আমাদের Telegram চ্যানেলে যুক্ত হোন

পল্লী বিদ্যুতের মিটার স্থানান্তরের নিয়ম ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ আবেদন প্রক্রিয়া(আপডেট)

বাংলাদেশে অধিকাংশ গ্রাহক পল্লী বিদ্যুৎ সেবার আওতাভুক্ত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই তাদের বাড়ি সম্প্রসারণ করেন, নতুন ঘর তোলেন অথবা মিটারের বর্তমান অবস্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে নিতে চান। কিন্তু মিটার স্থানান্তর করতে গেলে কী কী নিয়ম মানতে হবে, কোথায় আবেদন করতে হবে, কোন কোন কাগজপত্র লাগবে—এসব বিষয়ে অনেকেই পরিষ্কার ধারণা রাখেন না।

এই ব্লগ পোস্টে আমরা পল্লী বিদ্যুতের মিটার স্থানান্তরের নিয়ম, কাগজপত্র, ফি, CMO অর্ডার, লাইনম্যান পরিদর্শন, এবং সম্পূর্ণ আবেদন প্রক্রিয়া—সবকিছু একেবারে সহজ ভাষায় ধাপে ধাপে ব্যাখ্যা করেছি।

আরও পড়ুন-অনলাইনে পুরাতন বিদ্যুৎ মিটার পরিবর্তনের আবেদন করার নিয়ম

মিটার স্থানান্তরের প্রয়োজন হয় কেন?

মিটার স্থানান্তরের বেশ কিছু সাধারণ কারণ রয়েছে। যেমন:

  • নতুন ভবন নির্মাণ বা ঘর সম্প্রসারণ।

  • বর্তমান মিটার ঝুঁকিপূর্ণ বা বৃষ্টির সংস্পর্শে থাকা।

  • ঘরের ভেতরের মিটার বাইরে নেওয়া।

  • সঠিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

  • সার্ভিস ড্রপ তারের লম্বা/ছোট হওয়া।

  • অন্যত্র বিদ্যুৎ ব্যবহার চালু করার প্রয়োজন।

মিটার স্থানান্তর একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া, তবে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করেই এটি করা হয়।

প্রথম ধাপ: নতুন স্থানে সঠিকভাবে ওয়্যারিং প্রস্তুত করা

মিটার যেই স্থানে নিতে চান, সেই নতুন জায়গায় অবশ্যই সঠিকভাবে ওয়ারিং করতে হবে। এই ওয়ারিং করতে হবে পল্লী বিদ্যুতের অনুমোদিত ইলেকট্রিশিয়ান দ্বারা।

ওয়ারিং করার সময় যেসব বিষয় অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে
  • নতুন মিটারের অবস্থান থেকে নিকটস্থ পল্লী বিদ্যুৎ খুঁটি বা পোল ১৩০ ফুট এর মধ্যে থাকতে হবে।

  • যদি দূরত্ব ১৩০ ফুটের বেশি হয়, তাহলে মিটার স্থানান্তর অনুমোদন পেতে সমস্যা হতে পারে বা অতিরিক্ত খরচ লাগতে পারে।

  • ওয়ারিং কাজ সম্পূর্ণ শেষ হলে ইলেকট্রিশিয়ানকে ওয়ারিং রিপোর্ট তৈরি করতে হবে।

  • সার্ভিস ড্রপ তার ছোট বা বড় লাগলে রিপোর্টে উল্লেখ করতে হবে।

ওয়ারিং রিপোর্ট হলো মূল ডকুমেন্ট, যার ভিত্তিতে পল্লী বিদ্যুৎ অফিস সমীক্ষা করে।

সার্ভিস ড্রপ তার সংগ্রহ – ফ্রি নাকি কেনা লাগবে?

অনেকে মনে করেন সার্ভিস তার নিজের খরচে কিনতে হয়। আসলে নিয়ম হলো—

  • সার্ভিস ড্রপ তার পল্লী বিদ্যুৎ অফিস থেকে ফ্রি দেওয়া হয়।

  • যদি অফিসে সাময়িকভাবে তার না থাকে, সেক্ষেত্রে গ্রাহক বাজার থেকে সার্ভিস ড্রপ তার কিনতে পারেন।

  • তবে অফিস পরে সেই তারের মূল্য বিদ্যুৎ বিল থেকে বিয়োগ করে দেবে।

  • কেউ যদি সার্ভিস ড্রপ তারের নামে টাকা চাইলে, অবশ্যই সরকারি রশিদ ছাড়া টাকা দেবেন না।

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যা অনেক গ্রাহক জানেন না।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করা

