ঢাকার বায়ুদূষণ ও যানজট কমাতে ইলেকট্রিক বাস চালুর উদ্যোগ নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে দূষণ ও ট্রাফিক সমস্যায় জর্জরিত রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে এই পরিকল্পনাকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল পরিকল্পনা ঘোষণায় নয়—কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন শক্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, সুস্পষ্ট নীতিমালা এবং আধুনিক অবকাঠামো।
আরও পড়ুন-জ্বালানি তেলের সংকট মোকাবেলায় ইলেকট্রিক বাস সহ যে সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সরকার
সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজধানীতে ধাপে ধাপে ২৫০টি ইলেকট্রিক বাস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি ‘ক্লিন অ্যান্ড গ্রিন সিটি’ পরিকল্পনার অংশ, যার লক্ষ্য ঢাকার পরিবেশ দূষণ কমানো এবং গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিক করা। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ডিজেলচালিত পুরনো বাস সরিয়ে পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক বাস চালু করা গেলে শহরের বায়ু মানের উন্নতি ঘটবে এবং জ্বালানি নির্ভরতা কমবে।
বাংলাদেশের গণপরিবহন খাত দীর্ঘদিন ধরে ডিজেলনির্ভর হওয়ায় দূষণের মাত্রা তুলনামূলক বেশি। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়–এর যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল হক বলেছেন, বাস খাতেই সরকারের নিয়ন্ত্রণ বেশি থাকায় এখান থেকেই ইলেকট্রিফিকেশন শুরু করা সবচেয়ে বাস্তবসম্মত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে বৈদ্যুতিক বাস ব্যবস্থায় রূপান্তর শুরু করেছে এবং আগামী কয়েক দশকের মধ্যে ডিজেলচালিত যানবাহন কমে যাবে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, শুধু বাস চালু করলেই হবে না—এ জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। গ্রিন ভেহিক্যাল নীতিমালা, বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, রক্ষণাবেক্ষণ অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং দক্ষ জনবল তৈরি—এসব বিষয় একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে।
একই ধরনের মত দিয়েছেন বুয়েটের আরেক যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. হাদিউজ্জামান। তিনি বলেন, ঢাকার চলমান বাসগুলোর বড় অংশই ইতোমধ্যে আয়ুষ্কাল অতিক্রম করেছে। সেগুলো পর্যায়ক্রমে সরিয়ে ইলেকট্রিক বাস দিয়ে প্রতিস্থাপন করা গেলে পরিবহন ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। তার মতে, ডিজেলচালিত বাসের তুলনায় ইলেকট্রিক বাসে প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত জ্বালানি দক্ষতা অর্জন সম্ভব, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিকভাবেও লাভজনক।
তবে এই পরিবর্তনের পথে বড় বাধা হিসেবে উঠে এসেছে প্রভাবশালী পরিবহন ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বিষয়টি। অতীতে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ইলেকট্রিক বাস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস মালিকদের আপত্তির কারণে তা বাস্তবায়ন হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এই প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এই ধরনের শক্তিশালী স্বার্থগোষ্ঠীর বাধা অতিক্রম করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী মনে করেন, ডেডিকেটেড লেন এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে ইলেকট্রিক বাস ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। তবে এজন্য সরকারকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে এবং বাস্তবায়নে কোনো ধরনের আপস করা যাবে না।
সরকারি উদ্যোগের অংশ হিসেবে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ এবং পরিবেশ অধিদপ্তর যৌথভাবে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ করছে। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ঢাকার বায়ুদূষণের প্রধান উৎসগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।
এছাড়া ইলেকট্রিক বাস আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে, যা এই খাতকে উৎসাহিত করবে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে শত শত ইলেকট্রিক বাস ঢাকার সড়কে নামানো হবে।
এদিকে একটি বৃহৎ প্রকল্পের আওতায় প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ৪০০টি ইলেকট্রিক বাস চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের একটি বড় অংশ বিশ্বব্যাংকের ঋণ সহায়তায় বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। প্রকল্পটির সময়সীমা ২০২৫ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ইলেকট্রিক বাস চালুর পাশাপাশি চার্জিং স্টেশন, ওয়ার্কশপ, টেকনিশিয়ান প্রশিক্ষণ এবং স্পেয়ার পার্টস সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। এছাড়া ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা, রিসাইক্লিং এবং দীর্ঘমেয়াদি অপারেশন পরিকল্পনাও নিশ্চিত করতে হবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ঢাকায় ইলেকট্রিক বাস চালুর উদ্যোগ একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে। তবে এটি সফল করতে হলে শুধু প্রযুক্তি নয়, বরং নীতিমালা, অবকাঠামো এবং রাজনৈতিক দৃঢ়তা—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন। সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এই উদ্যোগ ঢাকার পরিবেশ ও গণপরিবহন ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।
সূত্র-আমার দেশ প্রতিবেদন
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
আরও পড়ুন-জ্বালানি সংকটে স্কুলে ইলেকট্রিক বাস চালু অফিস সময় ৯টা–৪টা
👉🙏লেখার মধ্যে ভাষা জনিত কোন ভুল ত্রুটি হয়ে থাকলে অবশ্যই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
✅আজ এ পর্যন্তই ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন 🤔










