বাংলাদেশে জমি সংক্রান্ত বিরোধের একটি বড় অংশের মূল কারণ হলো বন্টননামা না করা, কিংবা সঠিকভাবে নামজারি না থাকা। অনেক পরিবারেই দেখা যায়—পিতা বা পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া জমি মৌখিকভাবে ভাগ হয়ে গেছে, কিন্তু দলিল হয়নি। ফলে ভবিষ্যতে বিক্রি, দখল, বা মামলা-মোকদ্দমার সময় মারাত্মক সমস্যায় পড়তে হয়।
আপনি যদি জমির মালিক হন, উত্তরাধিকার সূত্রে জমি পান, কিংবা ভবিষ্যতে জমি বিক্রি করতে চান—তাহলে বন্টননামা ও নামজারি আপনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজকের এই ব্লগ পোস্টে আমরা খুব সহজ ভাষায় জানবো:
-
বন্টননামা কী ও কেন জরুরি।
-
কীভাবে বন্টননামা দলিল করবেন।
-
নামজারি (খারিজ) করার নিয়ম।
-
বর্তমান খরচ কত।
-
কোন ভুলগুলো এড়াতে হবে।
-
এবং বাস্তবসম্মত আইনি টিপস।
এই লেখাটি পড়লে একজন সাধারণ বাংলাদেশি নাগরিক নিজেই বুঝতে পারবেন পুরো প্রক্রিয়াটি।
আরও পড়ুন-অনলাইনে জমির পর্চা সংগ্রহের নিয়ম ২০২৬ (আপডেট)
বন্টননামা দলিল কী?
বন্টননামা হলো একটি আইনসম্মত দলিল, যার মাধ্যমে একাধিক মালিকের মধ্যে জমি বা সম্পত্তি ভাগ করে দেওয়া হয়। সাধারণত ভাই-বোন, ওয়ারিশ বা অংশীদারদের মধ্যে এই দলিল করা হয়।
👉 সহজ ভাষায় বললে:
একই জমির উপর একাধিক মালিক থাকলে কে কোন অংশের মালিক — সেটাই বন্টননামা দলিল নির্ধারণ করে।
এই দলিল রেজিস্ট্রি না হলে ভবিষ্যতে সেই জমি বিক্রি, দান, কিংবা নামজারি করতে বড় সমস্যা হয়।
কেন বন্টননামা করা জরুরি?
বন্টননামা না করলে যেসব সমস্যা হয়—
-
জমি বিক্রি করতে গেলে বাধা আসে।
-
নামজারি করতে সমস্যা হয়।
-
ভবিষ্যতে ভাই-বোনের মধ্যে ঝগড়া ও মামলা হয়।
-
ব্যাংক লোন নেওয়া যায় না।
-
জমির সীমানা নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়।
অন্যদিকে বন্টননামা করলে—
-
প্রত্যেক মালিকের অংশ পরিষ্কার হয়।
-
আইনগত নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।
-
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ঝামেলা কমে।
-
জমির বাজারমূল্য বৃদ্ধি পায়।
বন্টননামা দলিল করার মূল নিয়ম
১. সকল মালিকের সম্মতি
বন্টননামা করতে হলে জমির সব মালিকের সম্মতি ও স্বাক্ষর থাকতে হবে। কেউ অনুপস্থিত থাকলে দলিল আইনি দুর্বল হয়ে যায়।
২. জমির কাগজপত্র যাচাই
যেসব কাগজ অবশ্যই লাগবে—
-
খতিয়ান/পরচা।
-
পূর্বের দলিল।
-
নামজারি কপি।
-
নকশা/ম্যাপ।
-
NID কপি।
৩. বন্টননামা খসড়া তৈরি
দলিল লেখকের মাধ্যমে লিখতে হবে—
-
জমির বিবরণ।
-
মোট পরিমাণ।
-
কে কতটুকু অংশ পাচ্ছে।
-
সীমানা।
-
প্রত্যেকের অংশের মূল্য।
৪. সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রেশন
খসড়া দলিল প্রস্তুত হলে নিকটস্থ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে।
বন্টননামা দলিল করতে খরচ কত?