মিটার স্থানান্তরের আবেদন করার আগে প্রয়োজনীয় কিছু ডকুমেন্ট প্রস্তুত রাখতে হবে।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র:

✔ সর্বশেষ পরিশোধিত বিদ্যুৎ বিলের ফটোকপি।
✔ একটি রঙিন পাসপোর্ট সাইজ ছবি।
✔ ভোটার আইডি কার্ডের কপি।
✔ ওয়ারিং রিপোর্ট।
✔ প্রয়োজনে বাড়ির মালিকানা সংক্রান্ত কাগজ।

এই কাগজপত্র দিয়ে পল্লী বিদ্যুতের অফিসে সহজেই আবেদন করা যায়।

পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে ফর্ম পূরণ ও ইস্টিমেট গ্রহণ

সব কাগজপত্র সংগ্রহ করার পর আপনার সংশ্লিষ্ট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি অফিসে যেতে হবে। সেখানে গিয়ে:

যে কাজগুলো করতে হবে—

  • এক অবস্থানে সেবা (One-Stop Service) কাউন্টারে যেতে হবে।
  • মিটার স্থানান্তরের বিষয়টি জানাতে হবে।
  • প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হবে।
  • নির্দিষ্ট ফর্ম পূরণ করতে হবে।
  • অফিসার আপনার আবেদন যাচাই করে ইস্টিমেট/সমীক্ষা ফি নির্ধারণ করবেন।

সাধারণত সমীক্ষা ফি খুবই কম:

সমীক্ষা ফি: ৪১৪ টাকা

এই ফি আপনাকে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ক্যাশ শাখায় জমা দিতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:

  • টাকা জমা দিলে রশিদ অবশ্যই সংগ্রহ করবেন

  • রশিদ ছাড়া কাউকে কোন অর্থ প্রদান করবেন না

এটি ভবিষ্যতে যেকোনো সমস্যায় প্রমাণ হিসেবে কাজে লাগবে।

সমীক্ষা / পরিদর্শন (Survey) প্রক্রিয়া

টাকা জমা দেওয়ার পর সাধারণত ২–৩ দিনের মধ্যে পল্লী বিদ্যুতের টেকনিক্যাল টিম আপনার বাড়িতে এসে সমীক্ষা করবে।

সমীক্ষা দল যা যা দেখে—

  • ওয়ারিং সঠিক হয়েছে কি না

  • সার্ভিস ড্রপ তার ছোট/বড় লাগবে কি না

  • মিটারের নতুন স্থান নিরাপদ কি না

  • পোল থেকে দূরত্ব ১৩০ ফুটের মধ্যে কি না

  • কোন ধরনের ঝুঁকি আছে কি না

অনেক সময় অফিসের ব্যস্ততার কারণে সমীক্ষা না-ও হতে পারে। তবে আপনার ডকুমেন্ট ও রিপোর্ট সঠিক হলে আবেদন অনুমোদন হয়ে যায়।

আবেদন অনুমোদন ও CMO (Customer Meter Order) ইস্যু করা

সমীক্ষা (অথবা ডকুমেন্ট যাচাই) সঠিক হলে অফিস থেকে আবেদনটি অনুমোদন করা হয়।

এরপর তারা একটি অর্ডার প্রস্তুত করে, যাকে বলা হয়—

CMO (Customer Meter Order)

এটি হচ্ছে অফিসিয়াল অর্ডার যেখানে জানানো থাকে যে গ্রাহকের মিটার স্থানান্তর অনুমোদিত হয়েছে এবং লাইনম্যান পাঠানো হবে।

CMO ছাড়া মিটার স্থানান্তর করা হয় না।

লাইনম্যান পাঠানো ও মিটার স্থানান্তর সম্পন্ন করা

CMO ইস্যুর ৩–৫ দিনের মধ্যে আপনার এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত লাইনম্যানকে পাঠানো হয়।

লাইনম্যান যা করেন—

  • পুরোনো জায়গা থেকে মিটার খোলা।

  • নতুন জায়গায় সঠিকভাবে মিটার ইনস্টল করা।

  • সার্ভিস ড্রপ তার লাগানো।

  • সংযোগ টেস্ট করা।

  • মিটার নম্বর ও সংযোগ যাচাই করা।

  • প্রয়োজন হলে নতুন তার ব্যবহার করা।

মোট প্রক্রিয়াটি সাধারণত ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা সময় নেয়।

আপনি চাইলে কাজ শেষে লাইনম্যানের দেওয়া তথ্য রশিদ বা নথিপত্র রেখে দিতে পারেন।

পল্লী বিদ্যুতের মিটার স্থানান্তরে সময় কত লাগে?

