বাংলাদেশে যেকোনো ধরনের ব্যবসা পরিচালনার জন্য ট্রেড লাইসেন্স বাধ্যতামূলক একটি সরকারি অনুমতিপত্র। ছোট দোকান, অনলাইন ব্যবসা, হোলসেল, কারখানা কিংবা বড় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসা চালানো আইনত বৈধ নয়। কিন্তু নতুন ব্যবসা শুরু করার সময় সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি করা হয়, তা হলো—ট্রেড লাইসেন্স করতে কত টাকা লাগে।
বাস্তবতা হলো, ট্রেড লাইসেন্সের খরচ সবার জন্য এক নয়। এটি নির্ভর করে ব্যবসার ধরন, ব্যবসার এলাকা (সিটি কর্পোরেশন বা ইউনিয়ন), মূলধন এবং সাইনবোর্ডসহ কয়েকটি বিষয়ের ওপর। এই পোস্টে ট্রেড লাইসেন্সের সম্ভাব্য খরচ, খরচের ভাঙা হিসাব এবং অনলাইনে ট্রেড লাইসেন্স যাচাই করার নিয়ম—সবকিছু সহজভাবে তুলে ধরা হলো।
আরও পড়ুন-অনলাইনে ই-ট্রেড লাইসেন্স করার নিয়ম(আবেদন, কাগজপত্র ও খরচ)
ট্রেড লাইসেন্সের খরচ কেন ভিন্ন ভিন্ন হয়
ট্রেড লাইসেন্সের ফি নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষ কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করে।
-
ব্যবসার ধরন (ছোট, মাঝারি বা বড়)।
-
ব্যবসার মূলধনের পরিমাণ।
-
ব্যবসার অবস্থান (সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ)।
-
ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডের আকার।
-
ব্যবসাটি একক মালিকানা নাকি কোম্পানি।
এই কারণেই একজন দোকানদার ও একটি বড় কোম্পানির ট্রেড লাইসেন্স ফি এক হয় না।
সাধারণভাবে ট্রেড লাইসেন্স করতে কত টাকা লাগে
বাংলাদেশে ট্রেড লাইসেন্স করার মোট খরচ সাধারণত—
-
৫০০ টাকা থেকে ৫,০০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে।
-
বড় ব্যবসা বা কোম্পানির ক্ষেত্রে এটি ৪০,০০০ টাকা বা তার বেশিও হতে পারে।
ছোট ব্যবসার ক্ষেত্রে খরচ তুলনামূলক কম এবং বড় বা কর্পোরেট ব্যবসার ক্ষেত্রে খরচ বেশি হয়।
ট্রেড লাইসেন্সের খরচের বিস্তারিত হিসাব
ট্রেড লাইসেন্স করতে সাধারণত কয়েকটি আলাদা আলাদা খাতে টাকা দিতে হয়।
আবেদন ফরম ও আনুষঙ্গিক খরচ
এই খরচগুলো প্রায় সব জায়গাতেই প্রযোজ্য।
-
আবেদন ফরমের মূল্য প্রায় ১০ টাকা।
-
লাইসেন্স বইয়ের খরচ প্রায় ৫০ টাকা।
-
স্ট্যাম্প ফি সাধারণত ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা।
এই অংশের খরচ তুলনামূলকভাবে কম।
লাইসেন্স ফি (মূল খরচ)
এটি ট্রেড লাইসেন্সের সবচেয়ে বড় অংশ।
-
ছোট ব্যবসার ক্ষেত্রে লাইসেন্স ফি সাধারণত ২০০ থেকে ২,০০০ টাকা।
-
মাঝারি ব্যবসার ক্ষেত্রে ৩,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
-
বড় ব্যবসা বা কোম্পানির ক্ষেত্রে ২৬,০০০ টাকা বা তার বেশি হতে পারে।
ব্যবসার মূলধন যত বেশি, লাইসেন্স ফিও তত বেশি হয়।
সাইনবোর্ড কর
যেসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সাইনবোর্ড থাকে, তাদের জন্য আলাদা কর যুক্ত হয়।
-
সাইনবোর্ডের আকার অনুযায়ী ফি নির্ধারিত হয়।
-
সাধারণভাবে লাইসেন্স ফি’র ওপর প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সাইনবোর্ড কর যোগ হতে পারে।
সাইনবোর্ড বড় হলে খরচও বাড়ে।
ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় ট্রেড লাইসেন্সের খরচ
গ্রাম বা ইউনিয়ন পর্যায়ের ব্যবসার ক্ষেত্রে খরচ তুলনামূলক কম।
-
ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় ট্রেড লাইসেন্স ফি সাধারণত ২৩০ টাকা থেকে ১,৫০০ টাকার মধ্যে হয়।
-
ছোট দোকান বা ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য এই হার প্রযোজ্য।
ট্রেড লাইসেন্সের খরচের একটি সহজ উদাহরণ
ধরা যাক, আপনি একটি ছোট দোকান চালু করবেন—
-
আবেদন ফরম ও লাইসেন্স বই: প্রায় ৬০ টাকা।
-
স্ট্যাম্প ফি: ২০০ টাকা।
-
লাইসেন্স ফি: ৫০০ টাকা।
-
সাইনবোর্ড কর: ১৫০ টাকা।
➡️ মোট আনুমানিক খরচ: প্রায় ৯০০ থেকে ১,০০০ টাকা।
অন্যদিকে, একটি বড় ব্যবসা বা কোম্পানির ক্ষেত্রে এই খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে।
