ব্যবসা শুরু করতে বা ব্যবসাকে “আইনগতভাবে বৈধ” রাখতে ট্রেড লাইসেন্স হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাগজগুলোর একটি। আগে ট্রেড লাইসেন্স মানেই ছিল দপ্তরে দপ্তরে দৌড়, কাগজ জমা, লাইন, আর বারবার তথ্য সংশোধন। এখন পরিস্থিতি অনেকটাই বদলেছে। বাংলাদেশে ই-ট্রেড লাইসেন্স বা অনলাইন ট্রেড লাইসেন্স সিস্টেম চালু থাকায় ঘরে বসেই আবেদন করা যায়—বিশেষ করে সিটি কর্পোরেশন এলাকাগুলোতে।
এই পোস্টে আপনি জানতে পারবেন—ই-ট্রেড লাইসেন্স কী, কার জন্য দরকার, কোন ডকুমেন্ট লাগবে, ধাপে ধাপে অনলাইনে আবেদন করার নিয়ম, ফি ও সময়, আর বাংলাদেশের সব সিটি কর্পোরেশনের অনলাইন আবেদন/ফর্মের ওয়েবসাইট লিংক।
আরও পড়ুন-ভুলে ড্রাইভিং লাইসেন্স বাসায় রেখে আসলে জরিমানা দিতে হবে কিনা?
ই-ট্রেড লাইসেন্স কী, আর কেন দরকার
ই-ট্রেড লাইসেন্স হলো ট্রেড লাইসেন্সের ডিজিটাল সংস্করণ—যেখানে আবেদন, যাচাই, ফি পরিশোধ, এবং অনেক ক্ষেত্রেই লাইসেন্স ডাউনলোড/প্রিন্ট—সবকিছু অনলাইনে করা যায়।
এটা যেসব কাজে লাগে—
-
ব্যবসা বৈধভাবে পরিচালনা করা।
-
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, পেমেন্ট গেটওয়ে, টেন্ডার, ভ্যাট/ট্যাক্স সংক্রান্ত কাজ।
-
বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অনুমোদন ও সার্ভিস নেওয়া।
কারা অনলাইনে আবেদন করবেন
আপনার ব্যবসা যদি সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, বা ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় হয়—তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত পোর্টাল/সিস্টেমে আবেদন করতে হবে।
-
ঢাকা উত্তর/দক্ষিণ: আলাদা “ই-রেভিনিউ” পোর্টাল আছে।
-
কিছু সিটি কর্পোরেশনে নিজস্ব ই-ট্রেড পোর্টাল আছে।
-
অনেক ক্ষেত্রে সরকারি ফর্ম পোর্টাল বা কেন্দ্রীয় ই-ট্রেড সিস্টেম ব্যবহার করা হয়।
আবেদন করার আগে যে কাগজপত্র প্রস্তুত রাখবেন
আবেদন দ্রুত শেষ করতে আগে থেকেই পরিষ্কার স্ক্যান/ছবি করে রাখুন—
-
মালিক/আবেদনকারীর তথ্য
-
পাসপোর্ট সাইজ ছবি (সাধারণত ২–৩ কপি চাওয়া হয়)
-
জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)
-
ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা প্রমাণ
-
ভাড়া হলে: ভাড়ার চুক্তিপত্র
-
নিজস্ব হলে: জমির পর্চা/দাখিলা বা মালিকানার কাগজ
-
হোল্ডিং ট্যাক্স / হালনাগাদ কর রশিদ
-
অনেক সিটি কর্পোরেশন লাইসেন্স ইস্যুর আগে হোল্ডিং ট্যাক্স আপডেট দেখতে চায়।
-
বিশেষ ব্যবসা হলে অতিরিক্ত লাইসেন্স
-
ফার্মেসি: ড্রাগ লাইসেন্স
-
দাহ্য পদার্থ/কারখানা ধরনের ব্যবসা: ফায়ার লাইসেন্স (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)
-
লিমিটেড কোম্পানি হলে
-
মেমোরেন্ডাম/আর্টিকেলস
-
