জমি সংক্রান্ত যেকোনো আইনি বা প্রশাসনিক কাজে জমির দলিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নথি। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় মূল দলিলটি হারিয়ে গেছে অথবা উত্তরাধিকার সূত্রে জমি পেলেও দলিলের কপি হাতে নেই। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে বড় ধরনের দুশ্চিন্তা তৈরি হয়। অনেকেই মনে করেন মূল দলিল ছাড়া বুঝি জমির কোনো নকল কপি পাওয়া সম্ভব নয়।
বাস্তবে বিষয়টি ঠিক এমন নয়। বাংলাদেশে প্রচলিত ভূমি ও রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থায় মূল দলিল না থাকলেও নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করে জমির দলিলের নকল কপি তোলা যায়। এই প্রতিবেদনে দলিল ছাড়াই জমির দলিলের নকল তোলার আপডেট নিয়ম সহজ ও পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হলো।
আরও পড়ুন-হারিয়ে যাওয়া জমির দলিল পাওয়ার উপায় আপডেট নিয়ম
দলিল ছাড়া নকল দলিল তোলার প্রয়োজন কেন দেখা দেয়
দলিল ছাড়া নকল তোলার প্রয়োজন সাধারণত যেসব কারণে দেখা দেয়—
-
মূল দলিল হারিয়ে যাওয়া।
-
উত্তরাধিকার সূত্রে জমি পাওয়া কিন্তু দলিল হাতে না থাকা।
-
দীর্ঘদিন আগের দলিল নষ্ট বা অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া।
-
পারিবারিক বিভাজনের সময় দলিল অন্যের কাছে থাকা।
এই পরিস্থিতিগুলো খুবই সাধারণ এবং আইনগতভাবে এর সমাধানও রয়েছে।
দলিল ছাড়া কি আদৌ নকল দলিল তোলা যায়
হ্যাঁ, বাংলাদেশে দলিল ছাড়া নকল দলিল তোলা যায়। কারণ প্রতিটি রেজিস্ট্রিকৃত দলিল সংশ্লিষ্ট সাব রেজিস্ট্রি অফিসে সরকারিভাবে সংরক্ষিত থাকে। মূল দলিল না থাকলেও যদি রেজিস্ট্রি রেকর্ডে জমির তথ্য পাওয়া যায়, তাহলে সেই রেকর্ডের ভিত্তিতে সার্টিফায়েড নকল কপি সংগ্রহ করা সম্ভব।
এই নকল কপি আইনি দৃষ্টিতে বৈধ এবং অধিকাংশ সরকারি ও ব্যাংকিং কাজে গ্রহণযোগ্য।
দলিল ছাড়াই জমির দলিলের নকল তোলার আপডেট নিয়ম
বর্তমানে দলিল ছাড়া নকল দলিল তুলতে হলে কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করতে হয়। নিচে প্রতিটি ধাপ বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হলো।
প্রথম ধাপ থানায় সাধারণ ডায়েরি করা
যদি মূল দলিল হারিয়ে যায় বা পাওয়া না যায়, তাহলে প্রথমেই নিকটস্থ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করতে হবে।
জিডিতে যেসব তথ্য উল্লেখ করা জরুরি—
-
জমির অবস্থান ও ঠিকানা।
-
জমির মৌজা ও দাগ নম্বর।
-
খতিয়ান নম্বর যদি জানা থাকে।
-
দলিল না পাওয়ার কারণ সংক্ষেপে উল্লেখ।
এই জিডি মূল দলিল না থাকার একটি প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।
দ্বিতীয় ধাপ জমির প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করা
মূল দলিল না থাকলে দলিল নম্বর বা সাল জানা না-ও থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে জমির অন্যান্য তথ্য ব্যবহার করে অনুসন্ধান করা হয়।
যেসব তথ্য খুব গুরুত্বপূর্ণ—
-
মৌজা নাম।
-
দাগ নম্বর।
-
খতিয়ান নম্বর।
-
জমির পরিমাণ।
-
পূর্ববর্তী মালিকের নাম।
এই তথ্যগুলো নামজারি কাগজ খাজনার রশিদ বা ভূমি অফিস থেকে সংগ্রহ করা যায়।
তৃতীয় ধাপ সাব রেজিস্ট্রি অফিসে আবেদন করা
যে সাব রেজিস্ট্রি অফিসের আওতায় জমিটি পড়ে সেখানে নকল দলিলের জন্য আবেদন করতে হবে।
আবেদনে সাধারণত উল্লেখ করতে হয়—
-
জমির পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য।
-
কেন মূল দলিল নেই তার ব্যাখ্যা।
-
আবেদনকারীর পরিচয় ও জমির সঙ্গে সম্পর্ক।