অনলাইনে ট্রেড লাইসেন্স যাচাই করার প্রয়োজন কেন
ট্রেড লাইসেন্স করার পর বা কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসা করার আগে লাইসেন্স যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
-
ব্যবসাটি বৈধ কি না জানা যায়।
-
লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়েছে কি না বোঝা যায়।
-
ভুয়া বা বাতিল লাইসেন্স শনাক্ত করা যায়।
-
নবায়নের সময় হয়েছে কি না নিশ্চিত হওয়া যায়।
এই কারণেই অনলাইনে যাচাই এখন খুব প্রয়োজনীয় একটি কাজ।
ধাপে ধাপে অনলাইনে ট্রেড লাইসেন্স যাচাই করার নিয়ম
বর্তমানে সরকারি ই-ট্রেড লাইসেন্স সিস্টেমের মাধ্যমে অনলাইনে যাচাই করা যায়।
ধাপ ১ অনলাইন পোর্টালে প্রবেশ করা
প্রথমে ই-ট্রেড লাইসেন্স যাচাইয়ের জন্য নির্ধারিত সরকারি পোর্টালে প্রবেশ করতে হবে।
ধাপ ২ লাইসেন্স যাচাই অপশন নির্বাচন
পোর্টালে প্রবেশ করার পর “ট্রেড লাইসেন্স যাচাই” বা অনুরূপ অপশন নির্বাচন করতে হবে।
ধাপ ৩ প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান
এই ধাপে সাধারণত নিচের তথ্য দিতে হয়।
-
ট্রেড লাইসেন্স নম্বর।
-
প্রয়োজনে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম।
সব তথ্য নির্ভুলভাবে লিখতে হবে।
ধাপ ৪ যাচাই ফলাফল দেখা
তথ্য সাবমিট করার পর স্ক্রিনে লাইসেন্স সংক্রান্ত তথ্য দেখা যাবে।
-
ব্যবসার নাম।
-
মালিকের নাম।
-
ব্যবসার ধরন।
-
লাইসেন্সের বর্তমান অবস্থা।
-
নবায়নের শেষ তারিখ।
এই তথ্য দেখে সহজেই বোঝা যায় লাইসেন্সটি বৈধ ও কার্যকর কি না।
ট্রেড লাইসেন্সের মেয়াদ ও নবায়ন
ট্রেড লাইসেন্স সাধারণত—
-
এক বছরের জন্য ইস্যু করা হয়।
-
প্রতি বছর নবায়ন করা বাধ্যতামূলক।
-
মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নবায়ন না করলে লাইসেন্স বাতিল হতে পারে।
সাধারণত লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৩ মাসের মধ্যে নবায়ন করতে হয়।
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
ট্রেড লাইসেন্স করতে বা যাচাই করতে গিয়ে কিছু বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি।
-
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ছাড়া অন্য কারও মাধ্যমে লাইসেন্স না করা।
-
ফি সম্পর্কে আগেই পরিষ্কার ধারণা নেওয়া।
-
ভুয়া ওয়েবসাইটে তথ্য না দেওয়া।
-
সময়মতো লাইসেন্স নবায়ন করা।
এগুলো মানলে ভবিষ্যতে আইনি ঝামেলা এড়ানো যায়।
প্রশ্ন ও উত্তর
প্রশ্ন: ট্রেড লাইসেন্সের খরচ কি সারা দেশে এক?
উত্তর: না। এলাকা ও ব্যবসার ধরন অনুযায়ী খরচ ভিন্ন হয়।
প্রশ্ন: ছোট ব্যবসার জন্য সর্বনিম্ন কত টাকা লাগতে পারে?
উত্তর: ইউনিয়ন পর্যায়ে ছোট ব্যবসার ক্ষেত্রে ২৩০ টাকা থেকেও লাইসেন্স পাওয়া যায়।
প্রশ্ন: লাইসেন্স না করলে কী সমস্যা হতে পারে?
উত্তর: জরিমানা, ব্যবসা বন্ধ বা আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
উপসংহার
বাংলাদেশে ট্রেড লাইসেন্সের খরচ নির্দিষ্ট কোনো এক অংকে সীমাবদ্ধ নয়। এটি ব্যবসার ধরন, এলাকা ও মূলধনের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। ছোট ব্যবসার ক্ষেত্রে খরচ কম হলেও বড় ব্যবসা বা কোম্পানির ক্ষেত্রে খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হতে পারে। পাশাপাশি ব্যবসার স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অনলাইনে ট্রেড লাইসেন্স যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক নিয়ম মেনে লাইসেন্স করা ও নিয়মিত নবায়নই একজন সচেতন ব্যবসায়ীর দায়িত্ব।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
আরও পড়ুন-অনলাইনে ই-ট্রেড লাইসেন্স যাচাই করার নিয়ম(আপডেট)
👉🙏লেখার মধ্যে ভাষা জনিত কোন ভুল ত্রুটি হয়ে থাকলে অবশ্যই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
✅আজ এ পর্যন্তই ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন 🤔