ইনকর্পোরেশন সার্টিফিকেট
ই-ট্রেড লাইসেন্স করার নিয়ম
বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু করতে বা চলমান ব্যবসাকে নিয়মের মধ্যে রাখতে ট্রেড লাইসেন্স সবচেয়ে জরুরি কাগজগুলোর একটি। আগে ট্রেড লাইসেন্স মানেই ছিল অফিসে যাওয়া, ফাইল জমা, লাইনে দাঁড়ানো—কিন্তু এখন অনেক এলাকায় অনলাইনে আবেদন করা যায়। বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ/স্থানীয় সরকার কাঠামোর অধীনে বিভিন্ন সনদ সেবার মতো ট্রেড লাইসেন্সও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আবেদনযোগ্য হয়েছে।
ধাপ ১: ওয়েবসাইটে প্রবেশ
প্রথমে গুগলে গিয়ে সার্চ করুন eprottoyon.com। অফিসিয়াল ওয়েবসাইটটি আপনার সামনে চলে আসবে।
ধাপ ২: রেজিস্ট্রেশন অপশনে যান
ওয়েবসাইটের টপ কর্নারে Register/রেজিস্টার অপশন পাবেন। সেখানে ক্লিক করুন।![]()
ধাপ ৩: নাগরিক একাউন্ট তৈরি করুন
“নাগরিক একাউন্ট তৈরি করুন” ফর্মে আপনার বিভাগ, জেলা, থানা, ইউনিয়ন—এগুলো সিলেক্ট করে নাম, ইমেইল, মোবাইল নম্বর, পাসওয়ার্ড, কনফার্ম পাসওয়ার্ড দিয়ে নিবন্ধন করুন। (আপনার স্ক্রিনে যেভাবে আসবে, সেই অনুযায়ী ইনফো পূরণ করবেন।)
ধাপ ৪: ইমেইল/মোবাইল ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করুন
রেজিস্ট্রেশনের পর ভেরিফিকেশনের জন্য একটি কোড আসে। সেই কোড বসিয়ে Verify/ভেরিফাই করুন বাটনে ক্লিক করলে একাউন্ট অ্যাকটিভ হবে।
ধাপ ৫: ‘সনদের জন্য আবেদন’ থেকে ‘ট্রেড লাইসেন্স’ নির্বাচন
লগইন করে প্রোফাইলে ঢুকে মেনু থেকে “সনদের জন্য আবেদন” অপশন নির্বাচন করুন। ডান পাশে সার্ভিস লিস্ট/মেনু আসবে। সেখান থেকে “ট্রেড লাইসেন্স” সিলেক্ট করুন।
গুরুত্বপূর্ণ: অনেক সিস্টেমে আবেদন করার আগে প্রোফাইলের তথ্য (ঠিকানা ইত্যাদি) পূরণ করে “Profile 100%” করতে বলা থাকে। তাই প্রোফাইল অসম্পূর্ণ থাকলে আগে সেটি ঠিক করে নিন।
ধাপ ৬: আবেদন ফর্ম পূরণ করে সংরক্ষণ করুন
এখন আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হবে। এখানে ট্রেড লাইসেন্স সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করুন। শেষে টিক মার্ক দিয়ে “সংরক্ষণ করুন/Save” অপশনে ক্লিক করুন।
ধাপ ৭: ব্যবসা সংক্রান্ত তথ্য ও অর্থবছর ঠিক করুন
ফর্মের ভেতরে সাধারণত ব্যবসা সংক্রান্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ থাকে—
-
ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম।
-
ব্যবসার প্রকৃতি/ধরন।
-
ব্যবসার ঠিকানা।
-
অর্থবছর (চলতি/বকেয়া) এ ধরনের সিস্টেমে ফি অংশে ভ্যাট যুক্ত হতে পারে—অনেক জায়গায় মোট ফিতে ১৫% ভ্যাট দেখানো থাকে।
ধাপ ৮: প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট/ছবি আপলোড করুন
