি দেশের ওপর পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতার কারণে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সরকার একটি নিয়ন্ত্রিত ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকেছে, যার অংশ হিসেবেই চালু করা হয়েছে এই ফুয়েল পাস কার্ড ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট যানবাহনের জন্য নির্ধারিত পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে এবং অতিরিক্ত মজুদ বা অপচয় কমানো সম্ভব হবে।
বর্তমানে fuelpass.gov.bd ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অনলাইনে আবেদন নেওয়া হচ্ছে। ব্যবহারকারীরা নিজ নিজ যানবাহনের তথ্য, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য এবং মোবাইল নম্বর দিয়ে সহজেই নিবন্ধন করতে পারছেন। আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তথ্য যাচাই করে এবং অনুমোদিত হলে আবেদনকারীর জন্য একটি ডিজিটাল কিউআর কোড তৈরি করে দেওয়া হয়। এই কিউআর কোডই মূলত ফুয়েল পাস হিসেবে কাজ করবে এবং ভবিষ্যতে জ্বালানি সংগ্রহের জন্য এটি বাধ্যতামূলক হবে।
এই ব্যবস্থায় প্রতিটি যানবাহনের জন্য একটি ইউনিক ডিজিটাল পরিচয় তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে সংশ্লিষ্ট গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নম্বর, ইঞ্জিন ও চ্যাসিস নম্বরসহ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। ফলে কে কত জ্বালানি নিচ্ছে, কতবার নিচ্ছে—এসব তথ্য সহজেই নজরদারির আওতায় আনা যাবে। এতে করে জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম, অতিরিক্ত বিক্রি কিংবা কালোবাজারির প্রবণতা অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অনলাইনে ফুয়েল পাস কার্ড আবেদন
ফুয়েল পাস কার্ডের জন্য আবেদন করা খুবই সহজ। নিচে ধাপে ধাপে পুরো প্রক্রিয়াটি তুলে ধরা হলো—
ওয়েবসাইটে প্রবেশ-প্রথমে ব্রাউজারে গিয়ে fuelpass.gov.bd ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে হবে। সেখানে “FuelPass BD” পোর্টাল দেখা যাবে।
অ্যাকাউন্ট তৈরি-নতুন ব্যবহারকারীদের “রেজিস্টার” অপশনে ক্লিক করে মোবাইল নম্বর ও OTP দিয়ে অ্যাকাউন্ট তৈরি করতে হবে।
লগইন-রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হলে মোবাইল নম্বর ও পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করতে হবে।
যানবাহনের তথ্য প্রদান-এরপর গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নম্বর, চ্যাসিস নম্বর, ইঞ্জিন নম্বর ও উৎপাদনের বছর দিতে হবে।
ব্যক্তিগত তথ্য পূরণ-আবেদনকারীর নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর দিতে হবে।
আবেদন জমা-সব তথ্য যাচাই করে আবেদন সাবমিট করতে হবে।
কিউআর কোড পাওয়া-যাচাই শেষে আবেদন অনুমোদিত হলে একটি কিউআর কোড দেওয়া হবে, যা ফুয়েল পাস হিসেবে কাজ করবে।
ফুয়েল পাস কার্ড ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর ব্যবহার পদ্ধতি। নিবন্ধন সম্পন্ন হওয়ার পর ব্যবহারকারী নির্ধারিত পেট্রল পাম্পে গিয়ে তার কিউআর কোড প্রদর্শন করবেন। পাম্পে থাকা ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে কোডটি স্ক্যান করা হবে এবং সিস্টেমে নির্ধারিত পরিমাণ অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ করা হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয় হওয়ায় এতে কোনো ধরনের মানবিক হস্তক্ষেপ বা অনিয়মের সুযোগ কমে যাবে। একই সঙ্গে প্রতিটি লেনদেনের তথ্য অনলাইনে সংরক্ষিত থাকবে, যা প্রয়োজনে যাচাই করা যাবে।
প্রাথমিকভাবে এই ব্যবস্থা মোটরসাইকেল এবং ব্যক্তিগত যানবাহনের জন্য চালু করা হলেও ভবিষ্যতে এটি গণপরিবহনসহ সব ধরনের যানবাহনের ক্ষেত্রে সম্প্রসারণ করা হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। ইতোমধ্যে দেশের কয়েকটি এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে এই কার্যক্রম চালু হয়েছে এবং সেখানকার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ধাপে ধাপে পুরো দেশে এটি বাস্তবায়ন করা হবে।
তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো নিশ্চিত করা, প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট সংযোগ স্থিতিশীল রাখা এবং সাধারণ ব্যবহারকারীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। এছাড়া অনেক ব্যবহারকারী এখনও ডিজিটাল পদ্ধতির সঙ্গে পুরোপুরি অভ্যস্ত নন, যা এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা বাস্তবায়নে সময় নিতে পারে।
তারপরও বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই ফুয়েল পাস কার্ড ব্যবস্থা দেশের জ্বালানি খাতে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে। এটি শুধু জ্বালানি বিতরণকে স্বচ্ছ করবে না, বরং সরকারের জন্য একটি শক্তিশালী মনিটরিং সিস্টেম তৈরি করবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার যে লক্ষ্য সরকার নিয়েছে, তার সঙ্গেও এই উদ্যোগ সরাসরি সম্পর্কিত।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, যারা এখনো নিবন্ধন করেননি, তাদের দ্রুত অনলাইনে আবেদন করার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে। কারণ ভবিষ্যতে এই সিস্টেম পুরোপুরি কার্যকর হলে কিউআর কোড ছাড়া জ্বালানি সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে যেতে পারে। তাই সময় থাকতে নিবন্ধন সম্পন্ন করাই হবে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
সব মিলিয়ে, ডিজিটাল ফুয়েল পাস কার্ড চালুর মাধ্যমে সরকার জ্বালানি খাতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এটি শুধু একটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়, বরং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় একটি নীতিগত সংস্কার, যা ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরও পড়ুন-মোটরসাইকেলের নাম্বার প্লেট রেডি হয়েছে কিনা এসএমএসের মাধ্যমে চেক করার নিয়ম (আপডেট))
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
👉🙏লেখার মধ্যে ভাষা জনিত কোন ভুল ত্রুটি হয়ে থাকলে অবশ্যই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
✅আজ এ পর্যন্তই ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন 🤔










