বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব যখন ধীরে ধীরে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতেও চাপ তৈরি করছে, ঠিক তখনই নতুন করে আলোচনায় এসেছে খুলনার বহুল প্রতীক্ষিত ‘রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র’ প্রকল্প। দীর্ঘ বিলম্ব, গ্যাস সংকট এবং ঋণের চাপের মধ্যেও প্রকল্পটি নিয়ে আশাবাদী বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রতিষ্ঠান নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি (নওপাজেকো)।
আরও পড়ুন-জ্বালানি ছাড়াই প্রতিদিন ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ, তিস্তা সোলার প্রকল্পে চমক
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৭ সালেই জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে সাশ্রয়ী মূল্যের এই বিদ্যুৎ।
খুলনার খালিশপুর এলাকায় অবস্থিত বন্ধ হয়ে যাওয়া খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলস লিমিটেডের প্রায় ৫০ একর জমিতে ২০১৮ সালে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ শুরু হয়। শুরুতে প্রকল্পটির কাজ ২০২২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ায় উৎপাদন কার্যক্রম বারবার পিছিয়ে যায়। বর্তমানে প্রকল্পটির সার্বিক অগ্রগতি প্রায় ৯৪ শতাংশ বলে জানিয়েছে নওপাজেকো।
এখন বিদ্যুৎকেন্দ্রে কমিশনিং বা পরীক্ষামূলক প্রস্তুতির কাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা বলছেন, অবকাঠামোগত বড় অংশের কাজ ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। তবে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত হওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৮ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নির্ধারিত ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ২১ শতাংশ সাশ্রয় হয়েছে। এই প্রকল্পে অর্থায়নের বড় অংশ এসেছে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) মিলিয়ে প্রায় ৬ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা ঋণ সহায়তা দিয়েছে। বাকি অর্থ জুগিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
তবে প্রকল্পের বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে গ্যাস সরবরাহ। পূর্ণ সক্ষমতায় ৮৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রতিদিন প্রায় ১২৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হবে। কিন্তু দেশে চলমান গ্যাস সংকটের কারণে এখনও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, যদি পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না পাওয়া যায়, তাহলে আংশিকভাবে কেন্দ্রটি চালু রেখে ১৮০ থেকে ২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হতে পারে। তবে পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে হলে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতেই হবে।
নওপাজেকোর নির্বাহী পরিচালক (পিঅ্যান্ডডি) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ প্রায় শেষ। বর্তমানে কমিশনিংয়ের কাজ চলমান রয়েছে। তারা আশা করছেন, ২০২৭ সালের মধ্যেই এই কেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও জানান, এই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ পড়বে মাত্র ৫ থেকে সাড়ে ৫ টাকা, যা বর্তমান সময়ের তুলনায় অত্যন্ত সাশ্রয়ী। তবে গ্যাসের পরিবর্তে ডিজেল ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হলে খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালে প্রকল্প অনুমোদনের সময় রূপসা এলাকায় গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে গ্যাস বরাদ্দ নিয়ে নীতিগত পরিবর্তনের কারণে প্রকল্পটি পিছিয়ে পড়ে। অভিযোগ রয়েছে, পরে বেসরকারি খাতের প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা হলেও রাষ্ট্রীয় এই প্রকল্পটি প্রয়োজনীয় জ্বালানি পায়নি।
এর ফলে শুধু উৎপাদন বিলম্বিত হয়নি, বরং আন্তর্জাতিক ঋণের চাপও বেড়েছে। এডিবির প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধের সময় ঘনিয়ে আসায় এখন আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে নওপাজেকো। উৎপাদন শুরু না হলেও ঋণের দায় বহন করতে হচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) বর্তমানে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে তুলনামূলক বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনছে। সেই প্রেক্ষাপটে রূপসার মতো কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কেন্দ্র চালু হলে জাতীয় গ্রিডে সাশ্রয়ী বিদ্যুতের বড় উৎস তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এতে জ্বালানি হিসেবে শুধু প্রাকৃতিক গ্যাস নয়, প্রয়োজনে হাই-স্পিড ডিজেল (এইচএসডি) ব্যবহারের সুযোগও রাখা হয়েছে। অর্থাৎ গ্যাস সরবরাহে সমস্যা হলেও বিকল্প জ্বালানি দিয়ে সীমিত উৎপাদন চালু রাখা সম্ভব হবে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্পটির কিছু কাজ এখনও বাকি থাকায় এটিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সমাপ্ত প্রকল্পের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত প্রকল্পের স্টিয়ারিং কমিটির সভায় প্রকল্পের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করার সুপারিশ করা হয়। সেই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) সংশোধনের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে মেয়াদ বৃদ্ধির চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লেও নতুন উৎপাদন সক্ষমতা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে ভবিষ্যতে আরও বড় সংকট তৈরি হতে পারে। সেই দিক থেকে রূপসা বিদ্যুৎকেন্দ্র শুধু খুলনা অঞ্চলের জন্য নয়, পুরো দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজার অস্থিতিশীল। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাতের কারণে তেল ও গ্যাসের বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ছে। তাই সাশ্রয়ী ও উচ্চ সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র দ্রুত চালু করা এখন সরকারের জন্য বড় অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর খুলনার রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র যদি ২০২৭ সালে চালু হয়, তাহলে তা দেশের বিদ্যুৎ খাতে বড় স্বস্তি এনে দিতে পারে। বিশেষ করে কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ থাকায় জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র:বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (BPDB)
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
আরও পড়ুন-পল্লী বিদ্যুতের মিটার স্থানান্তরের নিয়ম ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ আবেদন প্রক্রিয়া(আপডেট)
👉🙏লেখার মধ্যে ভাষা জনিত কোন ভুল ত্রুটি হয়ে থাকলে অবশ্যই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
✅আজ এ পর্যন্তই ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন 🤔