ফর্মে যেখানে “Attachment/ডকুমেন্ট আপলোড” অপশন থাকবে—সেখানে NID, ছবি, ঠিকানার প্রমাণ, হোল্ডিং ট্যাক্স রশিদ (প্রযোজ্য হলে) আপলোড করুন।
ডকুমেন্ট আপলোড করার সময় খেয়াল রাখুন—
-
ছবি/স্ক্যান যেন ঝাপসা না হয়।
-
NID নাম ও জন্মতারিখের সঙ্গে আবেদনকারীর তথ্য যেন মিলে।
-
ফাইল সাইজ বেশি হলে কমিয়ে আপলোড দিন।
ধাপ ৯: আবেদন সাবমিট করুন এবং আবেদন আইডি/রেফারেন্স নম্বর সংরক্ষণ করুন
সব তথ্য ঠিক থাকলে Submit/আবেদন জমা দিন বাটনে ক্লিক করুন। জমা দেওয়ার পর একটি Application ID / Reference Number তৈরি হয়।
এটা স্ক্রিনশট দিয়ে রাখুন বা লিখে রাখুন—পরে ট্র্যাকিং/ফি পেমেন্ট/ডাউনলোডে কাজে লাগবে।
ধাপ ১০: আবেদন যাচাই হবে—তারপর এসএমএসে ফি জানাবে
আবেদন জমার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ/দপ্তর আবেদন যাচাই করে। যাচাই শেষ হলে সাধারণত আপনার মোবাইলে এসএমএস/নোটিফিকেশন আসে—এতে কত টাকা ফি দিতে হবে, কীভাবে দিতে হবে, এসব নির্দেশনা থাকে।
ধাপ ১১: অনলাইনে ফি প্রদান (bKash/Nagad/Card)
এসএমএস পাওয়ার পর আপনার ড্যাশবোর্ডে গিয়ে Fee Payment/ফি প্রদান অপশনে ঢুকুন। সাধারণত যে পেমেন্ট মেথডগুলো থাকে—
-
বিকাশ
-
নগদ
-
ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড
এর যেকোনো একটি দিয়ে পেমেন্ট সম্পন্ন করুন।
ধাপ ১২: লাইসেন্স ডাউনলোড/প্রিন্ট অথবা সংগ্রহ
ফি পরিশোধ সফল হলে ড্যাশবোর্ডে Download/Print অপশন সক্রিয় হয় (অনেক এলাকায় ডিজিটাল কপি ডাউনলোড করা যায়)।
কিছু এলাকায় আবার অফিস থেকে সিল-স্বাক্ষরসহ কপি সংগ্রহের নির্দেশনা থাকতে পারে—সে ক্ষেত্রে ড্যাশবোর্ডে যে নির্দেশনা থাকবে সেটাই ফলো করবেন।
খরচ কত হতে পারে, কত দিনে পাওয়া যায়
খরচ ব্যবসার ধরন, এলাকা, অর্থবছর/বকেয়া এবং ভ্যাটসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। কোথাও ফি কম, কোথাও তুলনামূলক বেশি।
আবেদনে ভুল না থাকলে সাধারণভাবে কয়েক কর্মদিবসের মধ্যে প্রসেস হয়—তবে যাচাই-বাছাই ও দপ্তরভেদে সময় বাড়তেও পারে।
বাংলাদেশের সব সিটি কর্পোরেশনের অনলাইন আবেদন/ফর্ম লিংক
নিচে সিটি কর্পোরেশন অনুযায়ী অনলাইনে আবেদন/ফর্মের লিংক দেওয়া হলো—
-
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (DNCC)
-
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (DSCC)
-
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (Chattogram/CCC)
-
খুলনা সিটি কর্পোরেশন (KCC)
-
রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন (RCC)
-
সিলেট সিটি কর্পোরেশন (SCC)
-
(ডিজিটাল ট্রেড লাইসেন্স পোর্টাল) https://tradelicence.scc.gov.bd/
-
(ফর্ম পেজ) https://forms.portal.gov.bd/site/view/form-page/38eb3816-86d7-479b-b282-34535f329b27