সাধারণত পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে সময় লাগে—

ধাপ সময়
ওয়ারিং করানো ১ দিন
কাগজপত্র প্রস্তুত ১ দিন
অফিসে আবেদন + ফি জমা যেকোনো দিন
সমীক্ষা/পরিদর্শন ২–৩ দিন
CMO ইস্যু ১–২ দিন
লাইনম্যান দ্বারা স্থানান্তর ৩–৫ দিন

মোট আনুমানিক সময়: ৭–১০ দিন

(অফিস ব্যস্ত থাকলে কিছুটা বেশি সময় লাগতে পারে)

গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা

✔ সার্ভিস ড্রপ তারের নামে কেউ রশিদ ছাড়া টাকা চাইলে দেবেন না
✔ সবসময় অনুমোদিত ইলেকট্রিশিয়ান দ্বারা ওয়ারিং করান
✔ মিটার নতুন স্থানে নিরাপদ উচ্চতায় বসানো উচিত
✔ ঝড়–বৃষ্টি বা পানির স্পর্শ থেকে দূরে রাখতে হবে
✔ সংযোগ নেওয়ার পর অনলাইনে বিল চেক করে নিশ্চিত হতে পারেন

প্রশ্নোত্তর

১. মিটার স্থানান্তর করতে কত টাকা লাগে?

সরকারি সমীক্ষা ফি মাত্র ৪১৪ টাকা
আর কোন অতিরিক্ত চার্জ অফিস রশিদ ছাড়া নেওয়ার নিয়ম নেই।

২. মিটার অন্য বাড়িতে স্থানান্তর করা যাবে কি?

একই হোল্ডিংয়ের মধ্যে সাধারণত অনুমোদন পাওয়া যায়।
অন্য বাড়ি/জমিতে নিতে চাইলে মালিকানা কাগজ দিতে হবে।

৩. সার্ভিস ড্রপ তার সত্যি কি ফ্রি?

হ্যাঁ, পল্লী বিদ্যুৎ অফিস তার ফ্রি দেয়।
তারা না থাকলে গ্রাহক কিনে আনতে পারেন, পরে অফিস বিল থেকে বিয়োগ করে দেয়।

৪. লাইনম্যান টিপস নেওয়া বাধ্যতামূলক কি?

না। সরকারি কাজে কোন টিপস বাধ্যতামূলক নয়।

৫. আবেদন কি অনলাইনে করা যায়?

বর্তমানে মিটার স্থানান্তর সম্পর্কিত আবেদন সরাসরি অফিসে গিয়ে করতে হয়।

উপসংহার

পল্লী বিদ্যুতের মিটার স্থানান্তর একটি সহজ এবং সরকারি নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়া। সঠিকভাবে ওয়ারিং করানো, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ, ফি জমা এবং CMO অনুমোদনের মাধ্যমেই মিটার নিরাপদে ও ঝামেলামুক্তভাবে স্থানান্তর করা যায়। রশিদ ছাড়া কখনোই কাউকে টাকা না দেওয়া এবং অনুমোদিত ইলেকট্রিশিয়ানের সেবা নেওয়া মিটার স্থানান্তরকে আরও নিরাপদ ও সঠিক করে।

পল্লী বিদ্যুৎ গ্রাহক হিসেবে নিয়ম মেনে আবেদন করলে খুব সহজেই ৭–১০ দিনের মধ্যেই আপনার মিটার নতুন স্থানে স্থানান্তর হয়ে যাবে।

আপনার যদি আরও কোনো গাইড বা লিখন প্রয়োজন হয়, জানাতে পারেন।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

আরও পড়ুন-কোন দেশের ভিসা সহজ, জীবনযাপন আরামদায়ক এবং বেতন সর্বোচ্চ

👉🙏লেখার মধ্যে ভাষা জনিত কোন ভুল ত্রুটি হয়ে থাকলে অবশ্যই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।

✅আজ এ পর্যন্তই ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন 🤔

📌 পোস্টটি শেয়ার করুন! 🔥

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমতুল্লাহ। আমি মোঃ সানাউল বারী। পেশায় আমি একজন চাকরিজীবী এবং এই ওয়েবসাইটের এডমিন। চাকরির পাশাপাশি, আমি গত ১৪ বছর ধরে আমার নিজস্ব ওয়েবসাইটে লেখালেখি করছি এবং আমার নিজস্ব ইউটিউব এবং ফেসবুকে কন্টেন্ট তৈরি করছি। বিশেষ দ্রষ্টব্য - লেখায় যদি কোনও ভুল থাকে, তাহলে দয়া করে আমাকে ক্ষমা করে দিন। ধন্যবাদ।