বিশ্বজুড়ে দ্রুত বদলে যাচ্ছে চাকরির বাজার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অটোমেশন ও ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারের কারণে বহু প্রচলিত পেশা এখন অনিশ্চয়তার মুখে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব কাজ সহজেই সফটওয়্যার বা মেশিন দিয়ে করা সম্ভব, আগামী কয়েক বছরে সেসব চাকরির বড় অংশ ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক “সাউথ এশিয়া ডেভেলপমেন্ট আপডেট” প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ৭ শতাংশ চাকরি সরাসরি এআইয়ের কারণে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। যদিও একই সঙ্গে নতুন প্রযুক্তিনির্ভর কিছু কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে।
আরও পড়ুন- জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনে ৯৬৮ পদে বিশাল নিয়োগ, আবেদন শুরু ১৮ মে
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত নিয়ে। দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি এই শিল্পে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ কাজ করেন। তবে অটোমেটেড মেশিন, ডিজিটাল কাটিং ও রোবোটিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় কম শ্রমিক দিয়েই এখন বেশি উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যেসব শ্রমিক শুধু নির্দিষ্ট একটি কাজ জানেন—যেমন সাধারণ সেলাই, কাটিং বা প্যাকেজিং—তাদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। অনেক কারখানায় এখন আগের চেয়ে অনেক কম কর্মী দিয়ে একই পরিমাণ উৎপাদন করা হচ্ছে।
গবেষণা সংস্থা Research and Policy Integration for Development-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশের উৎপাদন খাতে প্রায় ১৪ লাখ কর্মসংস্থান কমেছে। অথচ একই সময়ে শিল্পখাতের প্রবৃদ্ধি ছিল উল্লেখযোগ্য।
ব্যাংকিং খাতেও প্রযুক্তির প্রভাব দ্রুত বাড়ছে। মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন লেনদেন ও এআইভিত্তিক গ্রাহকসেবার কারণে প্রচলিত ক্যাশ বিভাগ, ডাটা এন্ট্রি ও সাধারণ কাস্টমার সার্ভিসভিত্তিক চাকরিগুলো ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ভবিষ্যতে ব্যাংকগুলো প্রযুক্তিদক্ষ কর্মীদের বেশি গুরুত্ব দেবে। যারা শুধু প্রচলিত ব্যাংকিং কাজ জানেন, তাদের জন্য সুযোগ কমে যেতে পারে।
এদিকে বহুজাতিক ব্যাংক HSBC ইতোমধ্যে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২০ হাজার কর্মী কমানোর পরিকল্পনা করেছে। ডিজিটাল রূপান্তর ও অটোমেশন বাড়ানোর অংশ হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
কলসেন্টার ও সাপোর্ট সার্ভিস খাতেও বড় পরিবর্তন আসছে। আগে গ্রাহকের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বা অভিযোগ গ্রহণের জন্য বিপুল সংখ্যক কর্মী প্রয়োজন হতো। এখন চ্যাটবট ও ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট অনেক কাজই স্বয়ংক্রিয়ভাবে করতে পারছে।
একইভাবে অফিস সহকারী, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর, সাধারণ হিসাবরক্ষণ ও রুটিন প্রশাসনিক কাজের ক্ষেত্রেও মানুষের প্রয়োজন কমে যেতে পারে বলে মনে করছেন প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা।
গণমাধ্যমেও প্রযুক্তির প্রভাব বাড়ছে। এখন অনেক সংবাদমাধ্যম এআই ব্যবহার করে দ্রুত খবরের সারাংশ তৈরি, অনুবাদ ও তথ্য বিশ্লেষণের কাজ করছে। ফলে শুধু রুটিন কনটেন্ট তৈরির কাজে যুক্ত কর্মীদের ওপর চাপ বাড়তে পারে।
তবে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, তথ্য যাচাই, বিশ্লেষণধর্মী রিপোর্টিং ও মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকতায় দক্ষদের চাহিদা বাড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
খুচরা বিক্রি ও সুপারশপেও পরিবর্তন স্পষ্ট। স্বয়ংক্রিয় বিলিং, অনলাইন অর্ডার ও ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার কারণে ক্যাশিয়ার ও বিক্রয়কর্মীর মতো অনেক পদে কর্মী চাহিদা কমে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে যেসব চাকরি তুলনামূলক নিরাপদ থাকবে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, সাইবার নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, ডাটা বিশ্লেষণ, শিক্ষা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা খাত।
তাদের মতে, এখন শুধু ডিগ্রি নয়; প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা ও নতুন কিছু দ্রুত শেখার মানসিকতাই হবে ভবিষ্যতের চাকরিবাজারে টিকে থাকার মূল চাবিকাঠি।
সূত্র: বিশ্বব্যাংক, বিবিএস, বিআইডিএস ও শ্রমবাজার বিশ্লেষকদের মতামত
আরও পড়ুন- ম্যানেজার পদে লোক নিচ্ছে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, আবেদন চলছে









