অবৈতনিক শিক্ষায় দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ

বিশ্বজুড়ে শিক্ষার প্রসার বাড়লেও অবৈতনিক শিক্ষার নিশ্চয়তায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। ইউনেস্কোর ‘ওয়ার্ল্ড এডুকেশন স্ট্যাটিস্টিকস ২০২৫’ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশে সরকারিভাবে মাত্র পাঁচ বছরের অবৈতনিক শিক্ষার নিশ্চয়তা রয়েছে। অর্থাৎ পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্তই রাষ্ট্র আইনি বাধ্যবাধকতার মাধ্যমে শিক্ষার দায়িত্ব নেয়।

একই অঞ্চলের অন্যান্য দেশগুলোর তুলনায় এই সময়সীমা অনেক কম। শ্রীলঙ্কা যেখানে ১৩ বছর পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা নিশ্চিত করেছে, সেখানে পাকিস্তান, নেপাল ও মালদ্বীপে ১২ বছর পর্যন্ত এই সুবিধা রয়েছে। এমনকি ভারতেও অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন- শিক্ষা উন্নয়নে বাংলাদেশ-মিশর একসঙ্গে কাজ করবে, লন্ডনে বৈঠক

ইউনেস্কো ইনস্টিটিউট ফর স্ট্যাটিস্টিকসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের অবস্থান বৈশ্বিক তালিকারও একেবারে নিচের দিকে। গবেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি কেবল অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ঘাটতি ও বাস্তবায়নের দুর্বলতার ফল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়–এর শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ মনে করেন, শিক্ষা কখনোই সরকারের প্রকৃত অগ্রাধিকার পায়নি। তাঁর মতে, বাধ্যতামূলক শিক্ষার পরিধি বাড়াতে শুধু ঘোষণা দিলেই হবে না; প্রয়োজন পর্যাপ্ত বাজেট, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, অবকাঠামো এবং সামাজিক নিরাপত্তা সহায়তা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাগজে-কলমে অবৈতনিক শিক্ষা থাকলেও বাস্তবে পরিবারের ওপর বিশাল আর্থিক চাপ থেকে যাচ্ছে। খাতা-কলম, যাতায়াত, কোচিং, পোশাক ও খাবারের খরচ অভিভাবকদেরই বহন করতে হয়। ফলে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য সন্তানকে স্কুলে ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, শুধু টিউশন ফি মওকুফ করলেই শিক্ষা প্রকৃত অর্থে অবৈতনিক হয় না। একটি শিশু স্কুলে গেলে পরিবার তার সম্ভাব্য আয় থেকেও বঞ্চিত হয়, যাকে অর্থনীতিতে “সুযোগ ব্যয়” বলা হয়। দরিদ্র পরিবারের জন্য এটি বড় বাস্তবতা।

বাংলাদেশে ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারণের কথা বলা হলেও দীর্ঘ ১৫ বছরেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। গবেষকদের মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতির কারণেই এ অগ্রগতি থমকে আছে।

শিক্ষার মান নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু শিক্ষার মেয়াদ বাড়ালেই হবে না; শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার মান নিশ্চিত করাও জরুরি। বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষায় পৌঁছেও মৌলিক দক্ষতায় পিছিয়ে থাকছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলেও এর প্রতিফলন দেখা যায়।

শিক্ষক সংকট ও দক্ষ শিক্ষকের অভাবও বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষকতা পেশাকে আকর্ষণীয় করতে আলাদা বেতন কাঠামো, প্রশিক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার সুবিধা প্রয়োজন।

গবেষকদের ভাষায়, শিক্ষাকে কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। অন্যথায় অবৈতনিক শিক্ষার বছর বাড়ালেও বাস্তব পরিবর্তন আসবে না।

সূত্র: ইউনেস্কো ‘ওয়ার্ল্ড এডুকেশন স্ট্যাটিস্টিকস ২০২৫’, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআর গবেষকদের মতামত

আরও পড়ুন- লন্ডনের বিশ্বমঞ্চে শিক্ষাখাতে প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনা তুলে ধরলেন শিক্ষামন্ত্রী

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
📌 পোস্টটি শেয়ার করুন! 🔥

শিক্ষা ও চাকরি বিষয়ক প্রতিবেদক

আমি শিক্ষা, চাকরি, ক্যারিয়ার ও সমসাময়িক উন্নয়নমূলক বিষয় নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন লিখি। তথ্যভিত্তিক ও পাঠকবান্ধব কনটেন্ট তৈরির মাধ্যমে শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী এবং সচেতন পাঠকদের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য পৌঁছে দেওয়াই আমার প্রধান লক্ষ্য। শিক্ষা নীতি, ভর্তি, পরীক্ষা, ফলাফল, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, সরকারি-বেসরকারি চাকরির আপডেট ও দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ক সংবাদ বিশ্লেষণধর্মীভাবে উপস্থাপন করতে আগ্রহী। সহজ ভাষা, নির্ভুল তথ্য এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতাকে আমি সবসময় গুরুত্ব দিই। বর্তমান প্রজন্মের জন্য কার্যকর ও সময়োপযোগী তথ্য পৌঁছে দিতে আমি প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছি।

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now