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী সাধারণত খরচগুলো হয়—
সরকারী ফি
| দলিলের মূল্য | রেজিস্ট্রেশন ফি |
|---|---|
| ৩ লাখ পর্যন্ত | প্রায় ৫০০ টাকা |
| ১০ লাখ পর্যন্ত | প্রায় ৭০০ টাকা |
| ৩০ লাখ পর্যন্ত | প্রায় ১২০০ টাকা |
| ৫০ লাখ পর্যন্ত | প্রায় ১৮০০ টাকা |
| তার বেশি | প্রায় ২০০০ টাকা |
অতিরিক্ত খরচ
-
স্ট্যাম্প ডিউটি
-
E-fee
-
পৃষ্ঠা ফি
-
দলিল লেখকের পারিশ্রমিক (২,০০০–৫,০০০ টাকা বা বেশি হতে পারে)
👉 মোট খরচ সাধারণত ৩,০০০ থেকে ৭,০০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে, এলাকা ও দলিলের জটিলতার উপর নির্ভর করে।
নামজারি (খারিজ) কী?
নামজারি বা খারিজ হলো জমির সরকারি রেকর্ডে আপনার নাম অন্তর্ভুক্ত করা।
দলিল থাকলেও নামজারি না থাকলে আপনি পুরোপুরি মালিক হিসেবে স্বীকৃত হন না।
নামজারি ছাড়া যেসব সমস্যা হয়
-
জমি বিক্রি করতে সমস্যা।
-
কর পরিশোধে জটিলতা।
-
মামলা হলে দুর্বল অবস্থান।
-
উত্তরাধিকারী জটিলতা।
নামজারি করার ধাপ
-
ভূমি অফিসে আবেদন।
-
প্রয়োজনীয় কাগজ জমা।
-
মাঠ তদন্ত।
-
শুনানি।
-
খতিয়ানে নাম অন্তর্ভুক্ত।
নামজারি করতে খরচ
সরকারি ফি সাধারণত প্রায় ১,০০০–১,২০০ টাকা। তবে দলিল প্রস্তুত ও অন্যান্য খরচ যোগ হলে কিছুটা বাড়তে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ আইনি টিপস
-
সবসময় দলিল রেজিস্ট্রি করুন, শুধু কাগজে লিখে রাখবেন না।
-
দলিল লেখকের পাশাপাশি আইনজীবীর পরামর্শ নিলে নিরাপদ।
-
জমির নকশা মিলিয়ে নিন।
-
কারো নাম বাদ পড়েছে কিনা যাচাই করুন।
-
বন্টননামা ছাড়া জমি বিক্রি না করাই উত্তম।
সাধারণ ভুল যেগুলো মানুষ করে
-
মৌখিক বন্টনে সন্তুষ্ট থাকা।
-
নামজারি না করা।
-
খতিয়ান না মিলিয়ে দলিল করা।
-
ভুল সীমানা লেখা।
-
সবাইকে না জানিয়ে দলিল করা।
এই ভুলগুলো ভবিষ্যতে বড় মামলা ও ক্ষতির কারণ হয়।
প্রশ্ন ও উত্তর
প্রশ্ন: বন্টননামা ছাড়া কি নামজারি করা যায়?
উত্তর: অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হলেও ভবিষ্যতে তা আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে। বন্টননামা থাকলে নামজারি নিরাপদ হয়।
প্রশ্ন: বন্টননামা কি বাতিল করা যায়?
উত্তর: সকল পক্ষ সম্মত হলে বা আদালতের মাধ্যমে বাতিল করা যায়।
প্রশ্ন: বন্টননামা ছাড়া জমি বিক্রি করলে কি সমস্যা?
উত্তর: হ্যাঁ, ভবিষ্যতে মালিকানা নিয়ে বড় ঝামেলা হতে পারে।
প্রশ্ন: অনলাইনে নামজারি করা যায়?
উত্তর: বর্তমানে ভূমি সেবা পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইন আবেদন করা যায়, তবে যাচাই প্রক্রিয়া অফলাইনে হয়।
উপসংহার
বাংলাদেশে জমি হলো সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। অথচ সঠিক দলিল ও নামজারি না থাকার কারণে অসংখ্য পরিবার আজও মামলার বোঝা বহন করছে। বন্টননামা ও নামজারি মূলত ভবিষ্যতের ঝামেলা থেকে নিজেকে ও পরিবারকে রক্ষা করার একটি নিরাপদ পথ।
আপনি যদি আজই সঠিকভাবে দলিল ও নামজারি সম্পন্ন করেন, তাহলে আপনার সন্তানরা ভবিষ্যতে আপনাকে ধন্যবাদ দেবে।
জমি কিনুন, রাখুন, বিক্রি করুন—কিন্তু অবশ্যই আইন মেনে, কাগজপত্র ঠিক রেখে।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
আরও পড়ুন-জমির মামলা থেকে বাঁচতে আগে থেকেই যেসব কাজ করবেন
👉🙏লেখার মধ্যে ভাষা জনিত কোন ভুল ত্রুটি হয়ে থাকলে অবশ্যই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
✅আজ এ পর্যন্তই ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন 🤔