-
বরিশাল সিটি কর্পোরেশন (BCC)
-
(ই-ট্রেড পোর্টাল) https://etrade.barishalcity.gov.bd/
-
(ফর্ম পেজ) https://forms.portal.gov.bd/site/view/form-page/0c121ca0-6d47-4c8c-ba3a-14644bfbd9b7
-
রংপুর সিটি কর্পোরেশন (RpCC)
-
কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন (CoCC)
-
গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন (GCC)
-
নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (NCC)
-
(ফর্ম/ক্যাটাগরি থেকে সিটি কর্পোরেশন সেকশনে সার্চ করে নিতে পারেন) https://forms.portal.gov.bd/site/view/category_content/সিটি_কর্পোরেশন
-
ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশন (MCC)
👉 কেন্দ্রীয় সরকারি ই-ট্রেড লাইসেন্স সিস্টেম (যদি আপনার এলাকায় সাপোর্টেড থাকে)
আবেদন করার সময় যে ভুলগুলো এড়াবেন
-
NID নাম/জন্মতারিখের সাথে ফর্মের তথ্য না মিললে ভেরিফিকেশন আটকে যায়।
-
ঠিকানা/ওয়ার্ড ভুল দিলে পরে সংশোধনে সময় লাগে।
-
ঝাপসা ছবি/ডকুমেন্ট দিলে “Query” আসার সম্ভাবনা বেশি।
-
হোল্ডিং ট্যাক্স আপডেট না থাকলে অনেক এলাকায় লাইসেন্স ইস্যু/রিনিউ আটকে যায়।
প্রশ্ন–উত্তর
প্রশ্ন ১: ট্রেড লাইসেন্স কি অনলাইনে পুরোপুরি ডাউনলোড করা যাবে?
অনেক সিটি কর্পোরেশনে ফি পরিশোধের পর ডাউনলোড/প্রিন্ট অপশন থাকে। কিছু ক্ষেত্রে সিল-স্বাক্ষরসহ কপি অফিস থেকে নিতে হতে পারে।
প্রশ্ন ২: একবার লাইসেন্স হলে কি প্রতি বছর নবায়ন লাগে?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নবায়ন প্রয়োজন হয়। নবায়নের নিয়ম ও ফি সিটি কর্পোরেশনভেদে ভিন্ন।
প্রশ্ন ৩: দোকান ভাড়া হলে কোন কাগজ সবচেয়ে জরুরি?
ভাড়ার চুক্তিপত্র/মালিকের সম্মতিপত্র + ঠিকানা প্রমাণ—এগুলো সাধারণত লাগে।
প্রশ্ন ৪: অনলাইনে আবেদন করলে কতদিনে হবে?
ঠিক কাগজপত্র থাকলে অনেক ক্ষেত্রে ৩–৭ কর্মদিবসে প্রসেস হয়। তবে ভেরিফিকেশন বা কাগজে সমস্যা থাকলে সময় বাড়তে পারে।
উপসংহার
ই-ট্রেড লাইসেন্স এখন আগের মতো কঠিন কোনো বিষয় না—ঠিক ডকুমেন্ট প্রস্তুত রেখে সঠিক পোর্টালে আবেদন করলেই বেশিরভাগ কাজ ঘরে বসে শেষ করা যায়। আপনার ব্যবসা যে সিটি কর্পোরেশনের অধীনে, সেই অনুযায়ী উপরের লিংক থেকে আবেদন শুরু করুন, আর তথ্য মিলিয়ে সাবমিট করুন। এতে সময়ও বাঁচবে, ঝামেলাও কমবে।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
আরও পড়ুন-ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকালে জরিমানা কত?
👉🙏লেখার মধ্যে ভাষা জনিত কোন ভুল ত্রুটি হয়ে থাকলে অবশ্যই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
✅আজ এ পর্যন্তই ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন 🤔










