আমাদের Telegram চ্যানেলে যুক্ত হোন

বাংলাদেশে একের পর এক উপদেষ্টা লাল কূটনৈতিক পাসপোর্ট ফেরত দিয়ে সাধারণ পাসপোর্টের আবেদন

বাংলাদেশে লাল রঙের সরকারি ও কূটনৈতিক পাসপোর্ট সবসময়ই বিশেষ মর্যাদা ও ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি, উপদেষ্টা, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এই পাসপোর্ট ব্যবহার করে থাকেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক উপদেষ্টার লাল পাসপোর্ট জমা দিয়ে সাধারণ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করার ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

এই তালিকায় সর্বশেষ যুক্ত হয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার। তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করে তার লাল রঙের সরকারি পাসপোর্ট ফেরত দিয়ে সাধারণ পাসপোর্ট পেতে উদ্যোগ নিয়েছেন। এর আগে আরও দুই ছাত্র উপদেষ্টা এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী খোদা বকশ চৌধুরী একই ধরনের আবেদন করেছিলেন।

এই ঘটনাগুলো শুধু প্রশাসনিক নয়, বরং রাজনৈতিক ও নীতিগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

আরও পড়ুন-১০ বছর মেয়াদি ই-পাসপোর্ট করতে কি কি লাগে?

লাল পাসপোর্ট কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ

লাল রঙের পাসপোর্ট মূলত কূটনৈতিক বা সরকারি পাসপোর্ট, যা রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের জন্য বরাদ্দ থাকে। এই পাসপোর্টধারীরা অনেক দেশে ভিসা সুবিধা, দ্রুত ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স এবং কূটনৈতিক মর্যাদা পেয়ে থাকেন।

তবে এই পাসপোর্ট কেবল দায়িত্বকালীন সময়ের জন্যই বৈধ। দায়িত্ব শেষ হলে নিয়ম অনুযায়ী এটি ফেরত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দারের আবেদন

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, চলতি মাসেই অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাধারণ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছেন। তিনি ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে তার লাল পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন।

যদিও বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে খুব বেশি আলোচনায় আসেনি, তবে প্রশাসনের ভেতরে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে এ নিয়ে নীরব আলোচনা চলছে।

অনেকে মনে করছেন, এটি কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

কেন উপদেষ্টারা আগেভাগেই লাল পাসপোর্ট ফেরত দিচ্ছেন

সাবেক সচিব ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞ এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদারের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষের পথে। সামনে নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। এই সময়ে অনেক উপদেষ্টা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ভবিষ্যৎ ঝামেলা এড়াতে আগেভাগেই সরকারি পাসপোর্ট ফেরত দিয়ে দিচ্ছেন।

তার ভাষায়,

“বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় অনেকেই চাইছেন প্রশাসনিক জটিলতা থেকে দূরে থাকতে। তাই আগেভাগেই লাল পাসপোর্ট জমা দিয়ে সাধারণ পাসপোর্টের আবেদন করছেন।”

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, খুব শিগগিরই আরও অনেক সাবেক উপদেষ্টা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি একই পথে হাঁটতে পারেন।

সাধারণ পাসপোর্ট পেতে কেন দেরি হয়

অনেকে মনে করেন, লাল পাসপোর্ট জমা দিলেই সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ পাসপোর্ট পাওয়া যাবে। বাস্তবে বিষয়টি মোটেও এত সহজ নয়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিধান অনুযায়ী—

  • সাবেক উপদেষ্টা

  • সাবেক মন্ত্রী

  • সাবেক সংসদ সদস্য

  • সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সহকারীরা

এই শ্রেণির কেউ সাধারণ পাসপোর্টের আবেদন করলে তাকে দুটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের মুখোমুখি হতে হয়।

এই দুটি সংস্থার রিপোর্ট সন্তোষজনক না হলে নতুন পাসপোর্ট ইস্যু করা হয় না। ফলে আবেদন করলেও অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আগের নির্দেশনা

অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর ওই বছরের ২২ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে একটি লিখিত নির্দেশনা পাঠায়। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়—

  • সাবেক প্রধানমন্ত্রী

  • প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টারা

  • মন্ত্রিসভার সদস্যরা

  • জাতীয় সংসদ সদস্যরা

  • এবং তাঁদের স্বামী-স্ত্রীরা

যাঁরা কূটনৈতিক পাসপোর্ট গ্রহণ করেছিলেন, দায়িত্বকাল শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের সবার লাল পাসপোর্ট প্রত্যাহার করতে হবে।

একই সঙ্গে বলা হয়, যারা সাধারণ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই দুটি তদন্ত সংস্থার রিপোর্ট জমা দিতে হবে।

