দেশজুড়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করায় এবার সরাসরি ঝুঁকিতে পড়েছে মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবা। টেলিকম অপারেটররা সতর্ক করে বলছে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে ডিজিটাল অর্থনীতির বড় অংশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
আরও পড়ুনঃ আইফোনে গোপন নজরদারি ধরার ৫ উপায় কমলা সবুজ ডট দেখলেই সতর্ক হোন
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) বরাবর পাঠানো এক জরুরি চিঠিতে মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (এএমটিওবি) এই উদ্বেগজনক তথ্য তুলে ধরেছে। তারা বলছে, বিদ্যুৎ ঘাটতি ও জ্বালানির অপ্রতুলতায় মোবাইল নেটওয়ার্ক সচল রাখা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন ৫ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকায় অপারেটরদের বাধ্য হয়ে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে ব্যয় যেমন বাড়ছে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে এই ব্যবস্থা টেকসই নয় বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এএমটিওবির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র বেস ট্রান্সসিভার স্টেশন বা বিটিএস টাওয়ার চালু রাখতে প্রতিদিন ৫২ হাজার লিটারের বেশি ডিজেল এবং প্রায় ২০ হাজার লিটার অকটেন খরচ হচ্ছে। এই বিপুল জ্বালানি ব্যবহার দেশের বর্তমান সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
অপারেটরভিত্তিক হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের সবচেয়ে বড় অপারেটর গ্রামীণফোন প্রতিদিন প্রায় ২৮ হাজার লিটার ডিজেল এবং ৯ হাজার লিটারের বেশি অকটেন ব্যবহার করছে। অন্যদিকে রবি আজিয়াটা ব্যবহার করছে ১৩ হাজার লিটার ডিজেল ও ৫ হাজার ৬০০ লিটার অকটেন। আর বাংলালিংক তাদের নেটওয়ার্ক সচল রাখতে প্রতিদিন ১১ হাজার লিটারের বেশি ডিজেল এবং প্রায় ৫ হাজার লিটার অকটেন খরচ করছে।
তবে শুধু টাওয়ার নয়, সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে ডেটা সেন্টার ও সুইচিং ফ্যাসিলিটিগুলো। টেলিকম নেটওয়ার্কের এই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোই মূলত পুরো সিস্টেমের ‘মস্তিষ্ক’ হিসেবে কাজ করে। এখান থেকেই কল, ইন্টারনেট ও ডেটা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
এএমটিওবির তথ্যমতে, প্রতিটি ডেটা সেন্টার সচল রাখতে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। ফলে দিনে একটি সেন্টার চালাতেই প্রায় ৪ হাজার লিটার জ্বালানি লাগে। বর্তমানে ডেটা সেন্টার ও সুইচিং হাব মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২৭ হাজার লিটারের বেশি জ্বালানি ব্যবহার হচ্ছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে এভাবে ব্যাকআপ জ্বালানির ওপর নির্ভর করে টেলিকম অবকাঠামো চালানো সম্ভব নয়। এতে যেকোনো সময় বড় ধরনের নেটওয়ার্ক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
এএমটিওবির মহাসচিব লে. কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার বলেন, বিদ্যুৎ বা জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে ডেটা সেন্টার বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা পুরো নেটওয়ার্কে দ্রুত প্রভাব ফেলবে। এর ফলে কল, ইন্টারনেট ও এসএমএসসহ সব ধরনের সেবা আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
তিনি আরও জানান, ডেটা সেন্টার থেকেই ইন্টারনেট ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তাই এটি অচল হলে ইন্টারনেট ধীরগতির হয়ে যেতে পারে বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়বে মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন লেনদেন, ই-কমার্স এবং ওটিপি নির্ভর সেবাগুলোর ওপর।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোবাইল নেটওয়ার্কে বিঘ্ন ঘটলে শুধু যোগাযোগই বন্ধ হবে না, বরং জরুরি সেবা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং সরকারি ডিজিটাল কার্যক্রমও ব্যাহত হবে। ফলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বাংলাদেশের দ্রুত বিকাশমান ডিজিটাল অর্থনীতি বর্তমানে মোবাইল ইন্টারনেটের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। মোবাইল ব্যাংকিং, রাইড শেয়ারিং, অনলাইন কেনাকাটা এবং ক্লাউডভিত্তিক ব্যবসা সবকিছুই নিরবচ্ছিন্ন নেটওয়ার্ক সেবার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। দীর্ঘ সময় নেটওয়ার্ক বন্ধ থাকলে আর্থিক লেনদেন ব্যাহত হওয়া থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা দিতে পারে।
এদিকে জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও নতুন সমস্যা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় পাম্পগুলোতে পর্যাপ্ত জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না, আবার এক জেলা থেকে অন্য জেলায় জ্বালানি পরিবহনেও নানা বাধা তৈরি হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে সরবরাহে বিলম্ব হচ্ছে বলে জানিয়েছে অপারেটররা।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, অনেক গুরুত্বপূর্ণ টেলিকম স্থাপনায় বর্তমানে খুব কম জ্বালানি মজুত রয়েছে, যা যেকোনো সময় বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় অপারেটররা কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ টেলিকম স্থাপনায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, মোবাইল টাওয়ারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ দেওয়া এবং ডিপো থেকে সরাসরি জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা।
এছাড়া জরুরি টেলিকম সেবার জন্য জ্বালানি পরিবহন যেন বাধাহীনভাবে করা যায়, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দ্রুত নির্দেশ দেওয়ার অনুরোধও জানিয়েছে এএমটিওবি।
সংগঠনটি আরও জানিয়েছে, দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা, জননিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমের জন্য টেলিকম নেটওয়ার্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই দীর্ঘ সময় এ সেবা বিঘ্নিত হলে এর ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া কঠিন হবে।
এ প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং মোবাইল অপারেটরদের সমন্বয়ে দ্রুত একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক আয়োজনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে দেশে প্রায় ৪৬ হাজারের বেশি টেলিকম টাওয়ার রয়েছে, যা প্রায় ১৮ কোটির বেশি গ্রাহককে সেবা দিচ্ছে। পাশাপাশি রয়েছে প্রায় ২৭টি ডেটা সেন্টার, যা দেশের ডিজিটাল অবকাঠামোর মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছে।
আরও পড়ুন- ১৩ বছরের আগেই স্মার্টফোন দিচ্ছেন সন্তানের হাতে গবেষণায় মিলল বড় সতর্কবার্তা
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
👉🙏লেখার মধ্যে ভাষা জনিত কোন ভুল ত্রুটি হয়ে থাকলে অবশ্যই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
✅আজ এ পর্যন্তই ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন 🤔