এই আবেদন গ্রহণের পর অফিস রেকর্ড অনুসন্ধান শুরু করে।
চতুর্থ ধাপ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা
দলিল ছাড়া নকল তুলতে হলে সাধারণত নিচের কাগজপত্র জমা দিতে হয়—
-
থানায় করা সাধারণ ডায়েরির কপি।
-
জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি।
-
নামজারি বা উত্তরাধিকার প্রমাণের কাগজ।
-
খাজনা পরিশোধের রশিদ।
-
নির্ধারিত সরকারি ফি।
সব কাগজপত্র ঠিক থাকলে আবেদন প্রক্রিয়া এগিয়ে যায়।
পঞ্চম ধাপ রেকর্ড যাচাই ও নকল দলিল প্রস্তুত
সাব রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ড রুম থেকে জমি সংশ্লিষ্ট দলিল খুঁজে বের করা হয়। তথ্য মিললে সেই দলিলের সার্টিফায়েড নকল কপি প্রস্তুত করা হয়।
এই কপিটি—
-
আইনগতভাবে বৈধ।
-
জমি বিক্রি ও নামজারিতে ব্যবহারযোগ্য।
-
ব্যাংক ও সরকারি দপ্তরে গ্রহণযোগ্য।
দলিল নম্বর বা সাল জানা না থাকলে করণীয়
অনেক সময় দলিল নম্বর বা সাল কিছুই জানা থাকে না। এমন ক্ষেত্রে—
-
মৌজা ও দাগ নম্বর দিয়ে রেকর্ড অনুসন্ধান করা হয়।
-
পূর্ববর্তী মালিকের নাম ব্যবহার করে খোঁজ করা হয়।
-
ভূমি অফিসের সহায়তা নেওয়া যায়।
এতে সময় কিছুটা বেশি লাগলেও নকল দলিল পাওয়া সম্ভব।
দলিল ছাড়া নকল দলিল পেলে কী কী কাজে ব্যবহার করা যায়
সাব রেজিস্ট্রি অফিস থেকে পাওয়া সার্টিফায়েড নকল কপি দিয়ে—
-
নামজারি আবেদন করা যায়।
-
জমি বিক্রি বা হস্তান্তর করা যায়।
-
ব্যাংক ঋণ বা বন্ধক রাখা যায়।
-
আইনি প্রয়োজনে ব্যবহার করা যায়।
অর্থাৎ এটি মূল দলিলের কার্যকর বিকল্প।
ভবিষ্যতে দলিল সংক্রান্ত ঝামেলা এড়াতে করণীয়
একবার নকল দলিল সংগ্রহ করার পর ভবিষ্যতে যেন সমস্যা না হয় সেজন্য—
-
দলিলের একাধিক ফটোকপি সংরক্ষণ করা।
-
স্ক্যান কপি ডিজিটালভাবে রাখা।
-
দলিল নিরাপদ স্থানে রাখা।
-
গুরুত্বপূর্ণ কাগজ আলাদা ফাইল করে রাখা।
এই অভ্যাসগুলো দীর্ঘমেয়াদে অনেক ঝামেলা কমায়।
প্রশ্ন উত্তর
প্রশ্ন ১ মূল দলিল ছাড়া কি সত্যিই নকল দলিল পাওয়া যায়
হ্যাঁ সরকারিভাবে সংরক্ষিত রেকর্ড থেকে নকল দলিল পাওয়া যায়।
প্রশ্ন ২ নকল দলিল কি আইনি ভাবে বৈধ
হ্যাঁ সাব রেজিস্ট্রি অফিস থেকে প্রাপ্ত সার্টিফায়েড কপি আইনি ভাবে বৈধ।
প্রশ্ন ৩ দলিল নম্বর না জানলে কি সমস্যা হবে
না মৌজা দাগ ও খতিয়ান নম্বর ব্যবহার করে অনুসন্ধান করা যায়।
প্রশ্ন ৪ জিডি করা কি বাধ্যতামূলক
মূল দলিল না থাকলে জিডি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন ৫ কতদিনে নকল দলিল পাওয়া যায়
অফিসের কাজের চাপ ও রেকর্ডের অবস্থার ওপর সময় নির্ভর করে।
প্রশ্ন ৬ উত্তরাধিকার সূত্রে জমি পেলে দলিল ছাড়া নকল তোলা যাবে
হ্যাঁ উত্তরাধিকার প্রমাণের কাগজ থাকলে নকল তোলা যায়।
প্রশ্ন ৭ অনলাইনে কি নকল দলিল ডাউনলোড করা যায়
না অনলাইনে শুধু তথ্য দেখা যায় নকল কপি তুলতে অফিসে যেতে হয়।
উপসংহার
দলিল ছাড়াই জমির দলিলের নকল তোলার নিয়ম বাংলাদেশে স্পষ্ট ও কার্যকর। মূল দলিল না থাকলেও থানায় সাধারণ ডায়েরি করা এবং সাব রেজিস্ট্রি অফিসে সঠিক তথ্য দিয়ে আবেদন করলেই সার্টিফায়েড নকল কপি পাওয়া সম্ভব। এই নকল কপি আইনি ভাবে বৈধ এবং জমি সংক্রান্ত প্রায় সব কাজে ব্যবহারযোগ্য। সঠিক নিয়ম জানা থাকলে জমির দলিল নিয়ে অযথা দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
আরও পড়ুন-জমির মামলা থেকে বাঁচতে আগে থেকেই যেসব কাজ করবেন
👉🙏লেখার মধ্যে ভাষা জনিত কোন ভুল ত্রুটি হয়ে থাকলে অবশ্যই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
✅আজ এ পর্যন্তই ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন 🤔