এই রিপোর্ট পাওয়ার পরই কেবল সাধারণ পাসপোর্ট ইস্যু করা যাবে।

পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অবস্থান

পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা এখনো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে নতুন কোনো আলাদা নির্দেশনা পাননি। ফলে বিদ্যমান বিধান অনুসারেই তারা আবেদনগুলো প্রক্রিয়াকরণ করছেন।

এর অর্থ হলো, উপদেষ্টা বা বিশেষ সহকারীরা চাইলেও দ্রুত সাধারণ পাসপোর্ট পাওয়া সম্ভব নয়, যতক্ষণ না তদন্ত প্রতিবেদন আসে।

রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাগুলো ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস শুরু হবে। সেই প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই অনেকেই নিজেদের আইনি ও প্রশাসনিক অবস্থান আগেভাগেই গুছিয়ে নিচ্ছেন।

এটি একদিকে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ জটিলতা এড়ানোর কৌশল বলেও মনে করা হচ্ছে।

সাধারণ নাগরিকদের জন্য বার্তা

এই ঘটনার মাধ্যমে সাধারণ মানুষও একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারেন—

সরকারি নিয়মকানুন সবার জন্যই সমান। দায়িত্ব শেষ হলে যে কোনো সরকারি সুবিধা ফেরত দেওয়া বাধ্যতামূলক। এমনকি দেশের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিরাও এই নিয়মের বাইরে নন।

এতে রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও আইনের প্রতি আস্থা আরও দৃঢ় হয়।

প্রশ্ন-উত্তর

প্রশ্ন ১: লাল পাসপোর্ট কি আজীবনের জন্য পাওয়া যায়?
👉 না, দায়িত্বকাল শেষ হলে এটি ফেরত দিতে হয়।

প্রশ্ন ২: সাধারণ পাসপোর্ট পেতে কত সময় লাগে?
👉 তদন্ত সংস্থার রিপোর্টের ওপর নির্ভর করে সময় নির্ধারিত হয়।

প্রশ্ন ৩: কয়টি সংস্থার রিপোর্ট প্রয়োজন?
👉 দুটি গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট প্রয়োজন।

প্রশ্ন ৪: তদন্ত রিপোর্ট ছাড়া কি পাসপোর্ট দেওয়া সম্ভব?
👉 না, নিয়ম অনুযায়ী রিপোর্ট ছাড়া পাসপোর্ট ইস্যু করা যায় না।

প্রশ্ন ৫: শুধু উপদেষ্টাদের জন্য এই নিয়ম প্রযোজ্য?
👉 না, সব সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও উচ্চপদস্থ ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য।

প্রশ্ন ৬: সাধারণ নাগরিকদের জন্য কি একই নিয়ম?
👉 না, সাধারণ নাগরিকদের ক্ষেত্রে এই তদন্ত প্রক্রিয়া প্রযোজ্য নয়।

উপসংহার

লাল পাসপোর্ট ফেরত দিয়ে সাধারণ পাসপোর্টের আবেদন শুধু একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। উপদেষ্টা ও উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরাও যে নিয়মের বাইরে নন, তা এই ঘটনাগুলো স্পষ্ট করে দেয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষের পথে, সামনে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা—এই বাস্তবতায় এই সিদ্ধান্তগুলো ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক স্বচ্ছতার একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় এই ধরনের নিয়মের কঠোর প্রয়োগ সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়াবে এবং প্রশাসনের গ্রহণযোগ্যতা আরও শক্তিশালী করবে—এটাই প্রত্যাশা।

আরও পড়ুন-অনলাইনে নিজের পাসপোর্ট চেক করার সহজ নিয়ম

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
👉টেক নিউজের সকল খবর সবার আগে পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন!

👉🙏লেখার মধ্যে ভাষা জনিত কোন ভুল ত্রুটি হয়ে থাকলে অবশ্যই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।

✅আজ এ পর্যন্তই ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন 🤔

📌 পোস্টটি শেয়ার করুন! 🔥

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমতুল্লাহ। আমি মোঃ সানাউল বারী। পেশায় আমি একজন চাকরিজীবী এবং এই ওয়েবসাইটের এডমিন। চাকরির পাশাপাশি, আমি গত ১৪ বছর ধরে আমার নিজস্ব ওয়েবসাইটে লেখালেখি করছি এবং আমার নিজস্ব ইউটিউব এবং ফেসবুকে কন্টেন্ট তৈরি করছি। বিশেষ দ্রষ্টব্য - লেখায় যদি কোনও ভুল থাকে, তাহলে দয়া করে আমাকে ক্ষমা করে দিন। ধন্যবাদ।