দেশের কর ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এবার সাধারণ হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকেও কর ও ভ্যাটের আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। এজন্য সহজ ‘ফ্ল্যাট রেট’ বা নির্ধারিত হারে কর চালুর চিন্তা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
আরও পড়ুন-১৬৫ সিসির বাইকে বছরে ৫০০০ টাকা পর্যন্ত কর, যেভাবে অগ্রিম কর আদায় করা হবে
বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘সংকটকালের বাজেট ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় অর্থমন্ত্রী বলেন, ছোট দোকানদারদের করের আওতায় আনতে এবং কর কর্মকর্তাদের হয়রানি কমাতে সহজ একটি নির্দিষ্ট কর পদ্ধতি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেও বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
জানা গেছে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এই নতুন কর ব্যবস্থার প্রস্তাব রাখা হতে পারে। এ বিষয়ে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, অর্থমন্ত্রী এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে দীর্ঘ বৈঠক হয়েছে। সেখানে উপজেলা পর্যায়ের ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য ‘প্যাকেজ ভ্যাট’ চালুর বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন ব্যবস্থায় ছোট ব্যবসায়ীদের প্রতি মাসে অল্প পরিমাণ নির্ধারিত ভ্যাট দিতে হতে পারে। আলোচনায় অংশ নেওয়া এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, মাসিক এই ভ্যাটের পরিমাণ প্রায় ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকার মধ্যে হতে পারে। তবে এখনো বিষয়টি চূড়ান্ত হয়নি।
সরকারের যুক্তি হলো, দেশের প্রায় সব শ্রেণির মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রের উন্নয়নে অবদান রাখে। তাই কর ব্যবস্থার আওতা আরও বিস্তৃত করে সাধারণ ব্যবসায়ী ও প্রান্তিক উদ্যোক্তাদেরও আনুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে বলেছেন বলেও সূত্র জানিয়েছে, “একদম গরিব মানুষও দেশকে ভালোবাসে এবং কর দিয়ে রাষ্ট্রের অংশীদার হতে চায়। কেউ ৫ টাকা দিক বা ৫০০ টাকা দিক, সেটাও দেশের প্রতি দায়িত্ববোধের অংশ।”
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে করজিডিপি অনুপাত তুলনামূলক কম। ফলে সরকার নতুন নতুন খাতকে কর ব্যবস্থার আওতায় আনার চেষ্টা করছে। তবে ছোট ব্যবসায়ী ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করেই কর ব্যবস্থা সহজ করতে হবে বলে মনে করছেন তারা।
অন্যদিকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। অনেক দোকানদার বলছেন, বিদ্যুৎ, ভাড়া ও ব্যবসায়িক খরচ বাড়ার কারণে তারা আগেই চাপে আছেন। এর মধ্যে নতুন করে ভ্যাট বা কর আরোপ করলে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে যেতে পারে।
তবে এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান ব্যবস্থায় ছোট ব্যবসায়ীদের অনেক সময় ভ্যাট অফিস বা কর কর্মকর্তাদের সঙ্গে নানা জটিলতায় পড়তে হয়। নির্ধারিত ‘ফ্ল্যাট রেট’ চালু হলে হয়রানি কমবে এবং ব্যবসায়ীরাও সহজে কর পরিশোধ করতে পারবেন।
একই অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী বড় বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কর ফাঁকি নিয়েও কথা বলেন। তিনি বলেন, কোকাকোলা, পেপসি ও বড় তামাক কোম্পানিগুলোর প্রকৃত বাজার হিস্যা যাচাই করে ন্যায্য কর আদায় নিশ্চিত করা হবে। সরকারের লক্ষ্য হলো, বড় ও ছোট—সব ধরনের ব্যবসাকে সুশৃঙ্খল কর ব্যবস্থার আওতায় আনা।
এছাড়া কর নীতি প্রণয়নে বড় ধরনের পরিবর্তনের কথাও জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, শুধু সরকারি কর কর্মকর্তাদের নয়, বরং গ্লোবাল অর্থনীতি, স্থানীয় বাণিজ্য ও মানবিক অর্থনৈতিক বিষয় বোঝেন—এমন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে নতুন নীতিনির্ধারণী কাঠামো গঠন করা হবে।
এদিকে অতীতে এনবিআরকে আলাদা দুটি বিভাগে ভাগ করার উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাজস্ব নীতি বিভাগ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ নামে দুটি অংশে বিভক্ত করার পরিকল্পনা করা হলেও পরে তা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। এখন নতুন সরকার কর ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও দক্ষ করার জন্য নতুনভাবে নীতি সাজানোর কথা বলছে।
অর্থমন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, গ্রামীণ কামার, কুমার, তাঁতি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকেও অর্থনীতির মূলধারায় আনতে বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি থিয়েটার, সংস্কৃতি, সংগীত, পেইন্টিং ও আর্টিফিশিয়াল জুয়েলারির মতো সৃজনশীল খাতে বিশেষ ফান্ড ও প্রকল্প রাখা হবে আগামী বাজেটে।
সরকার আগামী এক বছরের মধ্যে পুরো অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে ডিজিটাল অটোমেশনের আওতায় আনার পরিকল্পনাও করছে। এতে কর আদায়, ব্যবসা নিবন্ধন এবং বিভিন্ন সরকারি সেবা আরও সহজ ও স্বচ্ছ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে নতুন কর ও ভ্যাট ব্যবস্থা নিয়ে এখন ব্যবসায়ী মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে। সরকার বলছে, এটি কর ব্যবস্থাকে সহজ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করবে। তবে ব্যবসায়ীদের বড় অংশ চাইছেন, নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যেন বাস্তব পরিস্থিতি ও ক্ষুদ্র ব্যবসার সক্ষমতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়।
সূত্র:বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
আরও পড়ুন-ছোট সিসির বাইকে কর ছাড়, বড় ইঞ্জিনের মোটরসাইকেলে আসছে নতুন ট্যাক্স










